কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়
একাদশ-দ্বাদশ শতকের আদি বঙ্গক্ষেরে লেখা একটি কবিতা-সংগ্ৰহ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়াছে নেপালে; পুঁথিটি খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ; নাম কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়। সংকলয়িতার নাম
জানিবার উপায় নাই, তবে তিনি বৌদ্ধ ছিলেন। বইখানি যে বাঙলাদেশেই সংকলিত হইয়া পরে অন্যান্য অনেক গ্রন্থের মতো নেপালে নীত হইয়াছিল, এই অনুমান অযৌক্তিক নয়। বইটিতে ১১১ জন বিভিন্ন কবি-বিরচিত ৫২৫টি শ্লোক আছে, এবং এই ১১১ জনের মধ্যে কালিদাস, অমরু, ভবভূতি, রাজশেখর প্রভৃতি সৰ্ব্বভারত প্ৰসিদ্ধ কবিদের রচনা যেমন আছে তেমনই এমন অনেকের রচনা আছে যাঁহাদের বাঙালী বলিয়া মনে করিবার কারণ বিদ্যমান। গৌড়-অভিনন্দ, ডিম্বোক বা হিম্বোক, কুমুদাকর মতি, ধর্মকর, বুদ্ধাকরগুপ্ত, মধুশীল, বাগোক, বীর্যমিত্র, বৈদ্দোক, শুভঙ্কর, শ্রীধর-নন্দী, রতিপাল, যোগোক, সিদ্ধোক, সোনোক বা সোন্নোক, হিঙ্গোক, বৈদ্যধন্য, অপরাজিত-রক্ষিত, প্রভৃতি কবিদের এই সব নাম হইতে বুঝিতে পারা যায়, ইহারা বাঙালী ছিলেন, এবং ইহারা অনেকেই ছিলেন বৌদ্ধ। সংস্কৃত সাহিত্যে এই ধরনের কবিতা-সংগ্রহ বা কবিতা-চয়নিকার-ধারার উদ্ভব বোধ হয়ে এই পর্বের বাঙলা দেশেই, এবং কবীন্দ্রবচনসমুচ্চই এই জাতীয় সর্বপ্রথম সংকলন-গ্ৰন্থ; এর পরের পর্বের সদুক্তিকর্ণামৃতের সংকলয়িতাও একজন বাঙালী।
মহাকাব্য, এমন কি ছোট ছোট রসহীন, পাণ্ডিত্যপূৰ্ণ কাব্য বোধ হয় সমসাময়িক শিক্ষিত বাঙালীর খুব বেশি রুচিকর ছিল না; তাহার বেশি রুচিকর ছিল অপভ্রংশ এবং প্রাকৃত পদ ও ছড়া, ছোট ছোট সংস্কৃত কবিতা, প্রকীর্ণ শ্লোক! এই সব সংস্কৃত শ্লোক ও পদের মধ্যে শুধু যে সমসাময়িক সংস্কৃত কাব্যরীতির পরিচয়ই আছে তাঁহাই নয়, বাঙলাদেশের প্রাকৃতিক রূপ এবং সমসাময়িক বাঙালীর কল্পনা এবং মানসপ্রকৃতিও সুস্পষ্ট ধরা পড়িয়াছে। দুই একজন মহিলা কবির পরিচয়ও পাইতেছি- ভাবাক বা ভাব-দেবী ও নারায়ণ-লক্ষ্মী।
নবম শতকের মধ্যভাগে কামরূপাধিপতি বনমালবর্মদেবের একটি লিপিতে বোধ হয় সর্বপ্রথম রাধাকৃষ্ণের ব্রজলীলার সুস্পষ্ট আভাস পাইতেছি। ভোজবর্মার বেলাবলিপিতেও সে উল্লেখ সুস্পষ্ট। কিন্তু কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়-গ্রন্থে উদ্ধৃত বাঙালী কবি রচিত কয়েকটি বিচ্ছিন্ন শ্লোকে এই ব্রজলীলার যে-চিত্র দৃষ্টিগোচর, গীতগোবিন্দের আগে সে-চিত্র আর কোথাও দেখা যায় না। তিনটি শ্লোক এখানে উদ্ধার করিতেছি।
কোহয়ং দ্বারি হরিঃ প্ৰযাস্থ্য পবনং শাখা মৃগেনাত্র কিং
কৃষ্ণোহহং দয়িতে বিভেমি সুতরাং কৃষ্ণং কথঃ বানরঃ।
মুগ্ধোহহং মধুসূদনো ব্রজলতাং তামেব পুষ্পসবাম
ইত্থং নির্বাচনীকৃতো দায়িতয়া হ্রীণো হরিঃ পাতু বঃ৷।
(অজ্ঞাতনাম; সদুক্তিকর্ণামৃতে এই শ্লোকটি কবি শুভাঙ্কের নামে উদ্ধৃত)
[শীঘ্ৰং গচ্ছত] ধেনুদুগ্ধকলশানাদায় গোপ্যো গৃহং
দুগ্ধে বষ্কয়িণীকুলে পুনরিয়াং রাধা শনৈর্যাস্যতি।
ইত্যন্যব্যাপদেশ গুপ্তহৃদয়ঃ কুৰ্বন বিবিক্ত ব্ৰজং
দেবঃ কারণনন্দসূনুরশিবং কৃষ্ণঃ স মুষ্ণাতু বঃ।৷
(সোন্নোক)
ময়াম্বিষ্টো ধূতঃ স সখি নিখিলামেব রজনীম
ইহ স্যাদত্র স্যাদিতি নিপুণমন্যাভিসৃতঃ
ন দৃষ্টো ভাণ্ডীরে তটভূবি ন গোবৰ্দ্ধনগিরে-
কালিন্দ্যাঃ [কূলে] ন নিচুলকুঞ্জে মুররিপুঃ৷।
(অজ্ঞাতনাম)
০৪. পাল-চন্দ্ৰ পর্ব। বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান। শিক্ষা ও সংস্কৃতি। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান
পাল-চন্দ্ৰ পর্ব। বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান। শিক্ষা ও সংস্কৃতি। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান
পাল-চন্দ্ৰ পর্বে বাঙলা দেশের যথার্থ গৌরব ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা-দীক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য সংস্কৃতিতে তত নয় যত তাহার বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে। এই জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিক্ষা-সংস্কৃতি অসংখ্য মহাযানী-বজ্রযানী-মস্ত্রযানী-সহজযানী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা প্রকাশ করিয়াছিলেন সংস্কৃত, অপভ্রংশ ও প্রাচীন বাঙলা ভাষায় রচিত অগণিত গ্রন্থে। মূল গ্রন্থ অধিকাংশই আজ বিলুপ্ত কিন্তু ইহাদের তিব্বতী অনুবাদ কিছু কিছু বর্তমান এবং তিব্বতী গ্রন্থ-তালিকায় তালিকাবদ্ধ। এই সুদীর্ঘ গ্রন্থমালা তিব্বতী ঐতিহ্যে বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাহিত্যের অন্তর্গত এবং বৌদ্ধ সূত্রসাহিত্য হইতে পৃথক। দেশীয় ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্যে এই সব বৌদ্ধ আচার্য এবং তাঁহাদের রচিত গ্রন্থাদির স্মৃতি একেবারে মুছিয়া গিয়াছে বলিলেই চলে। তিব্বতী গ্রন্থ-তালিকা, তিব্বতী লামা তারনাথের বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস, সুমপা রচিত পাগ-সাম-জোন-জাং প্রভৃতি গ্ৰন্থই এ-সম্বন্ধে আমাদের একমাত্র উপাদান।
মহাযান বৌদ্ধধর্ম ও তদোদ্ভূত অন্যান্য বৌদ্ধ যান (মন্ত্রযান, বজ্রযান, কালচক্ৰযান, সহজযান এবং নাথধর্ম, কৌলধর্ম প্রভৃতি) সম্বন্ধে ধর্মকর্ম অধ্যায়ে বিস্তারিত বিবরণ দিতে চেষ্টা করিয়াছি। বলা বাহুল্য, এই সব বিভিন্ন যান ও ধর্মমত সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান আজও অত্যন্ত সীমাবদ্ধ; অধিকাংশ গ্ৰন্থ এখনও অনূদিত ও আলোচিতই হয় নাই। অনুবাদ এবং আলোচনার বাধাও বিস্তর। প্রথমত, যে সংস্কৃত ভাষায় মূল গ্ৰন্থসমূহ রচিত হইয়াছিল, সে সংস্কৃত আঁত্যস্ত ব্যাকরণদোষদুষ্ট শুদ্ধ সুবোধ্য প্রাঞ্জল ভাষা ব্যবহারের কোনও বালাই-ই যেন বৌদ্ধ আচার্যদের ছিল না। তাহারা স্পষ্টই বলিতেন, বুঝিতে পারিলেই হইল; ছন্দ, ব্যাকরণ, অলঙ্কার শব্দ বা পদবীতি ইত্যাদি অশুদ্ধ বা অপ্রচলিত হইলেও কিছু ক্ষতি নাই। কালচক্ৰযানের বিমলপ্ৰভা নামে একটি টীকায় বলা হইয়াছে, বৌদ্ধ আচার্যরা স্বেচ্ছাপূর্বক সংস্কৃত ব্যাকরণের রীতি-পদ্ধতি, ছন্দ, অলংকার প্রভৃতি অমান্য করিতেন; যাহারা মানিয়া চলিতেন তাহাদের বরং ঠাট্টা-বিদ্যুপ করিতেন! ঠিক এই কারণেই তিব্বতী অনুবাদও বহুক্ষেত্রে দুর্বোধ্য এবং তাঁহা হইতে সংস্কৃতে পুর্ননুবাদ খুব সহজ নয়। দ্বিতীয়ত, এই সব প্রত্যেকটি ধর্ম গুরুনির্ভর ধর্ম, গুরু ছাড়া এই ধর্মের গুহ্য সাধন প্রক্রিয়ার রহস্য ভেদ করা অসম্ভব বলিলেই চলে, এবং দীক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া গুরুরা অন্য কাহারও নিকট সে রহস্য ভেদ ও ব্যাখ্যা করিতেন না। সেই হেতু এই সব ধর্মের বিস্তৃতি দীক্ষিত চক্র বা মণ্ডলের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ; সর্বসাধারণ সেই সীমার মধ্যে প্রবেশ করিতেই পারিত না। গুরুরা দীক্ষিতদের নিকট এবং দীক্ষিতারা পরস্পরের মধ্যে তাঁহাদের গুহ্যসাধনা সম্বন্ধে যে-ভাষায় কথা বলিতেন সে-ভাষাও ছিল গুহ্যভাষা। যে-ভাষার নাম ছিল সন্ধাভাষা (সন্ধিভাষা), যে ভাষার শুধু ‘মৌলিক ‘সম্পূর্ণ নিগূঢ় সত্যের কথা বলে; কিন্তু যত মৌলিক, সম্পূর্ণ এবং নিগূঢ়ই হোক না কেন সে-ভাষা, অদীক্ষিত জনের কাছে তাঁহা ছিল দুর্বোধ্য। এক ভাষায় যাহা “অভিপ্রায়িক, অর্থাৎ আপাত যে অর্থ কোনও বাক্যের বা পদের, তাহাই তাহার নিগুঢ় অর্থাৎ মৌলিক, সম্পূর্ণ অর্থ নয়; মৌলিক সম্পূর্ণ উদ্দিষ্ট অর্থের দিকে তাহা ইঙ্গিত করে মাত্র। কাজেই, সে ভাষার মৌলিক উদ্দিষ্ট অর্থ ধরিতে পারা সহজ নয়। তৃতীয়ত, ইহাদের সাধনপন্থা এবং প্রক্রিয়াও ছিল অত্যন্ত গুহ্য। নানা প্রকারের যাদুমন্ত্র, যাদুপ্রক্রিয়া, নানা বিধিবিধান, সাধনমন্ত্র, মুদ্রা, মণ্ডল, ধারণী, যোগ, সমাধি প্রভৃতি লইয়া এই বৌদ্ধাচার্যরা এমন একটি রহস্যময় জগৎ গড়িয়াছিলেন, ব্রাহ্মণ্য তন্ত্র-জগতের সঙ্গে তাহার সাদৃশ্য থাকিলেও সর্বত্র সৰ্ব্বথা তাঁহা আমাদের অধিগম্য নয়। সে-জগতের সঙ্গে আমাদের পরিচিত সাধন-রীতি-পদ্ধতি, নীতি ও প্রক্রিয়ার সম্বন্ধ কমই। গুহ্য রহস্যময় সন্ধাভাষায় বৌদ্ধ আচার্যরা গুহাতর সাধন-প্রক্রিয়া ও অধ্যাত্ম অভিজ্ঞতার কথা বলিয়াছেন। চতুর্থত, যে-সব ছায়া, রূপক, উপমা, প্রতীক এবং যোগারূঢ় শব্দ আশ্রয় করিয়া ত্যাহ্বাদের সাধন-নীতি ও আদর্শ, রীতি ও প্রক্রিয়া, এবং অধ্যাত্ম অভিজ্ঞতা বর্ণিত হইয়াছে, সে-গুলি সমসাময়িক সাধারণ নরনারীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, যৌন-জীবন এবং যৌন-প্রক্রিয়া হইতেই আহৃত, সন্দেহ নাই, কিন্তু সেই জীবন ও প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে তাহারা যে অর্থ ও ইঙ্গিত বহন করে তাহা একান্তই আপাত অর্থ ও ইঙ্গিত, এবং সে অর্থ ও ইঙ্গিত আমাদের বর্তমান রুচি ও সংস্কারকে আঘাত করে। কাজেই স্বচ্ছ ও নির্মোহ বিজ্ঞান-দৃষ্টি লইয়া এই সুবিস্তৃত সাহিত্য অনুশীলন না করিলে পরিচিত ছায়া-উপমাকৃপক্ষ প্রতীকের পশ্চাতে, আপাত অর্থের পশ্চাতে, যে নিগূঢ় অর্থ বিদ্যমান তাহা সহজে ধরা পড়ে না।
