অভয়াকর-গুপ্ত ও শুভাকর-গুপ্তের খান কয়েক গ্রন্থের অনুবাদ করিয়াছিলেন আচার্য দানশীল। তাহার বাড়ি ছিল ভগল বা বঙ্গল দেশে এবং জগদ্দল-বিহারের তিনি ছিলেন অন্যতম আচার্য। প্রায় ষাটখানা তন্ত্র-গ্রন্থের তিব্বতী অনুবাদ তাহার রচনা; নিজে তিনি পুস্তকপাঠোপায়। নামে একখানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন এবং নিজেই তিনি তাহার তিব্বতী রূপান্তরও করিয়াছিলেন। শুভাকর ছিলেন অভয়াকরের সমসাময়িক মগধের একজন বৌদ্ধ আচার্য, তিনিও কিছুদিন জগদ্দল-বিহারের অধিবাসী ছিলেন। অভয়াকরশিষ্য এবং রামপালের সমসাময়িক, মগধবাসী শুভাকর গুপ্ত এবং জগদলের শুভাকরকে এক এবং অভিন্ন মনে না করিবার কোনও কারণ নাই।
প্রজ্ঞাবর্মী নামে একজন বাঙালী কাপট-বিহারের অন্যতম আচার্য ছিলেন। তিনি তন্ত্রশাস্ত্রের উপর দুইটি টীকা রচনা করিয়াছিলেন, ধৰ্মকীর্তির হেতুবিন্দুপ্রকরণ নামক ন্যায় গ্রন্থের তিব্বতী অনুবাদ রচনা করিয়াছিলেন এবং উদানবগগের ওপর ধর্মাত্রাতের অসমাপ্ত টীকাখানা সমাপ্ত করিয়াছিলেন। প্রজ্ঞাবর্মার গুরু বোধিভদ্র সোমপুরী-বিহারের অধিবাসী ছিলেন। এই বোধিভদ্র এবং তারনাথ কথিত বিক্রমশীল-বিহারের আচার্য বোধিভদ্র বোধ হয় এক এবং অভিন্ন। বোধিভদ্র প্রায় আট দশখানা তন্ত্রগ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। তাহার গুরু ছিলেন মহামতি।
মোক্ষাকর-গুপ্ত পুণ্ডরীক
জগদ্দল-বিহারের আর একজন আচার্য ছিলেন মোক্ষাকর-গুপ্ত। তিনি তর্কভাষা নামে বৌদ্ধ ন্যায়ের উপর একখানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। অপভ্রংশ দোহাকোষের উপর টীকাও বোধ হয়। তাঁহারই রচনা।
পুণ্ড্রৱীক নামে একজন রাজা আর্যমঞ্জনামসংগীতি-টীকার উপর বিমলপ্ৰভা নামে একটি টীকা রচনা করিয়ছিলেন। বর্মণ বংশীয় রাজা হরিবর্মদেবের ৩৯ রাজ্যঙ্কে লিখিত এই টীকার একটি পুঁথি নেপালে পাওয়া গিয়াছে। এই পুণ্ড্ররীক বোধ হয় বাঙালী ছিলেন, কারণ তাহার-বাড়ি বলা হইয়াছে উডউীয়ানে। তাহার অন্য আর একটি নাম ছিল জ্ঞানবাজ।
লুই-পা মৎস্যেন্দ্রনাথ
সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠতম সেই লুই-পা বা লুইপাদ খুব সম্ভব রামপালের সমসাময়িক ছিলেন। তারনাথের ইঙ্গিত অনুসরণ করিয়া আচার্য লেভি,শহীদুল্লাহ্ প্রভৃতি পণ্ডিতেরা লুই-পাকে খ্ৰীষ্টোত্তর সপ্তম শতকের লোক বলিয়া মনে করেন। কিন্তু লুই-পা রচিত অভিসময়বিভঙ্গ-গ্রন্থের পুস্পিকায় স্পষ্টতই বলা আছে যে, আচার্য দীপঙ্কর তাহাকে এই গ্ৰন্থ রচনায় বা তিব্বতী অনুবাদে সাহায্য করিয়াছিলেন। তাঙ্গুরা-তালিকায় তদ্রচিত কয়েকখানা বজযান-গ্রন্থের উল্লেখ আছে, এবং তিব্বতী ঐতিহ্যমতে তিনিই আদিসিদ্ধ। চর্যাগীতি-গ্রন্থে তাহার প্রাচীন বাঙলায় রচিত দুইটি দোহা। আছে, ་་ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় মনে করেন, লুইপাদ-গীতিকা নামে তাহার একখানা পৃথক গ্রন্থও ছিল।
অনেকের মতে তিব্বতী ঐতিহ্যের আদিসিদ্ধ লুই-পাদ এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের আদিসিদ্ধ মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্ৰনাথ এক এবং অভিন্ন। এরূপ মনে করিবার কারণও আছে; প্রথমত তিব্বতী ভাষায় লুই-পার রূপাস্তুর মৎস্যোদির বা মৎস্যাস্ত্রাদ! দ্বিতীয়ত, তিব্বতী ঐতিহো লুই-পা বাঙলা দেশের ধীবর শ্রেণীর লোক; ভারতীয় ঐতিহ্যেও মীননাথ-মৎস্যেন্দ্রনাথ প্রাচ্য সমুদ্রতীরের চন্দ্ৰদ্বীপের ধীবরশ্রেণীসভূত। তৃতীয়ত, যোগিনী কৌল সম্প্রদায়ের যে কয়েকটি সংস্কৃত পুঁথি আমাদের জানা আছে, যেমন কৌলঙ্ঞাননির্ণয়, এবং নেপালে প্রাপ্ত আরো ৩/৪ খানা পুঁথি, তাহাদের প্রত্যেকটিতেই মীননাথ-মৎস্যেন্দ্রনাথকে সেই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ও আদিগুরু বলিয়া স্বীকার করা হইয়াছে; অন্যদিকে তারনাথ বলিতেছেন, লুইপাদই যোগিনী ধর্মমতের স্রষ্টা। বস্তুত, সমস্ত পূর্ব ও উত্তরবঙ্গ জুড়িয়া এবং কামরূপে হঠযোগ, যোগিনী কৌলধর্ম এবং নাথধর্মকে কেন্দ্ৰ করিয়া যে-সব সম্প্রদায় বহু শতাব্দী ধরিয়া আপনাপন প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। তাহারা প্রত্যেকেই লুইপাদ ও মৎস্যেন্দ্রনাথকে এক এবং অভিন্ন বলিয়া মনে করে এবং নিজেদের আদিগুরু বলিয়া স্বীকার করে। লুই-পাদ-মৎস্যেন্দ্রনাথের ধর্মমতই সহজসিদ্ধি নামে খ্যাত। এই সহজিসিদ্ধির সঙ্গে একদিকে যেমন বজ্ৰযান-মন্ত্রযানের সম্বন্ধ অত্যস্ত ঘনিষ্ঠ, তেমনই অন্যদিকে কৌলধর্ম, নাথধর্ম প্রভৃতি এই সহজসিদ্ধি হইতেই উদ্ভূত। সেইজন্য দেখা যাইবে, এই সব সিদ্ধাচার্যদের অনেকেই বজ্রযানী গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছেন, এবং বৌদ্ধতন্ত্রের সঙ্গে তাহদের সম্বন্ধ নিবিড়। বস্তুত, যোগিনী কৌলের কুল বৌদ্ধ তন্ত্রেরই পঞ্চকুল এবং এই পঞ্চকুল পঞ্চাধ্যানী বুদ্ধেরই প্রতীক; আর সহজ সিদ্ধির সহজ এবং বোজযানের বীজ প্ৰায় একই বস্তুর দুই ভিন্ন নাম মাত্র। তিব্বতী ঐতিহ্যান্তরে কিন্তু মৎস্যাস্ত্ৰাদকে মৎস্যেন্দ্রনাথ হইতে পৃথক বলিয়া ধরা হইয়াছে এবং মৎস্যেন্দ্রনাথকে মীননাথের সন্তান বা বংশধর বলা হইয়াছে।
মীননাথ-মৎস্যেন্দ্রনাথের অন্যতম পূর্বপুরুষ ছিলেন মীনপাদ, তিনি বোধিচিত্তের উপর একখানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। সহজসিদ্ধি মত নেপালে এবং তিব্বতে সুপ্রচলিত হইয়াছিল এবং উভয় দেশেই তিনি অবলোকিতেশ্বর অবতার বলিয়া পরিগণিত হইয়াছিলেন। বাঙলাদেশে তিনি শিবের অবতার বলিয়া প্ৰসিদ্ধিলাভ করিয়াছেন। মৎস্যেন্দ্রনাথের নামে প্রচলিত কয়েকখানা সংস্কৃত পুঁথি নেপালে পাওয়া গিয়াছে।
