অ্যালপো-দীনারায় জাতির লোকেরা আর্যভাষাভাষী, কিন্তু তাঁহাদের ভাষার স্বরূপ কী ছিল, তাহা সঠিক বলিবার উপায় প্রায় নাই বলিলেই চলে। গ্ৰীয়ার্সন সাহেব গুজরাত, মহারাষ্ট্র, মধ্যভারত, উড়িষ্যা, কতকাংশে বিহার, বঙ্গদেশ ও আসামের outer Aryans বা বেদ বহির্ভূত যে সব আর্যভাষাভাষী লোকদের কথা বলেন এবং বৈদিক আর্যভাষা হইতে উদ্ভূত সিন্ধু-গঙ্গা উপত্যকার হিন্দী, রাজস্থানী প্রভৃতি ভাষা হইতে পৃথক গুজরাতী, মারাঠী, ওড়িয়া, বাঙলা, অহমীয়া প্রভৃতি আর্যভাষার যে কথা ইঙ্গিত করেন তাহা যদি সত্য হয় তাহা হইলে বাঙলা, মারাঠী, ওড়িয়া, গুজরাতী, অহমীয়া ইত্যাদি ভাষার মূল, প্রধান ও বিশিষ্ট রূপই যে অ্যালপো-দীনারায় জাতির ভাষারূপ তাহা অস্বীকার করিবার উপায় থাকে না। কারণ, গ্ৰীয়ার্সনের এই “Outer Aryans” যে অ্যালপাইন জাতিরই অন্যতম শাখা রমাপ্রসাদ চন্দ মহাশয় বহুদিন আগেই তাহা সুপ্রমাণ করিয়াছেন এবং নরতত্ত্ববিদেরা প্রায় সকলেই তাহা স্বীকার করেন।
মোঙ্গোলীয় ভোট-ব্রহ্ম ভাষার প্রভাব প্রাচীন অথবা বর্তমান বাঙলায় প্রায় নাই বলিলে খুব অযৌক্তিক হয় না। নরতত্ত্বের দিক হইতে মোঙ্গোলীয় রক্তপ্রবাহ বাঙালীর মধ্যে যেমন ক্ষীণ ও শীর্ণ মোঙ্গোলীয় ভাষা-প্রভাবও তাহাই। তবে উত্তরতম ও পূর্বতম প্রান্তের মোঙ্গোলস্পষ্ট লোকদের ভিতর চলতি বুলিতে কিছু ভোট-ব্রহ্ম শব্দের সন্ধান পাওয়া যায়। আর, অন্তত একটি নদীর নাম যে ভোট-ব্রহ্ম ভাষা হইতে গৃহীত তাহা নিঃসংশয়ে বলা যায়; এই নদীটি দিস্তাং বা তিস্তা যাহার পরবর্তী সংস্কৃত রূপ ত্রিস্রোতা।
যাহা হউক, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও বেদ বহির্ভূত আর্যভাষা প্রবাহের উপর তরঙ্গের পর তরঙ্গ আসিয়া ভাঙিয়া পড়িল বৈদিক আর্যভাষা প্রবাহের প্রবল স্রোত। একদিনে নয়, দু-দশ বৎসরে নয়, শত শত বৎসর ধরিয়া এবং কালে কালে ক্রমে ক্রমে এই ভাষা সমস্ত পূর্বতন ভাষা-প্রবাহকে আত্মসাৎ করিয়া তাহাদের নবরূপ দান করিয়া, তাঁহাদের সংস্কৃতিকরণ সাধন করিয়া নিজের এক স্বতন্ত্র রূপ গড়িয়া তুলিল। তাহার ফলে যে সংস্কৃত ভাষার বিকাশ হইল তাহাতে অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় শব্দ, পদবচনারীতি, ব্যাকরণ পদ্ধতি সমস্তই কিছু কিছু ঢুকিয়া পড়িল। সাম্প্রতিক কালে শব্দ ও ভাষাতাত্ত্বিকেরা তাহা অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া দেখাইয়া দিতেছেন। বাঙলাদেশেও তাহার প্রচলন হইল, কিন্তু দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শতকের সংস্কৃত লিপিগুলিতে দেখা যাইবে, সেই সংস্কৃত ভাযায়ও এমন সব শব্দের দেখা পাওয়া যাইতেছে, এমন ব্যাকরণ বৈশিষ্ট্যের দর্শন মিলিতেছে যাহা বাঙলার বাহিরে দেখা যায় না; ‘বরজ’, ‘ডালিম্ব’ (সংস্কৃত দাড়িম্ব নয়), লগ্গাবয়িত্বা (লাগাইয়া অর্থে) ইত্যাদি তাহার কয়েকটি দৃষ্টান্ত মাত্র।
একান্তভাবে ভাষার দিক হইতে এই আর্যীকরণ সম্বন্ধে সুনীতিকুমার যাহা বলিয়াছেন তাহা উদ্ধারযোগ্য। এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই উদ্ধৃতির ভিতর আর্য বা অনার্য বলিতে তিনি আর্য ভাষা ও অনার্য ভাষাকেই বুঝাইতেছেন; যেখানে আর্য বা অনার্য নরগোষ্ঠী বলিতেছেন, সেখানেও আমি আর্য বা অনার্য ভাষাভাষী নরগোষ্ঠী হিসাবেই বুঝিতেছি, কারণ, আমি আগেই বলিয়াছি, নরতত্ত্বের দিক হইতে আর্য-নরগোষ্ঠী বা দ্রাবিড়-নরগোষ্ঠী— এই ধরনের কথা ব্যবহার করা অযৌক্তিক। অ্যালপো-দীনারায় নরগোষ্ঠীর লোকেরাও আর্যভাষাভাষী, আবার আদি-নর্ডিকেরাও তাহাই; আর দ্রাবিড়ভাষাভাষী লোকদের মধ্যে যে বিভিন্ন জন বিদ্যমান, সে ইঙ্গিতও আগেই করিয়াছি। এই কথাটা যাহাতে আমরা বিস্মৃত না হই সেই জন্য বন্ধনীর ভিতর আমি তাহা উল্লেখ করিয়া দিতেছি।
“ভারতবর্ষের সু-সভ্য, অর্ধ-সভ্য ও অ-সভ্য, সব রকমের অনার্য [ভাষাভাষী] আদিম অধিবাসীদের সঙ্গে আর্য [ভাষী]দের প্রথম সংস্পর্শ হয়তো বিরোধময়ই হইয়াছিল। কিন্তু অনার্য [ভাষাভাষী] ভারতে আর্য [ভাষী]দের উপনিবেশ স্থাপিত হইবার পর হইতেই উভয় শ্রেণীর মানুষ—অনার্য [ভাষী] ও আর্য [ভাষী]–পরস্পরের প্রতিবেশ-প্রভাবে পড়িতে থাকে। আর্য [ভাষী]রা বিদেশ হইতে আগত এবং পার্থিব সভ্যতায় তাহারা খুব উচ্চে ছিল না। আর্য [ভাষী]দের ভাষা আসিয়া দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক ভাষাগুলিকে হীনপ্রভ করিয়া দিল; উত্তর-ভারতের কোল ও দ্রাবিড় [ভাষী] অনার্য ভাষীদের মধ্যে ঐক্যবিষয়ক ভাষার অভাব ছিল, আর্য [ভাষী] নরগোষ্ঠীর বিজেতৃ-মর্যাদা লইয়া আর্যভাষা সে অভাব পূর্ণ করিল। …আর্য[ভাষী নরগোষ্ঠীর] ভাষা ও আর্য[ভাষী নরগোষ্ঠীর] ধর্ম—বৈদিক ধর্ম ও বৈদিক হোম-যজ্ঞাদি অনুষ্ঠান—অনার্য [ভাষী]রা শিরোধার্য করিয়া লইল; অনার্যা[ভাষী] আর্য[ভাষী]র পুরোহিত-ব্রাহ্মণের শিক্ষাও মানিল। কিন্তু অনার্যা[ভাষী] নরগোষ্ঠীর ধর্ম মরিল না, তাঁহাদের ইতিহাস-পুরাণও মরিল না; ক্রমে অনার্যা[ভাষী] নরগোষ্ঠীর ধর্ম ও অনুষ্ঠান পৌরাণিক দেবতাবাদে পৌরাণিক পূজাদিতে, যোগচৰ্যায়, তান্ত্রিক মতবাদে ও অনুষ্ঠানে আর্যভাষীদের বংশধরদিগের দ্বারাও গৃহীত হইল। আর্য ও অনার্য ভাষা[ভাষী] নরগোষ্ঠী] এই টানা ও পড়িয়ান মিলাইয়া হিন্দু-সভ্যতার বস্ত্রবয়ন করা হইল।
“উত্তর-ভারতের গঙ্গাতীরের আর্য[ভাষী নরগোষ্ঠীর] সভ্যতার পত্তন এইরূপে হইল। এই সভ্যতায় আর্য[ভাষী নরগোষ্ঠী] অপেক্ষা অনার্যা[ভাষী নরগোষ্ঠী]র দানই অনেক বেশি–কেবল আর্য[ভাষী]দের ভাষা ইহার বাহন হইল। আর্য[ভাষী]দের আগমনের সময় হইতেই হইতেছিল; গঙ্গাতীরবর্তী দেশসমূহে ইহা আরও অধিক পরিমাণে হইল।. বাঙলাদেশে আর্য-ভাষা লইয়া যখন উত্তর-ভারতের—বিহার ও হিন্দুস্থানের—লোকেরা দেখা দিল, যখন উত্তর-ভারতের মিশ্র আর্য-অনার্য[ভাষী নরগোষ্ঠী] সৃষ্ট ব্রাহ্মণ্য, বৌদ্ধ, জৈন মতবাদ বাঙলাদেশে আসিল, তখন উত্তর-ভারতে মোটামুটি এক সংস্কৃতি ও এক জাত হইয়া গিয়াছে। রক্তের বিশুদ্ধি বোধহয় তখন কোনও আর্যভাষী বংশীয়ের ছিল না।”
