সিদ্ধার্থস্য পরার্থ সুস্থিত মতেঃ সন্মাগমভ্যস্যতঃ
সিদ্ধিঃ সিদ্ধিমনুত্তরাং ভগবতস্তস্য প্রজাসু ক্রিয়াৎ।
যস্ত্ৰৈধাতুকসত্বসিদ্ধিপদবীরত্যুগ্রবীৰ্যোদয়াজ
জিত্ব নিবৃতিমাসসাদ সুগতঃ সন সর্বভূমীশ্বরঃ।
যাঁহার মতি পরার্থে সুস্থিত, যিনি সৎমার্গ অভ্যাস করিয়াছেন, যিনি অত্যুগ্রবীর্য বলে ত্ৰিলোকবাসী জীবের সিদ্ধির উপায় জয় করিয়া নিবৃত্তি লাভ করিয়াছেন, যিনি সুগত এবং যিনি সর্বভূমীশ্বর, এমন ভগবান সিদ্ধার্থের সিদ্ধি তাঁহার প্রজাদিগকে অনুত্তর সার্থকতা দান করুক।
(দেবপালদেবের মুঙ্গের ও নালন্দা-লিপির প্রথম শ্লোক)
মৈত্রীং কারুণ্যরত্নপ্রমুদিতহাদয়ঃ প্রেয়সীং সন্দধানঃ সম্যকসম্বোধিবিদ্যাসরিদমলজলক্ষালিতাজ্ঞানপঙ্কঃ।
জিত্ব যঃ কামকারি প্রভাবভিভবং শাশ্বতীং প্রাপ্য শান্তিং
স শ্ৰীমান লোকনাথো জয়ক্তি দশক লোহ নাশ্চ গোপালদেবঃ ॥
যিনি কারুণ্যরত্নপ্রমুদিত হৃদয়ে মৈত্রীকে প্রেয়সীরূপে ধারণ করিয়াছেন, যিনি সম্যক সম্বোধিবিদ্যারূপ নদীর অমল জলে অজ্ঞান পাঙ্ক ক্ষালন করিয়াছেন, যিনি মোররূপ অরির আক্রমণ পরাভূত করিয়া শাশ্বত শাস্তি প্রাপ্ত হইয়াছেন, এমন শ্ৰীমান দশাবল লোকনাথ এবং গোপালদেব জয়যুক্ত হউন।
(নারায়ণপালদেবের ভাগলপুর-লিপির প্রথম শ্লোক)
বন্দো জিনঃ স ভগবান করুণৈকপাত্ৰং ধর্মোেহপ্যাসৌ বিজয়তে জগদেকদীপঃ
যৎসেবয়া সকল এব মহানুভবঃ সংসারপারমুপগচ্ছতি ভিক্ষু সঙঘঃ ॥
করুণার একমাত্র পাত্র ভগবান জিন বন্দিত হউন; জগতের একমাত্র দীপ ধৰ্মও জয়যুক্ত হউন; ইহাদের সেবায় সকল মহানুভবভিক্ষুসংঘ সংসারের পার প্রাপ্ত হয়।
(শ্ৰীচন্দ্রদেবের রামপাল ও কেদারপুর-লিপির বন্দনা শ্লোক)
বাল্যৎ প্রভৃত্যহরহার্যদুপসিতাসি বাগদেবতে তদধুনা ফলতু প্ৰসীদ।
বক্তাস্মি ভট্টভবদেবকুলপ্রশস্তিসূক্তাক্ষরণি রসনাগ্রমধিশ্রয়েথাঃ।
হে বাগদেবি, বাল্যকাল হইতে তুমি প্রত্যহ উপাসিত হইয়াছ, সেই উপাসনা এখন ফলবতী হউক, তুমি প্রসন্না হও। ভট্টভবদেবের কুলপ্রশস্তি সুললিত ভাষায় বর্ণনা করিব, তুমি রসনাগ্রে অধিষ্ঠিত হও।
(ভট্ট-ভবদেবের ভুবনেশ্বর-প্রশস্তি; রচয়িত বাচস্পতি কবি)
ভট্ট গুরবমিশ্রেীর প্রশস্তি, ভোজ্যবর্মার বেলাব প্রশস্তি, সমস্তই এ-যুগের কাব্যচর্চার বিশিষ্ট দৃষ্টান্ত। বৈদ্যদেবের কমৌলি-লিপিটির রচয়িতা কবি মনোরথ; এই লিপিটিতে সেকালের নৌযুদ্ধের একটি সুন্দর বর্ণনা আছে :
যস্যানুত্তরবঙ্গসঙ্গর জয়ে নৌবাটহীহীরব —
ত্ৰস্তৈদিকরিভিশ্চ যন্নচলিতং চেন্নাস্তি তদৃগম্যভূঃ।
কিঞ্চোৎপাত্তুককেনিপাতপতন প্রোৎসপি তৈঃ শীকরৈর
আকাশে স্থিরতা কৃতা যদি ভবেৎ স্যাম্নিষ্কলঙ্কঃ শশী৷
যাহার দক্ষিণবঙ্গযুদ্ধজয়ে নৌবাহিনীর হীহী রবে ত্ৰস্ত হইয়া দিগগজেরা যে পলায়ন করে নাই তাহার কারণ তাহাদের যাইবার স্থান ছিল না। তাহা ছাড়া দাড়গুলির উৎক্ষেপে উৎক্ষিপ্ত জলকণা যদি আকাশে স্থির হইয়া থাকিত – তাহা হইলে চন্দ্রের কলঙ্ক ঢাকা পড়িত।
গৌড় অভিনন্দ
সংকলয়িতা শার্সধর তাহার শার্স ধর-পদ্ধতি (১৩৬৩ খ্রী:) নামক গ্রন্থে গৌড়-অভিনন্দ নামে এক কবির দুইটি শ্লোক উদ্ধার করিয়াছেন; এই দুইটির একটি শ্লোক শ্ৰীধরদাস তাহার সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থেও উদ্ধার করিয়াছেন, কিন্তু শ্ৰীধরের মতে তাহার রচয়িতা কবি শুভাঙ্গ বা শুভঙ্ক। শাঙ্গধর-পদ্ধতি-গ্রন্থে আরও দুইটি শ্লোক উদ্ধার করা হইয়াছে (কবি) অভিনন্দের রচনা বলিয়া; এই অভিনন্দের গৌড় অভিধা অনুপস্থিত। গৌড় অভিধাবিহীন অভিনন্দর ৫টি শ্লোক কবীন্দ্রবচন-গ্রন্থে, ২২টি শ্লোক সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থে, ৬টি শ্লোক, কলহণের শুক্তিমুক্তাবলীতে এবং একটি পদ্যাবলীতে উদ্ধৃত হইয়াছে। এই অভিনন্দরই দুইটি শ্লোক রামচরিতে উদ্ধার করা হইয়াছে এবং একাধিক শ্লোকাংশ উজ্জ্বলদত্ত এবং বৃহস্পতি রায়মুকুটও ব্যবহার করিয়াছেন। কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়-গ্রন্থে (একাদশ শতক) যে কবি অভিনন্দর উল্লেখ আছে তিনি খুব সম্ভবত এই অভিধাবিহীন অভিনন্দ, কিন্তু ইনি এবং গৌড়-অভিনন্দ একই ব্যক্তি কিনা, নিঃসন্দেহে বলা কঠিন। গৌড়-অভিনন্দ বাঙালী ছিলেন, তাহার অভিধাতেই প্রামাণ। অভিধাবিহীন কবি অভিনন্দের ২২টি শ্লোক বাঙালী শ্ৰীধরদাস কর্তক সংকলিত হইতে দেখিয়া মনে হয়, ইনিও বোধ হয় বাঙালী ছিলেন এবং তাহা হইলে এই দুই অভিনন্দ এক হইতে কিছু বাধা নাই। গৌড়-অভিনন্দ কাদম্বরী-কথাসার নামেও একখানি গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন, পদ্যে।
অভিনন্দ ও রামচরিত
সােদৃঢলের উদয়সুন্দরীকথা-গ্রন্থে আর এক সুপ্রসিদ্ধ কবি অভিনন্দর কথা আছে। এই অভিনন্দ এক পালবংশীয় যুবরাজের সভাকবি ছিলেন এবং রামচরিত নামে একটি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। এই কাব্য হইতে জানা যায়, যুবরাজের বিরুদ ছিল হারবর্য এবং তিনি ছিলেন দিগ্বিজয়ী বীর। তাহার পিতার নাম ছিল বিক্রমশীল এবং তিনি স্বয়ং ছিলেন ধর্মপাল-কুল-কৈরব-কাননেন্দু এবং পালকুল-প্রদীপ, পালকুলচন্দ্র। সন্দেহ নাই যে, যুবরাজ হারবর্ষ ছিলেন পালবংশীয়, এবং নৃপতি ধর্মপালের বংশধর। ধর্মপালের অন্য একটি নাম বা বিরুদ ছিল বিক্রমশীল, এ-তথ্য তিব্বতী ঐতিহ্যে সুস্পষ্ট। সুতরাং এই অনুমান অনৈতিহাসিক নয় যে, যুবরাজ হারবর্ষ এবং দেবপাল একই ব্যক্তি। এ অনুমান সত্য হইলে রামচরিতের কবি অভিনন্দকে বাঙালী বলিতে আপত্তি হইবার কারণ নাই। তাহা ছাড়া, বাঙলাদেশে বাঙালী কবি কর্তৃক রচিত এই প্রাচীনতম রামচরিত বা রামায়ণ-কাব্যের একটি স্থানীয় বৈশিষ্ট্য আছে; তাহা দেবীমাহাত্ম্য কীর্তন, যদিও তাহা হনুমানের মুখে, শ্ৰীরামচন্দ্রের মুখে নয়।
