সন্ধ্যাকর-নদীর রামচরিত
পাল-চন্দ্রপর্বে বাঙলা দেশে রামায়ণ কাহিনী সুপ্রচলিত ছিল এবং উচ্চকোটিস্তরে রাম-সীতার মূর্তিপূজা প্রচলিত থাকুক বা না থাকুক, অন্তত ইহারা লোকের শ্রদ্ধা এবং পূজা আকর্ষণ করিতেন, সন্দেহ নাই। অভিনন্দ-রচিত রামচরিতই প্রাচীন বাঙলার একমাত্র রাম-কাব্য নয়; সন্ধ্যাকর-নন্দী নামে প্ৰসিদ্ধতর আর একজন কবি রামচরিত নামেই আর একখানা ঐতিহাসিক কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। ঐতিহাসিক কাব্য বলিতেছি। এই অর্থে যে, সন্ধ্যাকরের কাব্যটি দ্ব্যর্থব্যঞ্জক; এক অর্থে রামচন্দ্রের কাহিনী, অপর অর্থে পালরাজ রামপাল এবং তাহার উত্তরাধিকারীদের ইতি-কাহিনী। গ্রন্থের শেষে যে-কবিপ্রশস্তি আছে তাহা হইতে জানা যায়, সন্ধ্যাকরের পিতার নাম ছিল প্রজাপতি-নন্দী, পিতামহের নাম পিণাক-নদী, এবং জন্মভূমি ছিল ব্লরেন্দ্ৰান্তৰ্গত পুণ্ড্রবর্ধনপুরে। প্রজাপতি-নন্দী ছিলেন রামপালের সান্ধিবিগ্রহিক। গ্রন্থ-রচনা আরম্ভ কবে হইয়াছিল, বলা কঠিন, তবে কৈবর্ত-বিদ্রোহ এরং দ্বিতীয় মহীপালের হত্যা হইতে আরম্ভ করিয়া মদনপালের রাজত্ব পর্যন্ত সমস্ত ইতিহাসের বর্ণনা হইতে মনে হয়, মদনপালের রাজত্বকালে গ্রন্থ-রচনা সমাপ্ত হইয়াছিল। সন্ধ্যাকর-নন্দী সমসাময়িক ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য; সেই হিসাবে তাহার কাব্যের ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। কিন্তু এই গ্রন্থের যথার্থ সাহিত্যমূল্য স্বল্প এবং মৌলিকত্বও তেমন কিছু নাই। কাব্যটি সুপ্ৰসিদ্ধ রাঘবপাণ্ডবীয়-কাব্যের ধারার অনুকরণ এবং প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত ইহার ২২০টি আর্যশ্লোক শ্লেষচাতুর্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। সন্ধ্যাকর আত্মপরিচয় দিতেছেন। ‘কলিকাল-বাল্মীকি বলিয়া, এবং তিনি যে শুধু অলংকারবিদ সুনিপুণ কবি তাঁহাই নয়, কুশলী ভাষাবিদও, এ-দাবিও করিতেছেন। তাঁহার শেষোক্ত দাবি সার্থক, কারণ, শব্দ ও ভাষার উপর যথেষ্ট দখল না থাকিলে আর্যর মতো সুকঠিন ছন্দে এবং মাত্র ২২০টি শ্লোকে একাধারে রামপাল-কথা এবং রামায়ণ-কথা বর্ণনা কিছুতেই সম্ভব হইত না। কিন্তু বাল্মীকির সঙ্গে তুলনা অলংকৃত দাবি, সন্দেহ নাই। অলংকার প্রিয়তায়, শ্লেষোক্তিতে এবং কাব্যের অন্যান্য লক্ষণে সন্ধ্যাকর-নদীর রামচরিত অষ্টম-নবম-দশম-একাদশ শতকীয় সংস্কৃত কাব্যের সমগোত্রীয়।
অবাস্তর হইলেও এ-প্রসঙ্গেই উল্লেখযোগ্য যে, রঘুপতি রামের পূজা এবং তাহার প্রতি শ্রদ্ধা পরবর্তী সেন-বৰ্মণ পর্বে বোধ হয় বাড়িয়াই গিয়াছিল, এবং হয়তো রামের মূর্তিপূজাও প্রচলিত হইয়া থাকিবে? ধোয়ী-কবি তাহার পবনদূতে যে ভাবে স্বর্ণদী বা ভাগীরথীতীরে রঘুকুলগুরু দেবতার উল্লেখ করিয়াছেন, মনে হয়, মধ্য ও দক্ষিণ-ভারতের মতো বাঙলাদেশেও রাম-সীতার পূজা প্রচলিত ছিল। পরে কোনও সময়ে তাহা অপ্রচলিত হইয়া গিয়া থাকিবে।
ক্ষেমীশ্বর চণ্ডকৌশিক
তবে, চণ্ডকৌশিক-প্রণেতা নাট্যকার ক্ষেমীশ্বর বাঙালী হইলেও হইতে পারেন। নাটকটির নদী অংশের একটি শ্লোক হইতে জানা যায়, গ্রন্থটি রচিত হইয়াছিল। মহীপালের প্লাজসভায়। এই মহীপাল পাল-রাজ মহীপাল হইতে পারেন, আবার গুর্জর-প্ৰতীহাররাজ মহীপাল হইতেও বাধা কিছু নাই। নাটকে বর্ণিত রাজা কর্ণাটক সৈন্যদের পরাভূত করিয়াছিলেন; এই রাজা মহীপাল হওয়া কিছু বিচিত্র নয়। কিন্তু পাল-রাজ মহীপাল যেমন একাধিক কর্ণাটক বাহিনীর সম্মুখীন হইয়াছিলেন, তেমনই প্ৰতীহার-রাজ মহীপালকেও রাষ্ট্ৰকুট-বাহিনীর সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল, এবং এই রাষ্ট্রকূট-বাহিনীকে যদি কর্ণাটক বাহিনী বলা যায় তাহা হইলে খুব অন্যায় কিছু করা হয় না। কিন্তু চণ্ডকৌশিক-নাটকের সর্বপ্রাচীন যে দুইটি পাণ্ডুলিপি বিদ্যমান (১২৫০ ও ১৩৮৭ খ্ৰীষ্ট শতকে অনুলিখিত) দুইটিই পাওয়া গিয়াছে নেপালে; সন্দেহ নাই যে, বিহার-বাঙলাদেশ হইতেই সেগুলি নেপালে গিয়া থাকিবে। সেই জন্যই মনে হয়, ক্ষমীশ্বর বাঙালী হউন, বা না হউন তাঁহার কর্মক্ষেত্র বোধ হয় ছিল বিহার-বাঙলা দেশ, এবং চণ্ডকৌশিক-নাটকের প্রচলনও বেশি ছিল এই দুই দেশেই।
মার্কণ্ডেয়-পুরাণবর্ণিত বিশ্বামিত্র-হরিশ্চন্দ্রের কাহিনী লইয়া পঞ্চাঙ্ক চণ্ডকৌশিক নাটক। সমস্ত কাহিনীটি নাটকীয় গুণে দুর্বল, এবং ক্ষেমীশ্বরের কবিকল্পনা ও কাব্যকৌশলও খুব উচ্চস্তরের নয়। সংস্কৃত নাট্যসাহিত্যে সেইজন্য চণ্ডকৌশিকের স্থান খুব গর্বের বস্তু নয়। মহাভারতীয় নল-কাহিনী লইয়া ক্ষেমীশ্বর নৈষধানন্দ নামে আর একটি সপ্তাঙ্ক নাটক রচনা করিয়াছিলেন।
কীৰ্তিবর্মার কীচকবধ
বরং অলংকারবহুল কাব্য হিসাব নীতিবর্মর কীচকবধ উল্লেখযোগ্য। মহাভারতীয় বিরাটপর্বের সুপরিচিত কীচকবধ উপাখ্যানটি ১৭৭টি শ্লোকে পাচটি সর্গে বর্ণিত, কিন্তু মহাভারতের সকল সারল্য নীতিবর্মীর রচনায় অনুপস্থিত। তাহার পরিবর্তে আছে শ্লেষ ও যমকালঙ্কার ব্যবহারের নৈপুণ্য, কবির শব্দ ও বাকভঙ্গির চাতুর্য। সেইজন্যই পরবর্তী বৈয়াকরণিক-অভিধানিক-আলঙ্কারিকেরা নীতিবর্মর কীচকবধ হইতে প্রয়োজন হইলেই দৃষ্টান্ত আহরণ করিতে কার্পণ্য করেন নাই।। ১০৬৯ খ্ৰীষ্ট শতকে নামি-সাধু নামে জনৈক আলংকারিক রুদ্রটের কাব্যালঙ্কারের একটি টীকা রচনা করিয়াছিলেন; এই টীকায়ই সর্বপ্রথম কীচকবধ হইতে উদ্ধৃতি গ্রহণ করা হইয়াছে। নীতিবর্মার ব্যক্তিগত জীবন-সম্বন্ধে কোনও তথ্যই আমাদের জানা নাই, তবে তাহার পৃষ্ঠপোষক হয় কলিঙ্গের রাজা ছিলেন না হয় কলিঙ্গ জয় করিয়াছিলেন, এই রকমের একটু ইঙ্গিত কাব্যটির প্রথম সর্গেই আছে। কিন্তু বাঙলা অক্ষরের পাণ্ডুলিপি ছাড়া আর কোনো অক্ষরে কীচকবধের কোনও পাণ্ডুলিপি এ-পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই; তাছাড়া, কাব্যটির প্রত্যেকটির টীকাকুরিই বাঙালী। সেই জন্যই মনে হয়, নীতিবর্মার কর্মক্ষেত্র ছিল বাংলাদেশ, এবং কাব্যটির প্রচলনও এই দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল।
