আগেই বলিয়াছি, বজ্রযানী-মন্ত্রযানী তান্ত্রিক আচার্যদের সঙ্গে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও নাথগুরুদের গভীরতর ধ্যান ও আদর্শগত পার্থক্য যাহাই থাকুক না কেন, অন্তত সূচনায় এইসব সমসাময়িক ধৰ্মসম্প্রদায় ও আচার্যদের জীবনাচরণে বা জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনায় প্রভেদ বিশেষ ছিল না। আগেই বলিয়াছি, বজ্ৰযান-মন্ত্রযান-কালচক্ৰযানের বাহিরে অথচ কিছুটা ইহাদেরই ভিতর হইতে উদ্ভূত এবং ইহাদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পূক্ত নাথধর্ম, কৌলধর্ম, সহজধৰ্ম, অবধূতধর্ম প্রভৃতির আচার্যরা প্রায় সকলেই একে অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায় কর্তৃক গুরু ও আচার্য বলিয়া স্বীকৃত ও পূজিত হইয়াছেন। শেষোক্ত ধর্ম ও সম্প্রদায়গুলির প্রধান আচার্য ছিলেন চুরাশি জন, এবং ইহারা তিব্বতী ঐতিহ্যে চুরাশি সিদ্ধা বলিয়া খ্যাত। ইহাদের মধ্যে অনেকে আবার বিজযান সাধনা ও বজ্রযানী দেবদেবী সম্বন্ধে গ্রন্থও রচনা করিয়াছেন, মহাযানী ন্যায়ের পুঁথিও লিখিয়াছেন। সুতরাং ইহাদের একান্ত করিয়া পৃথকভাবে বিবেচনা করিবার যুক্তিসঙ্গত কিছু কারণ নাই। বস্তুত, এই কয় শত বৎসর ধরিয়া বাঙলা দেশে বৌদ্ধ ধর্ম, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এবং বিভিন্ন লোকায়াত ধর্মের নানা ধ্যান, নানা প্রক্রিয়ার একটা সুবৃহৎ এবং সুগভীর সমন্বয় ও স্বাঙ্গীকরণক্রিয়া সমানেই চলিতেছিল। এই সমন্বয় ও সাঙ্গীকরণই পাল-চন্দ্ৰ-পর্বের বাঙলার ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। সেনা-বর্মণ পর্বের উচ্চস্তরের সংস্কৃত স্মৃতি-দর্শন-কাব্য প্রভৃতি সাধনার কথা বাদ দিলে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অন্যত্র এই সমন্বয়-স্বাঙ্গীকরণ ক্রিয়া খুব বাধা পায় নাই। সেই কারণে, এই সব মহাযানী-বজ্রযানী বৌদ্ধ পণ্ডিত ও সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে যাঁহারা বাঙালী তাহাদের কথা এক সঙ্গেই বলিতেছি, কালপরম্পরা যতটা জানা যায় ততটা বজায় রাখিয়া।
প্রসঙ্গত, এ-কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, মহাযান-বজযান প্রভৃতি মতাবলম্বী তান্ত্রিক আচার্যরা যে-সব রচনা রাখিয়া গিয়াছেন তাহার অধিকাংশই হয় দর্শন ও যোগসাধন সম্বন্ধীয় অথবা বিভিন্ন দেবদেবীর সাধনা, স্তব ও পূজা বিষয়ক শ্লোকাবলী। শেষোক্ত পর্যায়ের রচনায় যাহাদের কবিকল্পনা ও কবিপ্রতিভার কিছু কিছু পরিচয় ধরা পড়িয়াছে, তাহাদের মধ্যে অনেকেই যে বাঙালী ছিলেন সে-সম্বন্ধেও সন্দেহের অবকাশ কম। সংস্কৃত কাব্যের রীতি-প্রকৃতিতেও ইহারা যথেষ্ট অভিজ্ঞ ছিলেন, মনে হয়। ধর্মকরমতি, শবরপাদ, কৃষ্ণপাদ, রত্নাকর, শুভাকর, কুলদত্ত, অদ্বয়বজি, ললিত-গুপ্ত, কুমুদাকরমতি, পদ্মাকর, অভয়াকর-গুপ্ত, গুণাকর-গুপ্ত, করুণাচল, কোকরদত্ত, অনুপম-রক্ষিত, চিন্তামণি-দত্ত, সুমতি-ভদ্র, মঙ্গল-সেন, অজিত-মিত্র প্রভৃতি যাহাদের নাম সাধনমালা-গ্রন্থে পাইতেছি, তাহাদের তো বাঙালী বলিয়াই মনে হইতেছে। ইহাদের রচনার দৃষ্টান্ত স্বরূপ এবং কিছুক্ষণ আগে ব্ৰাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ তন্ত্রধর্মে যে স্বাঙ্গীকরণ ক্রিয়ার উল্লেখ করিয়াছি তাহারও দৃষ্টান্ত স্বরূপ জনৈক অজ্ঞাতনামা কবির একটি তারাস্তুতি উদ্ধার করিতেছি। এই ভক্তিরাসমিন্ধ স্তবটিতে ব্ৰাহ্মণ্য দুৰ্গা ও বেদমাতা সরস্বতী এবং বৌদ্ধ তারা ইতিমধ্যেই কবি-কল্পনায় এক এবং অভিন্ন হইয়া গিয়াছেন।
দেবী (?) ত্বমেব গিরিজা কুশলা ত্বমেব
পদ্মাবতী ত্বমসি [ত্বং হি চ] বেদমাতা।
ব্যাপ্তং ত্বয়া ত্ৰিভুবনে জগতৈক রূপা (?)
তুভ্যং নমোহস্তু মনসা বপুষা গিরা নঃ৷।
যানত্রয়েষ্ণু দশ পারমিতেতি গীতা
বিস্তীর্ণ যানিকজন্য ফলশূন্যতেতি
প্রজ্ঞাপ্রসঙ্গচন্টুলা মৃতপূৰ্ণধাত্রী
তুভ্যং নমোহগু মনসা বপুষা গিরা নঃ৷।
আনন্দানন্দবিরসা সহজ স্বভাবা
চক্ৰত্ৰয়াদ পরিবর্তিত বিশ্বমাতা।
বিদ্যুৎপ্রভাহাদয়বর্জিতজ্ঞানগম্যা
তুভ্যং নমোহস্তু মনসা বপুষ্য গিরা নিঃ৷
দশম-দ্বাদশ শতক
জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ জেতারি
তারনাথ ও সুমপার সাক্ষ্যে মনে হয়, জেতার নামেও দুইজন বৌদ্ধ আচার্য ছিলেন। জ্যেষ্ঠ জেতরির বাড়ি ছিল বরেন্দ্রভূমে, তাহার পিতা গর্ভপাদ জনৈক সামান্ত সনাতনের সভাসদ ছিলেন। এই জেতারি বিক্রমশীল বিহারের অন্যতম আচার্য এবং শ্ৰীজ্ঞান-দীপঙ্কর বা অতীশের অন্যতম গুরু ছিলেন। সেই জন্য অনুমান হয়, তিনি দশ শতকের শেষার্ধের লোক ছিলেন। হেতুতত্ত্বোপদেশ, ধর্মাধৰ্মবিনিশ্চয় এবং বালাবতারতর্ক নামে বৌদ্ধ ন্যায়ের এই তিনটি গ্রন্থ বোধ হয় তাহারই রচনা। ইহা ছাড়া তিনি আরও দুইখানা সূত্রগ্রন্থও রচনা করিয়াছিলেন। তাহার মধ্যে সুগতমতবিভঙ্গকারিকা অন্যতম; এই গ্রন্থে তিনি আত্মপরিচয় দিয়াছেন বাঙালী বলিয়া। কনিষ্ঠ জেতারিও ছিলেন বাঙালী, এবং বোধিভাগ্য লাবণ্যবাঞ্জের গুরু। তিনি এগারো খানা বঞ্জযানী-সাধনের রচয়িতা। তাঁহার কাল সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা কঠিন।
দীপঙ্কর-শ্ৰীজ্ঞান বা অতীশ
বাঙালী বৌদ্ধ মহাচার্যদের মধ্যে দীপঙ্কর-শ্ৰীজ্ঞান (অন্য নাম অতীশ) শ্রেষ্ঠতম এবং দীপঙ্কর-চরিত্যকথা বাঙলাদেশে সুপরিচিত। কাজেই তাহার কথা বিস্তুত করিয়া বলিবার প্রয়োজন কিছু নাই। ত্যাঙ্গুরের ঐতিহ্যে একাধিক দীপঙ্করুম্মুতি বিধৃত – দীপঙ্কর, দীপঙ্কর-ভদ্র, দীপঙ্কর-রক্ষিত, দীপঙ্কর-চন্দ্ৰ, দীপঙ্কর-শ্ৰীজ্ঞান। নিঃসন্দেহে ইহারা সকলে একই ব্যক্তি হইতে পারেন না; তবে ইহাদের মধ্যে দীপঙ্কর-শ্ৰীজ্ঞান যে বাঙালী ছিলেন এ-সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নাই। তাঁহার জন্মভূমি বঙ্গাল-দেশের বিক্রমণিপুরে, আনুমানিক ৯৮০ খ্ৰীষ্ট বৎসরে গৌড়রাজ-পরিবারে তাঁহার জন্ম; পিতার নাম কল্যাণশ্ৰী, মাতা প্রভাবতী, তাহার নিজের বাল্য নাম ছিল চন্দ্ৰগৰ্ভ। যৌবনে তিনি জেতারির শিষ্য ছিলেন; কিছুদিন তিনি পশ্চিম-ভারতের কৃষ্ণগিরি বা কানহেরী-বিহারে থাকিয়া রাহুলগুপ্তের নিকট বৌদ্ধ ধ্যানে দীক্ষালাভ করিয়াছিলেন; সেইখানেই তাঁহার নামকরণ হয় গুহ্যজ্ঞানবজা। উনিশ বৎসর বয়সে ওদন্তপুরী-বিহারে মহাসংঘিক আচার্য শীলরক্ষিতের নিকট তিনি দীক্ষাগ্ৰহণ করেন, এবং সেই সময় তাহার নামকরণ হয় দীপঙ্কর-শ্ৰীজ্ঞান। বারো বৎসর পর তিনি ভিক্ষুব্ৰতী হ’ন এবং আচার্য ধর্মরক্ষিতের নিকট বোধিসত্ত্বব্ৰতে দীক্ষিত হন। তারপর তিনি আরও বারো বৎসর যাপন করেন সুবর্ণদ্বীপে আচাৰ্য চন্দ্ৰকীর্তির নিকট বৌদ্ধ শাস্ত্রপাঠে। সেখান হইতে তিনি তাম্রদ্বীপ বা সিংহলের পথে মগধে ফিরিয়া আসেন, এবং কিছুদিন পরই মহীপাল কর্তৃক আহূত হন বিক্রমশীল মহাবিহারের মহাচাৰ্যপদে। এই বিহারে বাসকালেই তিব্বতের বৌদ্ধ রাজা লোহ-লামা-যে-শেস দূত পঠাইয়া দীপঙ্করকে সাদর আমন্ত্রণ জ্ঞাপন করেন তিব্বত যাইবার জন্য। নিলেভি নিরহঙ্কার দীপঙ্কর সবিনয়ে এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। ইহার কিছুদিন পর প্রতিবেশী এক রাজকারাগারে তিব্বত-রাজের প্রাণবিয়োগ ঘটে, কিন্তু তাহার আগেই তিনি তাহার অবস্থা ও প্রাণের একান্ত অভিপ্রায় জানাইয়া দীপঙ্করের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখিয়া রাখিয়া যান। লাহলামা যে-শেস-গুডের মৃত্যুর পর তাহার ভ্রাতুষ্পপুত্ৰ চান-চুবের রাজত্ব কালে তিব্বতী আচার্য বিনয়ধর (টুযুল খ্রিম-গ্যালবা) সেই পত্ৰ লইয়া দীপঙ্করের উদ্দেশ্যে বিক্রমশীল-বিহারে আসিয়া উপস্থিত হন, এবং কিছুকাল সেখানে যাপনের পর দীপঙ্করের সঙ্গে পরিচয় কিছু ঘনিষ্ঠ হইলে নিজের মনোবাসনা এবং লোহ-লামার পত্র তাহার গোচর করেন। অবশেষে দীপঙ্কর তিব্বত যাইতে স্বীকৃত হ’ন, কিন্তু তাহার হাতে যে সব কাজ ছিল তাহা সারিবার পর। এই সময় আচার্য রত্নাকর ছিলেন বিক্রমশীল-বিহারের অধিনায়ক। বিহারের ভিক্ষুসংঘ তখন নানাপ্রকার নৈতিক ও মানসিক শৈথিল্যে ভারগ্রস্ত; দীপঙ্কর ছাড়া ভিক্ষুদের নৈতিক শাসন অব্যাহত রাখার শক্তি আর কাহারও নাই। মগধ জনপদের নানা বিহারে-সংঘে দীপঙ্করের প্রতিষ্ঠা ও প্রভাব অপরিসীম। এ সব বিবেচনা করিয়া রত্নাকর দীপঙ্করকে ছাড়িয়া দিতে কিছুতেই রাজি হইলেন না। কিন্তু পরে যখন ক্রমশ জানিলেন, দীপঙ্কর বিনয়ধরকে কথা দিয়াছেন এবং তিনি নিজেও যাইতে ইচ্ছুক তখন অনুমতি দেওয়া ছাড়া আর উপায় রহিল না, কিন্তু এই শর্তে যে, তিন বৎসরের ভিতর দীপঙ্কর বিক্রমশীল-বিহারে ফিরিয়া আসিবেন। এই উপলক্ষে তিনি বিনয়ধরের নিকট যে উক্তি করিয়াছিলেন তাহা উল্লেখযোগ্য :
