কুক্কুরিপাদ কম্বলপাদ
তারনাথের মতে সরোরুহোবজ্রের সমসাময়িক ছিলেন কুঙ্কুরিপাদ ও কম্বলপাদ বা কম্বলাম্বরপাদ। কুকুরিপাদ বাঙলার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, পরে বৌদ্ধ তন্ত্রধর্মে দীক্ষা গ্ৰহণ করিয়া ডাকিনীদের দেশ হইতে মন্ত্রযান ও অন্যান্য তন্ত্র (মহামায়াতন্ত্র?) উদ্ধার করেন। চুরাশি সিদ্ধার তালিকায় কুকুরিপাদের উল্লেখ আছে। তিনিই বোধ হয় তন্ত্র-সাধনায় মহামায়া-সাধনের সূচনা করেন। তাঙ্গুরা-তালিকায় দেখিতেছি, তিনি অন্তত ছয়খানা তন্ত্র গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। এবং তন্মধ্যে কয়েকটি মহামায়া-সাধন সম্পর্কিত। তাঙ্গুরে এক জায়গায় তাহকে গুরুরাজা আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। কুকুর-পা বা কুকুর-রাজ এবং কুকুরিপাদ যদি এক এবং অভিন্ন হন, এবং না হইবার কোনও কারণ নাই, তাহা হইলে ত্যাঙ্গুর-তালিকার বজ্ৰযান সাধন সম্পর্কিত আরও আটটি তন্ত্রগ্রন্থ (বাজসত্ত্ব, হেরুক, বৈরোচন প্রভৃতি দেবতা সম্বন্ধীয়) তাঁহারই রচনা বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। চর্যাগীতি বা চর্যচর্যবিনিশ্চয়গ্রন্থের অন্তত দুইটি প্রাচীন বাঙলা গীতি কুকুরিপাদের রচনা, ভণিতায় তাহা সুস্পষ্ট বলা আছে।
কম্বলপাদ বা কম্বলাম্বরপাদ প্রাচীন বাঙলা ভাষায় কম্বল-গীতিকা নামে একটি দোহা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন: চর্যচর্যবিনিশ্চয়-গ্রন্থের একটি গীতিরও তিনি ছিলেন লেখক। উভয়ই হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের বৌদ্ধ গান ও দোহায় স্থান পাইয়াছেন। তিব্বতী ঐতিহ্যানুসারে তিনি হেরুক সাধন সম্বন্ধে অস্তত ছয়খানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন।
শবরীপাদ
ইহাদের সমসাময়িক (অষ্টম শতকের শেষ, নবম শতকের প্রথমার্ধ) এবং চুরাশি সিদ্ধার অন্যতম ছিলেন। শবরপাদ বা শবরপাদ। সুমপা বলিতেছেন, তিনি বঙ্গাল দেশের পর্বতবাসী এক ব্যাধ বা শবরী ছিলেন। রসায়নাচার্য নাগাৰ্জ্জুন যখন বাঙলা দেশে ছিলেন (ইনি প্রথম খ্ৰীষ্ট শতকীয় শূন্যবাদী নাগার্জুন নহেন)। তখন তিনিই শবরপাদ এবং তাঁহার দুই স্ত্রীকে তন্ত্রধর্মে দীক্ষাদান করেন। ত্যাঙ্গুরা-তালিকানুযায়ী তিনি প্রায় দশখানা বজ্রযানী গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। চর্যচর্যবিনিশ্চয়-গ্রন্থে শবরীপাদের রচিত দুইখানা বাঙলা গান আছে। শবর-শবরীপাদ এবং শবরীশ্বর যদি এক এবং অভিন্ন হন, তাহা হইলে বিজযোগিনী-সাধন সম্বন্ধেও তিনি আরও কয়েকখানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। উড়ন্তীয়ান বা ওদ্যানের রাজা ইন্দ্রভূতি ও তাঁহার ভগিনী বা কন্যা লক্ষ্মীঙ্করা, ইহারা দুইই বাঙলা দেশে বজ্ৰযোগিনী-সাধন প্রবর্তন করেন। মহাচার্য ইন্দ্রভূতি সিদ্ধ-বজ্রযোগিনী-সাধন, জ্ঞান সিদ্ধি এবং অন্যান্য আরও কয়েকখানি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। লক্ষ্মীঙ্করাও কয়েকখানি গ্রন্থের রচয়িত্রী ছিলেন; তাহার মধ্যে অদ্বয়সিদ্ধি মূল সংস্কৃতে পাওয়া গিয়াছে। যাহা হউক, খুব সম্ভব পূর্বোক্ত শবর বা শবরপাদই বৌদ্ধ শবর সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য। এই শবর সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান আচার্য ছিলেন অদ্বয়বজি, তাহার কথা যথাস্থানে বলিতেছি।
কুমারচন্দ্ৰ
সৌর রত্নদ্বীপের (নেপাল অন্তর্গত রত্নদ্বীপ) অন্যতম অধিবাসী এবং পূবেক্তি লক্ষ্মীঙ্করার শিষ্য লীলাবজ আচার্য-অবধূত-মহাপণ্ডিত কুমারচন্দ্ৰ—রচিত কৃষ্ণযমাৱীতন্ত্রের টীকা রত্নাবলীর একটি তিব্বতী অনুবাদ করিয়াছিলেন। কুমারচন্দ্র রত্নাবলী টীকাটি রচনা করিয়াছিলেন। বিক্রমপুরী-বিহারে বসিয়া; সেই জন্যই অনুমান হয়, কুমারচন্দ্ৰ অষ্টম-নবম শতকীয় জনৈক বাঙালী বৌদ্ধ আচার্য ছিলেন। তিনি তিনটি তান্ত্রিক পঞ্জিকা বা টীকাও রচনা করিয়াছিলেন।
টঙ্কদাস
ধর্মপালের সমসাময়িক বৃদ্ধকায়স্থ টঙ্কাদাস বা ডাঙ্কদাস পাণ্ডুভূমি-বিহারের অধিবাসী ছিলেন, এবং সেইখানে বসিয়া সুবিশদসম্পূট হেবজাতন্ত্রের একটি টীকা রচনা করিয়াছিলেন।
নাগবোধি
রসায়ানাচার্য নাগার্জুন যখন পুণ্ড্রবর্ধনে রসায়ন ও ধাতু গবেষণায় নিরত তখন তাঁহার প্রধান সহায়ক ছিলেন জনৈক নাগবোধি। সুমপা বলিতেছেন, এই নাগাধোধির বাড়ি ছিল বরেন্দ্ৰান্তর্গত শিবসের গ্রামে; যমরিসিদ্ধচক্রসাধন নামে তিনি অন্তত একখানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থে তিনি আত্মপরিচয় দিয়েছেন উডউীয়ান-বিনির্গত বলিয়া। ত্যাঙ্গুর-তালিকামতে তিনি তেরো খানা তান্ত্রিক গ্রন্থের রচয়িতা।
এই পর্যন্ত যে-সব বৌদ্ধ আচার্যদের কথা বলা হইল তাহারা সকলেই আনুমানিক অষ্টম-নবম শতকের লোক। ইহার পর বেশ কিছুদিন উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ আচার্য-পণ্ডিতদের সাক্ষাৎ যেন পাইতেছি না। ইহার কারণ বলা কঠিন। তাহা ছাড়া ইহাদের দেশ সম্বন্ধেও যেমন কাল সম্বন্ধেও তেমনই আমাদের তথ্য নিঃসন্দিগ্ধও নয়। বিভিন্ন ধারায় বিভিন্ন ঐতিহ্যে কাল-সংবাদ, আচার্য-পরম্পর-সংবাদ বিভিন্ন প্রকারের; কাজেই নিশ্চয় করিয়া কিছু বলিবারও উপায় নাই। কিন্তু লক্ষণীয় এই যে, নবম শতকের মাঝামাঝি হইতে দশম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনও ঐতিহ্যেই কোনও আচার্যকে স্থাপিত করা সম্ভব হইতেছে না। এই একশত বৎসর বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার স্রোতে কি ভাটা পড়িয়াছিল? যাহাঁই হউক, দশম শতকের তৃতীয় পাদ। হইতে আরম্ভ করিয়া দ্বাদশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত আবার সেই স্ৰোত সবেগে বহমান, উপস্থিত সাক্ষ্যে এ-কথা স্বীকার করিতেই হয়। দ্বাদশ শতকে সেনা-বর্মণ পর্বে বৌদ্ধ বিহারগুলিতে রাজা ও রাষ্ট্রের পোষকতা আর ছিল না, এবং হয়তো বৌদ্ধ ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনায় কিছুটা ভাটাও পড়িয়াছিল, কিন্তু নিজ নিজ নিভৃত বিহারকক্ষে অথবা আপনোপন গুহ্যু সম্প্রদায়ের গুহ্যতর আশ্রয়গুলিকে কেন্দ্ৰ করিয়া তাহদের নিরলস সাধনা অব্যাহতই ছিল{ অগণিত সিদ্ধাচার্য ও বৌদ্ধ পণ্ডিত এবং তাহাদের রচিত গান, দোহা এবং সাধনই তাহার প্রমাণ।
