‘অতীশ না থাকিলে ভারতবর্ষ অন্ধকার। বহু বৌদ্ধ-প্রতিষ্ঠানের কুঞ্চিক তাঁহারই হাতে; তাহার অনুপস্থিতিতে এই সব প্রতিষ্ঠান শূন্য হইয়া যাইবে। চারিদিকের অবস্থা দেখিয়া মনে হয়, ভারতবর্ষের দুর্দিন ঘনাইয়া আসিতেছে। অসংখ্য তুরুষ্ক সৈন্য ভারতবর্ষ আক্রমণ করিতেছে; আমি অত্যন্ত চিন্তিত বোধ করিতেছি। তবু, আশীর্বাদ করিতেছি, তুমি অতীশ ও তোমাদের সঙ্গীদের লইয়া তোমাদের দেশে ফিরিয়া যাও, সকল প্রাণীর কল্যাণের জন্য অতীশের সেবা ও কর্ম নিয়োজিত হউক।‘
বিনয়ধর, তিব্বতী পণ্ডিত গ্যা-টুসন, পণ্ডিত ভূমিগর্ভ এবং অপরান্তরাজ মহারাজ ভূমিসংঘকে লুইয়া দীপঙ্কর তিব্বত যাত্রা করিলেন, নেপালের ও হিমালয়ের সুদুৰ্গম পথে। পথে দুই দুইবার তাহারা দসু্যদল কর্তৃক আক্রান্ত হইলেন; গ্যা-টুসন মারা গেলেন, নেপালরাজ অনন্তকীর্তির সঙ্গে দীপঙ্করের সাক্ষাৎকার ঘটিল, এবং অনন্তকীর্তির পুত্র পদ্মপ্রভ দীপঙ্করের নিকট বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করিয়া তিব্বতের পথে তাহার সঙ্গী হইলেন। এই সময় বোধ হয়, নেপাল হইতেই তিনি রাজা নয়পালের নিকট একটি লিপি পাঠান। অবশেষে তিব্বতে পৌঁছিয়া দীপঙ্কর রাজসমারোহে অভ্যর্থত হইলেন এবং তিব্বতের সর্বত্র ঘুরিয়া ঘুরিয়া মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করিয়া বেড়াইলেন। থাে-লিং বিহার হইল তাহার কর্মকেন্দ্র। দীপঙ্কর প্রায় তেরো বৎসর কাল তিব্বতে বাস করিয়া ৭৩ বৎসর বয়সে আনুমানিক ১০৫৩ খ্ৰীষ্ট বৎসরে সেইখানেই পরলোকগমন করেন।
সুমপা-রচিত পাগ-সাম-জোন-জাং-গ্রন্থের মতে দীপঙ্কর বিক্রমশীল ও ওদস্তূপরী উভয় বিহারেরই মহাচার্য ছিলেন; তাহার অন্য নাম ছিল জোবো বা প্রভু। বোধ হয়। সঙ্গেও তাহার সম্বন্ধ ছিল ঘনিষ্ঠ, এবং সেখানে বসিয়াই তিনি ভাব-বিবেকের মধ্যমকরত্ন-প্রদীপ-গ্রন্থের অনুবাদ রচনা করিয়াছিলেন। ত্যাঙ্গুর-ঐতিহ্যমতে তিনি প্রায় ১৭৫ মৌলিক রচনা অথবা অনুবাদ করিয়াছিলেনলেন। ইহাদের অধিকাংশই বজ্রযানী সাধন, কিন্তু কিছু কিছু মহাযানী সূত্রগ্রন্থও ত্যাঙ্গুরা-তালিকায় বিদ্যমান।
চরিত্রে, পাণ্ডিত্যে, মনীষায় ও অধ্যাত্ম-গরিমায় দীপঙ্কর সমসাময়িক বাঙলার ও ভারতবর্ষের অন্যতম উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। পূর্ব-ভারত ও তিব্বতের মধ্যে যাহারা মিলনসেতু রচনা করিয়া গিয়াছেন, তাহদের মধ্যে দীপঙ্করের নাম সর্বাগ্রে এবং সকলের পুরোভাগে স্মর্তব্য। সমসাময়িক অবস্থার দিকে তাকাইয়া রত্নাকর বলিয়াছিলেন, দীপঙ্কর-বিহীন ভারতবর্ষ অন্ধকার’। এই উক্তির মধ্যে অত্যুক্তি কিছু নাই; সেই ঘনায়মান মেঘান্ধকারের মধ্যে দীপঙ্করই একমাত্র আলোকরেখা।
জ্ঞানশ্ৰী-মিত্র
বিক্রমশীল-বিহারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাবান আচার্য ছিলেন জ্ঞানশ্ৰী-মিত্র; দীপঙ্করের তিব্বত-যাত্রার কিছু আগে বা পরে তিনি এই বিহারে আসিয়া অধিষ্ঠিত হন। তাহার বাড়ি ছিল গৌড়ে; গোড়ায় তিনি ছিলেন। হীনযানী বৌদ্ধ, পরে মহাযানে দীক্ষা গ্ৰহণ করেন। তাহার বৌদ্ধ ন্যায় সম্বন্ধীয় সুপ্ৰসিদ্ধ গ্রন্থ কার্যকরণ-ভাবসিদ্ধি চতুর্দশ শতকে আচার্য মাধব-রচিত সর্বদর্শনসংগ্রহে আলোচিত ও ব্যাখ্যাত হইয়াছে।
অভয়াকর-গুপ্ত
অভয়াকর-গুপ্ত নামে একজন বৌদ্ধ আচার্য ছিলেন রামপালের সমসাময়িক; বজাসন (বুদ্ধগয়া) ও নালন্দায় তিনি ছিলেন পণ্ডিত, এবং বিক্রমশীল-বিহারের অন্যতম আচার্য। তাহার জন্ম হয়। ঝারিখণ্ডে, বঙ্গাল দেশের এক ক্ষত্ৰিয়-পরিবারে। তারনাথের মতে অভয়াকর তীৰ্থিক সম্প্রদায়ের তন্ত্রশস্ত্ৰে সুপণ্ডিত ছিলেন, পরে বাঙলার বৌদ্ধ তন্ত্রেও পাণ্ডিত্য লাভ করেন। ত্যাঙ্গুর-ঐতিহ্যমতে তিনি প্রায় বিশ খানা বজ্রযানী গ্রন্থের রচয়িতা, এবং ইহাদের অন্তত চারিখানার মূল সংস্কৃত গ্রন্থ বিদ্যমান। শ্ৰীসমপুটতন্ত্ররাজগ্রন্থের তদ্রচিত একটি টীকায় এবং বজযানাপত্তিমঞ্জরী নামে তাহার একটি গ্রন্থে তাহাকে মগধের লোক বলিয়া পরিচয় দেওয়া আছে।
দিবাকর-চন্দ্ৰ
তিনি হেরুক-সাধন নামে একটি গ্রন্থ এবং আরো দুইটি অনুবাদ-গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। সুমপা বলিতেছেন, দিবাকর-দেবাকরচন্দ্র মৈত্রী-পা’র শিষ্য ছিলেন; দীপঙ্কর তাহাকে বিক্রমশীল-বিহার হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দেন। এক পণ্ডিত শ্ৰীদিবাকরচন্দ্ৰ পাকবিধি নামে একটি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন ১১০১ খ্ৰীষ্ট বৎসরে; তিব্বতী ঐতিহ্যে দিবাকর ও দিবাকর-চন্দ্ৰ নামে আরও দুইজন পণ্ডিত গ্রন্থকারের সাক্ষাৎ মেলে! ইহারা সকলেই বোধ হয় এক এবং অভিন্ন। পূর্বোক্ত জেতারির সমসাময়িক এবং দীপঙ্কর-অতীশের অন্যতম শিক্ষাগুরু, রাজাচার্য, মহাগুরু রত্নাকরশান্তি অথবা শান্তিপাদ বাঙালী ছিলেন। কিনা, নিঃসংশয়ে বলা কঠিন।
তবে মহীপাল-নয়পালেরই সমসাময়িকু কুমারবাজ নিশ্চয়ই ছিলেন বাঙালী। হেরুকসাধন নামে একটি গ্রন্থ তিনি রচনা করিয়াছিলেন, এবং দারিকপাদের চক্রসম্বর-সাধনতত্ত্বসংগ্রহ’ গ্রন্থের অনুবাদ করিয়াছিলেন।
রত্নাকরশান্তি, কুমারবজ্র, দানশীল, বিভূতিচন্দ্ৰ, বোধিভদ্র, প্রজ্ঞাবর্ম
রামপাল-প্রতিষ্ঠিত জগদ্দল-বিহারের দুইটি স্বনামধন্য পণ্ডিত হইতেছেন দানশীল ও বিভূতিচন্দ্র। বিভূতিচন্দ্র ছিলেন রাজপুত্র; ত্যাঙ্গুর ঐতিহ্যমতে তিনি ছিলেন পণ্ডিত, মহাপণ্ডিত, আচার্য, উপাধ্যায়; তাহার কর্মভূমি ছিল পূর্ব-ভারতের (উত্তরবঙ্গের) জগদ্দল-বিহার। তিনি একাধারে ছিলেন গ্ৰন্থকার, টীকাকার, অনুবাদক ও সংশোধক। বিভূতিচন্দ্র কিছুকাল নেপালে ও তিব্বতে বাস করিয়াছিলেন, এবং তিব্বতীতে অনেক গ্রন্থও অনুবাদ করিয়াছিলেন। তিনি কয়েকখানি মূল সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন, অনেক গ্রন্থের টীকা রচনাও করিয়াছিলেন। লুই-পা’র দুইটি গ্রন্থের এবং অভয়াকরের দুই বা ততোধিক গ্রন্থের অনুবাদ তাঁহারই রচনা।
