তিব্বতী ঐতিহ্যমতে শাস্তিরক্ষিতের খ্যাতি ভারতবর্ষের বাহিরেও ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। এই সময় (অষ্টম শতকের মাঝামাঝি) তিব্বতের রাজা ছিলেন বৌদ্ধধর্মানুরক্ত খ্রি-স্ৰং-লান্দ-বৃৎসান এবং শান্তিরক্ষিত কোনও কার্যব্যাপদেশে ছিলেন নেপালে। খ্রি-স্ৰাং-লান্দ-বৎসান কর্তৃক আমন্ত্রিত হইয়া শান্তিরক্ষিত গেলেন তিব্বতে, কিন্তু তিব্বত তখন যাদু ও ভূতপ্রেতিবাদের এবং নানা গুহ্যসাধনার কেন্দ্ৰ। শান্তরক্ষিতের বৌদ্ধ ধর্মের কথায় কেহ কৰ্ণপাত করিল না। তিনি ফিরিয়া গেলেন নেপালে; কিন্তু কিছুদিন পরই আবার আমন্ত্রিত হইয়া যাইতে হইল তিব্বত। কিছুদিন পর তাহারই নির্দেশে তিব্বত-রাজ পদ্মসম্ভবকেও আমন্ত্ৰণ করিয়া তিব্বতে লইয়া আসিলেন। তখন শান্তিরক্ষিত ও পদ্মসম্ভব দুইজনে মিলিয়া সেখানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠা করিলেন; তিব্বতে লামা শ্রেণীর সৃষ্টি হইল, এবং সকৃতজ্ঞ খ্রি-স্ৰং-লদে-বৎসান মগধের ওদন্তপুরী বিহারের আদর্শে ব্সম-য়া (Bsam-ya) বিহার প্রতিষ্ঠা করিলেন, শান্তিরক্ষিত হইলেন সেই বিহারের প্রথম সংঘাচার্য। পদ্মসম্ভব কিছুদিন পর ধর্মপ্রচারোদেশে অন্যত্র চলিয়া গেলেন। প্রায় তেরো বৎসর প্রচার ও গ্রন্থাদি রচনার পর এক চীনা শ্রমণ তিব্বতে আসিয়া বৌদ্ধ ধর্মের অন্য আর একটি নিকায় প্রচার করিতে আরম্ভ করেন। শান্তিরক্ষিত সেই শ্রমণের সঙ্গে বিচারে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু তর্কে তাহার সঙ্গে আঁটিয়া উঠিতে না পারিয়া খ্রি-স্ৰং-লদে-বৃৎসানকে অনুরোধ করিলেন মগধ হইতে কমলশীলকে আমন্ত্ৰণ করিয়া আনিবার জন্য। কমলশীল তিব্বতে আসিয়া চীনা শ্রমণকে তর্কযুদ্ধে হারাইয়া ( শান্তিরক্ষিতের মতবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিলেন।
শান্তিদেব
শান্তিরক্ষিত-শান্তরক্ষিতের অভিন্নত্ব সমন্ধে যে-সমস্যা সে-সমস্যা বজ্রযানী গ্রন্থের লেখক তান্ত্রিক শাস্তিদেব এবং শিক্ষা সমুচ্চয় ও বোধিচর্যবিতার-রচয়িতা প্রসিদ্ধ মহাযানী আচার্য শান্তিদেব সম্বন্ধেও বিদ্যমান। তারমাথের মতে মহাযানী শান্তিদেব ছিলেন সৌরাষ্ট্রের রাজপরিবারসম্ভত। কিছুদিন তিনি রাজা পঞ্চমসিংহের অন্যতম মন্ত্রী ছিলেন; পরে তিনি নালন্দা-বিহারে আসিয়া আচার্য জয়দেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পাগ-সাম-জোন-জাং গ্রন্থের মতে মহাযানী শান্তিদেবের বাল্যনাম ছিল শাস্তিবৰ্মা, পিতা ছিলেন কল্যাণবর্ম। এই মহাযানী আচার্য খুব সম্ভব সপ্তম-অষ্টম শতকের লোক। তাঙ্গুর গ্রন্থে বজ্রযানী তান্ত্রিক শান্তিদেবের তিনটি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়: শ্ৰীগুহাসমাজ-মহাযোগ-তন্ত্রাবলিবিধি, সহজঙ্গীতি ও চিত্তচৈতন্য শমনোপায়। তাঁহার বাড়ি ছিল জাহোরে। সুমপা বলিতেছেন, তান্ত্রিক শান্তিদেবের অন্য নাম ছিল ভুসুকু বা রাউতু। চর্যাগীতি-গ্রন্থের কয়েকটি গীতির রচয়িতা ছিলেন। সহজ-সিদ্ধাচার্য জনৈক ভুসুকু; সন্দেহ নাই, এই ভুসুকু ছিলেন বাঙালী। কিন্তু বজ্রযানী তান্ত্রিক শান্তিদেব ও বাঙালী সিদ্ধাচার্য ভুসুকু একই ব্যক্তি কিনা সে-সন্দেহ থাকিয়াই যায়।
শান্তিপাদ
চর্যাগীতিতে দেখিতেছি, শান্তি-পা বা শান্তিপাদনামে আর একজন বাঙালী গীত-রচয়িতা সিদ্ধাচার্য ছিলেন। এই শান্তিপাদের অন্য নাম ছিল রত্নাকর-শান্তি; তাঙ্গুর গ্রন্থ-তালিকায় দেখিতেছি, তিনি সুখদুঃখদ্বয়-পরিত্যাগসৃষ্টি নামে একটি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন; তাহা ছাড়া আরও ১৮টি তান্ত্রিক গ্রন্থেরও তিনি ছিলেন লেখক। তারনাথ বলিতেছেন, রত্নাকার শান্তির বাড়ি ছিল মগধে, বিক্রমশীল-বিহারের তিনি ছিলেন অন্যতম আচার্য, এবং সাত বৎসর তিনি সিংহলে প্রচারকার্যে রত ছিলেন। যাহাই হউক, মহাযানী শান্তিদেব ও -বজ্রযানী তান্ত্রিক শান্তিদেব ষে দুই ভিন্ন ব্যক্তি এ-সম্বন্ধে বোধ হয় সন্দেহের অবকাশ কম। তবে, তান্ত্রিক শান্তিদেব ও ভুসুকু একই ব্যক্তি হইলেও হইতে পারেন; উভয়েই একাদশ শতকের লোক। চর্যাগীতির শান্তিপাদ ও ত্যাঙ্গুরের রত্নাকরশান্তিও বোধ হয় একই ব্যক্তি।
সরোরুহবজ্র বা পদ্মবিজু
সরোরুহোবজ্র, কমলশীল, শান্তিরক্ষিত, পদ্মসম্ভব, ইহারা সকলেই প্রায় সমসাময়িক, আনুমানিক অষ্টম শতকের লোক। উদ্ভট্টীয়ান-বিনির্গত সরোরুহোবজের অন্য নাম ছিল পদ্মবঞ্জ; তিনি ছিলেন। হেবজাতন্ত্রের অন্যতম পুরোগামী আচার্য, উদ্ভট্টীয়ানবাসী অনঙ্গবজের গুরু এবং ইন্দ্রভূতির পরম গুরু। এই সরোরুহোবজকে পরবর্তীকালের সরহ-সরহপাদ বা সরহ-রাহুলভদ্রের সঙ্গে এক এবং অভিন্ন বলিয়া মনে করিবার কোনও কারণ নাই। বস্তুত, ত্যাঙ্গুর, পাগ-সাম-জোন-জাং, তারনাথ প্রভৃতির সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করিলে মনে হয়, সরহ নামে একাধিক বৌদ্ধ আচার্য ছিলেন, এবং তাহারা সকলেই কিন্তু সমসাময়িক ছিলেন না। তারনাথ তো পরিষ্কারই দুই সরহের ইঙ্গিত দিতেছেন, একজন সারাহ-রাহুলভদ্র, আর একজন সরহ-শাকরি। তাঙ্গুর গ্রন্থ-তালিকায় অনেকবারই সরহের উল্লেখ আছে এবং তাহার পরিচয় কখনও মহাচার্য, কখনও মহাব্ৰাহ্মণ, কখনও মহাযোগী বা যোগীশ্বর, কখনও মহাশবর, কখনও কৃষ্ণবংশধর, কখনও বা উদ্ভট্টীয়ান-বিনির্গত। ইহারা প্রত্যেকে এক এবং অভিন্ন কি না, বলা কঠিন; না হওয়াই সম্ভব। তবে দোহাকার এবং বজ্রযানী-সাধন-রচয়িতা সিদ্ধাচার্য সরহ-সরহপাদ এবং তারনাথ-কথিত সরহ-রাহুলভদ্র এক এবং অভিন্ন, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার কারণ দেখিতেছি না। সুম্পা বলিতেছেন, এই সরহ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন প্রাচ্য দেশে রঞ্জ শহরের এক ডাকিনীর গর্ভে এবং জনৈক ব্রাহ্মণের ঔরসে। জনৈক চন্দনপালের রাজত্বকালে তিনি রত্নপাল এবং তাঁহার সভাসদ ব্রাহ্মণ ও মন্ত্রীদের বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষাদান করেন। ওড়িবিষ বা ওড়বিষয়ে তিনি মন্ত্রযান শিক্ষা করেন; পরে তিনি মহারাষ্ট্রে গিয়া যোগিনী আচারে সিদ্ধ হন এবং সরহ নামে পরিচিত হন। তিনি কিছুদিন নালন্দায় মহাচার্যও ছিলেন। দীক্ষাদানকালে তিনি দোহাগান করিতেন; বস্তুত ত্যাঙ্গুর-তালিকায় তাহার কয়েকটি দোহা ও চর্যাগীতির উল্লেখও আছে। অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সংস্কৃত টীকাযুক্ত তদ্রচিত একটি দোহাসংগ্ৰন্থ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় প্রকাশও করিয়াছেন। তাহা ছাড়া, প্রাচীন বাঙলায় রচিত চারিটি গানও চর্যাগীতি গ্রন্থে স্থান পাইয়াছে। এই সব গানের ভণিতায় তাহার নাম দেওয়া হইয়াছে সরহপাদ। সুমপা-বর্ণিত চন্দনপাল ও রত্নপাল পাল-বংশেরই কেহ হইয়া থাকিবেন, যদিও ইহাদের ঐতিহাসিকত্ব কোনও স্বতন্ত্র সাক্ষ্যে সমর্থিত নয়। সরোরুহ বজা-পদ্মবঞ্জ অষ্টম শতকের লোক, কিন্তু সারাহ-রাহুলভদ্র বোধ হয় একাদশ শতকের আগেকার লোক নহেন।
