সুভূতিচন্দ্ৰ নামে একজন বৌদ্ধ অভিধানকার কামধেনু নামে অমরকোষের একটি টীকা রচনা করিয়াছিলেন; গ্রন্থটি আজ বিলুপ্ত, কিন্তু তাহার তিব্বতী অনুবাদের কথা ত্যাঙ্গুরে তালিকাবদ্ধ করা হইয়াছে। রায়মুকুট ও শরণদেব কয়েকবারই সুভূতিচন্দ্রর মতামত উদ্ধার করিয়াছেন; সেই জন্যই অনুমান হয় সুভূতিচন্দ্র বাঙালী হইলেও হইতে পারেন।
চিকিৎসা-শাস্ত্ৰ চক্ৰপাণিদত্ত। সুরেশ্বর। বঙ্গসেন
এ পর্বের শ্রেষ্ঠ সর্বভারতীয় রোগনিদানবিদদের অন্যতম চক্ৰপাণি-দত্ত নিঃসন্দেহে বাঙালী। তাহার পিতা নারায়ণ জনৈক গৌড়রাজের পাত্র (রাজকর্মচারী) এবং রসবত্যধিকারী (রন্ধনশালার তত্ত্বাবধায়ক) ছিলেন। চক্ৰপাণির ষোড়শ শতকীয় বাঙালী টীকাকার শিবদাস-সেন যশোেধর বলিতেছেন, এই গৌড়রাজ ছিলেন পালরাজ জয়পাল। চক্ৰপাণির বংশ লোধুবলি কুলীন; শিবদাস-সেন বলিতেছেন, লোপ্ৰবলি কুলীনারা দত্ত-বংশেরই একটি শাখা এবং মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যমতে ইহাদের বাড়ি বীরভূমে। চক্ৰপাণির একত্ৰাতা ভানুও ছিলেন রোগ-নিদান শাস্ত্ৰে। সুপণ্ডিত ও সুচিকিৎসক বা অন্তরঙ্গ; তাহার (চক্ৰপাণির) গুরুর নাম ছিল নরদত্ত। চক্ৰপাণি-দত্ত চরকের যে টীকা রচনা করিয়াছেন তাহার নাম আয়ুর্বেদ-দীপিকা বা চরকা-তাৎপর্য-দীপিকা এবং তদ্রচিত সুশ্রুতি-টীকার নাম ভানুমতী! তাহার অন্য দুইটি ক্ষুদ্রতর গ্রন্থের নাম-যথাক্রমে শব্দচন্দ্রিকা ও দ্রব্যগুণসংগ্ৰহ। শব্দচন্দ্ৰিক ভেষজ গাছ-গাছড়া এবং আকর দ্রব্যাদির তালিকা এবং দ্রব্যগুণসংগ্ৰহ পথ্যাদি-নিরূপণ সংক্রান্ত পুঁথি। কিন্তু চক্ৰপাণির শ্রেষ্ঠ মৌলিক গ্রন্থ হইতেছে চিকিৎসা-সংগ্রহ; এই গ্ৰন্থ রোগবিনিশ্চয়-প্রণেতা মাধবের এবং সিদ্ধযোগ-প্রণেতা বৃন্দের আলোচনা-গবেষণার ধারাই অনুসরণ করিয়াছে, সন্দেহ নাই; কিন্তু তৎসত্ত্বেও চিকিৎসা-সংগ্ৰহ ভারতীয় চিকিৎসা-শাস্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক গ্ৰন্থ, এবং ধাতব দ্রব্য প্রকরণে চক্ৰপাণি যে মৌলিকত্ব দেখাইয়াছেন তাহা উল্লেখযোগ্য।
পাল-পর্বের শেষ অধ্যায়ে কিংবা তাহার কিছু পরেই আরও দুইজন নিদান-শাস্ত্রবিদ পণ্ডিতের কথা জানা যায়, একজন সুরেশ্বর বা সুরপাল, আর একজন বঙ্গসেন। সুরেশ্বরের পিতামহ দেবগণ চন্দ্ররাজ গোবিন্দ চন্দ্রের অস্তুরঙ্গ বা সভা-চিকিৎসক ছিলেন, পিতা ভদ্ৰেশ্বর ছিলেন। বঙ্গেশ্বর রামপালের সভা-চিকিৎসক; আর সুরেশ্বর নিজে ছিলেন ভীমপাল নামে জনৈক নরপতির অন্তরঙ্গ। তদ্রচিত শব্দপ্রদীপ এবং বৃক্ষায়ুৰ্বেদ দুইই ভেষজ গাছ-গাছড়ার তালিকা ও গুণাগুণবিচার; কিন্তু তাহার লোহ পদ্ধতি বা লৌহসর্বস্ব। লোহার ভেষজ ব্যবহার এবং লৌহঘটিত ঔষধাদি প্রস্তুত সম্বন্ধে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। বঙ্গসেনের পিতা ছিলেন কাঞ্জিকবাসী গদাধর এবং তদ্রচিত গ্রন্থের নাম চিকিৎসা-সার সংগ্ৰহ। বঙ্গসেন সুশ্রুতিপন্থী। কিন্তু মাধব-রূচিত রোগ-বিনিশ্চয় গ্রন্থের প্রতি তাহার ঋণ সামান্য নয়।
ধর্মশাস্ত্ৰ। জিতেন্দ্ৰিয়। বালক
লিপি-সাক্ষ্যে মনে হয়, মীমাংসার চর্চা বাঙলাদেশে হইত না এমন নয়, কিন্তু মীমাংসা ও ধর্মশাস্ত্ৰ লইয়া এই পর্বে কেহ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ কিছু রচনা করিয়াছিলেন, এমন নিঃসংশয় প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে না। জিতেন্দ্ৰিয় ও বালক নামে দুইজন ধর্মশাস্ত্ৰxরচয়িতার উল্লেখ ও বচন উদ্ধার করিয়াছেন জীমূতবাহন, শূলপাণি, রঘুনন্দন, প্রভৃতি পররর্তী বাঙালী স্মৃত্তিকারেরা। কোনো অবাঙালী স্মৃতিকার ইহাদের উদ্ধার বা আলোচনা করেন নাই; সেই জন্য, মনে হয়। ইহারা দুইজনই ছিলেন বাঙালী এবং একাদশ শতকের কোনও সময়ে ইহারা প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। ইহাদের কাহারও রচনা কালের হাত এড়াইয়া বঁচিয়া নাই; তবে শুভাশুভকাল সম্বন্ধে জিতেন্দ্ৰিয়ের রচনা উদ্ধার করিয়া জীমূতবাহন তাহার সমালোচনা করিয়াছেন। কালবিবেক-গ্রন্থে; ব্যবহার ও প্রায়শ্চিত্ত সম্বন্ধে জিতেন্দ্ৰিয়ের বচন উদ্ধার ও সমালোচনা জীমূতবাহন করিয়াছেন দায়ভাগ ও ব্যবহার মাতৃকাগ্রন্থে এবং রঘুনন্দন করিয়াছেন দায়তত্ত্ব-গ্রন্থে। বালক ব্যবহার ও প্রায়শ্চিত্ত সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া থাকিবেন, কারণ জীমূতবাহন, শূলপাণি ও রঘুনন্দন এই তিনজনই দুই বিষয়ে বালকের মতামত সমালোচনা করিয়াছেন; জীমূতবাহন তো তাহার মতামতকে ‘বাল্যবচন বলিয়া বিদুপই করিয়াছেন। ইহাদের চেয়েও প্রাচীনতর (“পুরাতন”), যোগ্লোক নামে একজন স্মৃতিকারের মতামত আলোচনা করিয়াছেন জীমূতবাহন ও রঘুনন্দন , ইনি শুভাশুভ কাল সম্বন্ধে ব্যবহার সম্বন্ধীয় একটি ‘বৃহৎ ও একটি “লঘু গ্ৰন্থ রচনা করিয়া থাকিবেন। কিন্তু ধর্মশাস্ত্ৰ, মীমাংসা প্রভৃতি লইয়া বাঙালী স্মৃতিকারের যে উৎসাহ পরবর্তী সেনা-বর্মণ পর্বে দেখা যাইবে, সে-উৎসাহের সূত্রপাত এই পর্বে এখনও হয় নাই।
এই পর্বে একটি মাত্র জ্যোতিষ-গ্রন্থের খবর আমরা জানি; গ্রন্থটি জনৈক কল্যাণবৰ্মা রচিত সারাবলী। মল্লিনাথ (শিশুপালবধ-টীকা), উৎপল এবং আল-বেরুণী এই তিনজনই সারাবলী হইতে বচন উদ্ধার করিয়াছেন। কল্যাণবর্ম গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিতে “ব্যাঘাতটীশ্বর” বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। এই ব্যাঘ্রতটী নিঃসন্দেহে খালিমপুর-লিপির ব্যাঘ্রতটী।
সাহিত্য। কাব্য। নাটক
এই পর্বের প্রশস্তি-লিপিমালায় সমসাময়িক বাঙলার কাব্যসাহিত্যের এবং কাব্যচর্চার মোটামুটি একটা পরিচয় পাওয়া যায়। এই সব প্রশস্তি সাধারণত সভাকবিদেরই রচনা এবং উপমায় রূপকে, অনুপ্রাসে-অলংকারে, ছায়ায়-ছবিতে একান্তই মধ্য-ভারতীয়, বস্তুত সৰ্বভারতীয় কাব্যৈহিত্যের অনুগামী। কোনো মৌলিক কল্পনা বা রীতি বা ভঙ্গি এই প্রশস্তিরচনাগুলির মধ্যে ওয়া যায় না। কিন্তু তৎসত্ত্বেও দুই চারিটি দৃষ্টান্ত উদ্ধার করিলেই বোঝা যাইবে, গতানুগতিক ধারার কাব্যরচনা-শক্তিতে সমসাময়িক বাঙালী কিছু হীন ছিল না।
