উল্লিখিত বৌদ্ধ আচার্যরা যে শুধু অবলোকিতেশ্বর, তারা, মঞ্জুশ্ৰী, লোকনাথ, হেরুক, হেবজ, প্রভৃতি বিচিত্র দেবদেবীর সাধনমন্ত্র, স্তোত্র, সংগীতি, মন্ত্র, মুদ্রা, মণ্ডল, যোগ, ধারণী, সমাধি প্রভৃতি লইয়াই গ্রন্থ-রচনা করিয়াছিলেন তাহাই নয়, যোগ ও দর্শন হেতুবিদ্যা ও চিকিৎসা-বিজ্ঞান, জ্যোতিষ ও শব্দবিদ্যা প্রভৃতি সম্বন্ধেও নানা গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। কাজেই, এই সব গ্রন্থের মধ্যেই সমসাময়িক জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিক্ষা-দীক্ষাও প্রতিফলিত।
উদ্দীযান জাহোর সাহোর
বলিয়াছি, এই সব বৌদ্ধ আচার্যরা প্রায় সকলেই ছিলেন বাঙালী, এবং ইহাদের কর্মভূমি ছিল পূর্ব-ভারত, প্রধানত প্রাচীন বাঙলা দেশ ও বিহার। কিন্তু বাঙালী বলিয়া দাবি করিবার আগে দুইটি স্থান-নাম সম্বন্ধে একটু আলোচনা প্রয়োজন। মহাযান-বজ্ৰযান-মন্ত্রযান প্রভৃতিকে আশ্রয় করিয়া এক সুবিপুল সংস্কৃত সাহিত্যের উদ্ভব ও প্রসার লাভ ঘটিয়াছিল, তাহার কিয়দংশ মাত্র তিব্বতী ভাষায় অনূদিত হইয়াছিল বাঙলা, বিহার, কাশ্মীর ও তিব্বতের নানা বৌদ্ধ বিহারে। এই অনূদিত গ্রন্থগুলির একটি তালিকা ত্রয়োদশ শতকে সংকলিত হইয়াছিল তিব্বতে, তিব্বতী লামা বু-তোন কর্তৃক; তালিকা-গ্রন্থটির নাম ত্যাঙ্গুর। এই অনুদিত গ্রন্থগুলির অধিকাংশই কালের প্রভাব এড়াইয়া আজি বীচিয়া আছে; মূল সংস্কৃত গ্রন্থগুলিরও কিছু কিছু পাওয়া গিয়াছে নেপালে এবং অন্যত্র। গ্রন্থগুলির অধিকাংশই বৃজযানী সাধন-সম্পর্কিত; তিব্বতীতে বলা হইয়াছে বৌদ্ধতন্ত্র বা র্গুদ (Rgyud); কিছু বৌদ্ধ সূত্র সম্বন্ধীয় বা ম্দো (Mdo)। যাহা হউক, এই সব গ্রন্থ-লেখকদের কাহারও কাহারও জন্মভূমি ছিল জাহোরে বা সাহেরে এবং উড্রউয়ানে, এবং লোকায়াত ঐতিহ্যমতে উদ্ভট্টীয়ানেই বজ্ৰযানের উদ্ভব। উদ্ভট্টীয়ান যে কোন স্থান তাহা লইয়া পণ্ডিত-মহলে প্রচুর মতভেদ বিদ্যমান। কাহারও মতে উড়াউীয়ান উত্তর-পশ্চিম সীমাপ্ত ও হিন্দুকুশের মধ্যবর্তী সোয়ান্টু উপত্যকায়, কাহারও মতে পূর্ব-তুৰ্কীস্থানের কাসাগরে, কাহারও মতে বাঙলা দেশে, কাহারও মতে বাঙলার পূব-সীমান্তে, আবার কাহারও মতে উড়িষ্যায়! এই সব বিভিন্ন মতামতের অরণ্য জাল ভেদ করিয়া সত্য নির্ণয় দুরূহ। তবে, একটি তথ্যের দিকে পণ্ডিত-সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন। নলিনীনাথ দাশগুপ্ত মহাশয়। ত্যাঙ্গুরে সরোহ (বক্রুজ) বা সূরহকে বলা হইয়াছে উদ্ভট্টীয়ান-বিনির্গত, কিন্তু পাগ-সাম-জোন-জাং-গ্রন্থে আবার সেই সরহকে বলা হইয়াছে বঙ্গালের অধিবাসী। তাঙ্গুরের এক অংশে যে অবধূতপাদ অদ্বয়বজকে বলা হইয়াছে উদ্ভট্টীয়ানবাসী বলিয়া, সেই তাঙ্গুরেরই অন্য অংশে সেই অদ্বয়বজকেই বলা হইয়াছে বাঙালী। পাগ সাম-জোন-জাং-গ্রন্থে যে লুইপাদকে বলা হইয়াছে উদ্ভট্টীয়ান বিনির্গত, ত্যাঙ্গুরে সেই লুইপাদকেই বলা হইয়াছে বাঙলার অধিবাসী। তাঙ্গুরে যে তৈলিকপাদকে বলা হইয়াছে উদ্ভট্টীয়ানবাসী, সেই তৈলিকপাদকেই পাগ-সাম-জোন-জাং-গ্রন্থে চট্টগ্রামীয় এক ব্ৰাহ্মণ বলিয়া বর্ণনা করিতেছেন। আবার, পাগ-সাম-জোন-জাং-গ্রন্থে নাগবোধির বাড়ি বলা হইয়াছে বরেন্দ্রর শিবসের গ্রামে; অথচ নাগবোধি স্বয়ং নিঞ্জের বর্ণনা দিয়াছেন উড়াউীয়ান বিনিৰ্গত বলিয়া। এত সব সাক্ষ্যের পর উড্ডীয়ান যে বাঙলা দেশের কোনও স্থান নয় এ কথা বলিতে একটু দ্বিধা হয় বই কি?
জাহোর বা সাহের সম্বন্ধেও একই সংশয়। সাহোরকে কেহ কেহ মনে করেন লাহোর, কেহ। বলেন হিমাচলের মণ্ডি, কেহ মনে করেন বাঙলার যশোর বা ঢাকা জেলার সাভার; আবার কেহ। কেহ মনে করেন। সমগ্র হিন্দস্তানেরই নাম জাহোর বা সাহোর। পাগ-সাম-জোন-জং-গ্ৰন্থ একবার শাস্তুরক্ষিতের পরিচয় দিয়াছে বাঙালী বলিয়া, আর একবার বলিতেছে, তিনি ছিলেন সাহেরের রাজ-পরিবারের সন্তান। অন্যত্র তিব্বতী ঐতিহো শাস্তুরক্ষিতকে স্পষ্টতই বলা হইয়াছে গৌড়ের অধিবাসী; তিব্বতী জনশ্রুতি মতে ধর্মপাল ছিলেন সাহোরের রাজা, এবং আর এক তিব্বতী ঐতিহ্যে বাঙালী দীপঙ্কর সম্বন্ধেও বলা হইয়াছে, তিনি ছিলেন সাহোর-রাজবংশোদ্ভূত। আনুমানিক ১৪০০ খ্ৰীষ্ট শতকে বাঙালী স্মর্ত পণ্ডিত শূলপাণিও আত্মপরিচয় দিয়াছেন সাহুরিয়ান বলিয়া। এই সব সাক্ষ্যে মনে হয়, জাহোর বা সাহেরও বাঙলাদেশেরই কোনও স্থান।
এই সব বাঙালী বৌদ্ধ আচার্যদের কাল সম্বন্ধেও নিঃসংশয় হওয়া কঠিন। তবু তিব্বতী ঐতিহ্য ও অন্যান্য সংক্ষ্যের উপর নির্ভর করিয়া কিছু কিছু কাল-নির্ণয়ের চেষ্টা হইয়াছে। এই সধ প্রচেষ্টা আশ্রয় করিয়া অগণিত বৌদ্ধ আচার্যদের মধ্যে স্বল্পমাত্র কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় লওয়ার চেষ্টা করা যাইতে পারে কতকটা আনুমানিক কালক্ৰমনুযায়ী।
বজ্রযানী তান্ত্রিক ও সিদ্ধাচাৰ্য আচাৰ্য-কুল। তাঁহাদের রচনা। অষ্টম-নবম শতক
প্রাচীনতম বজ্রযানী বৌদ্ধ আচার্যদের মধ্যে শান্তিরক্ষিত অন্যতম। সুমপা-বর্ণিত তিব্বতী ঐতিহ্যমতে শান্তিরক্ষিত ছিলেন জাহোর-রাজবংশের সন্তান। গোপালের রাজত্বকালে তাঁহার জন্ম, ধর্মপালের রাজত্বকালে মৃত্যু। শাস্তিরক্ষিতের জন্মভূমি বাঙলাদেশে হউক বা না হউক, তাহার কর্মভূমি যে ছিল প্ৰাচুৰ্য-ভারত এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। তাঙ্গুর গ্রন্থ-তালিকায় দেখা যায়, তিনি অন্তত তিন খানা বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন; অষ্টতথাগতস্তোত্র, বজধার-সংগীত-ভগবত-স্তোত্ৰটীকা এবং পঞ্চমহোপদেশ। তাহার অন্য নাম ছিল আচার্য বোধিসত্ত্ব, এবং সেই নামেও সপ্তস্তথাগত সম্বন্ধে আরও চারখানি বই তিনি লিখিয়াছিলেন। তিব্বতী ঐতিহ্যে এই বজ্রযানী বৌদ্ধ আচার্য শান্তিরক্ষিত এরং মহাযানী নৈয়ায়িক ও দার্শনিক শান্তিরক্ষিত একই ব্যক্তি। নৈয়ায়িক শান্তিরক্ষিত ছিলেন স্বতন্ত্র মধ্যমক মতের অনুগামী এবং নালন্দা-মহাবিহারের অন্যতম আচার্য। তিনি সুপ্ৰসিদ্ধ তত্ত্বসংগ্ৰহ, বাদনায়বৃত্তি-বিপঞ্চিতাৰ্থ এবং মধ্যম-কালঙ্কার-কারিকা প্রভৃতি গ্রন্থের প্রখ্যাত লেখক। তাঁহার অগাধ পণ্ডিত্য ও মনীষা এবং বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ্য অধ্যাত্মচিন্তায় সুগভীর জ্ঞান সদ্যোক্ত তিনটি গ্রন্থে সুপরিস্ফুট। তাহার শিষ্য কমলশীল প্রথমোক্ত গ্রন্থটির একটি টীকা রচনা করিয়াছিলেন। এই কমলশীল ছিলেন লুই-পা বা লুইপাদের সমসাময়িক। তিব্বতী ঐতিহ্যমতে শাস্তিরক্ষিতের ভগ্নিপতি ছিলেন উদ্ভট্টীয়ান বা ওডউীয়ানবাসী রাজকুমার পদ্মসম্ভব।
