কিন্তু নানা বিদ্যা ও শাস্ত্ৰে যে পরিমাণ অধ্যয়ন-অধ্যাপনা-অনুশীলনের সংবাদ লিপিমালা ও সমসাময়িক সাহিত্যে পাইতেছি, সেই অনুপাতে গ্রন্থ-রচনা ও গ্রন্থ-রচয়িতাদের সংবাদ— রৌদ্ধ সংস্কৃত ও প্রাকৃত গ্রন্থের ছাড়া- কমই পাওয়া যাইতেছে, এবং যাহা পাওয়া যাইতেছে তাহাও সব বাঙালীর এবং বাঙলাদেশের রচনা কিনা, নিশ্চয় করিয়া বলা কঠিন। শৌরসেনী অপভ্রংশ এবং প্রাচীনতম বাঙলায় রচিত বৌদ্ধ-গ্ৰস্থাদির কথা পরে বলিতেছি। আপাতত ব্ৰাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ সংস্কৃত গ্রন্থাদির কথা বলা যাইতে পারে।
সংস্কৃত গ্রন্থাদি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য
প্রাচীন বাঙলায় বেদ-চর্চা যে খুব বেশি হইত, এমন নয়, তবে উচ্চ পণ্ডিত সমাজে কিছু কিছু নিশ্চয় হইত, এবং লিপিমালায়ও এমন প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। কিন্তু, বৈদিক ক্রিয়াকম-যাগযজ্ঞ সম্বন্ধে এই পর্বে মাত্র একখানা পুঁথির খবর পাইতেছি। কেশবমিশ্রর ছান্দোগ্য-পরিশিষ্ট গ্রন্থের উপর প্রকাশ নামে একটি টীকা রচনা করিয়াছিলেন নারায়ণ নামে জনৈক বেদজ্ঞ পণ্ডিত। নারায়ণের পিতা ছিলেন গোণ, পিতামহের নাম উমাপতি এবং ইহারা ছিলেন উত্তর- রাঢ়ের অধিবাসী। উমাপতি ছিলেন জয়পালের সমসাময়িক এবং নারায়ণ, দেবপালের।
গৌড়পাদ বা গৌড়াচার্যের পর অধ্যাত্মচিন্তা এবং দর্শনশাস্ত্র সম্বন্ধে গ্রন্থ-রচনা করিয়া সর্বভারতীয় খ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন ন্যায়কন্দলী-রচয়িতা শ্ৰীধর-ভট্ট। বেদ, বেদান্ত, বিভিন্ন দর্শনের চর্চা বাঙলাদেশে কম হইত না (লিপি-সাক্ষ্যই তাহার প্রমাণ) গ্ৰন্থ-রচনাও কিছু কিছু হইয়া থাকিবে, কিন্তু কালের হাত এড়াইয়া আমাদের কালে আসিয়া সে-সব পৌছায় নাই। শ্ৰীধরের ন্যায়কন্দলী শুধু বাচিয়া আছে এবং তোহা এই পর্বেরই রচনা। নায়কন্দলী ছাড়া শ্ৰীধর অদ্বয়সিদ্ধি, তত্ত্বপ্ৰবোধ, তত্ত্বসংবাদিনী এবং সংগ্ৰহটীকা নামে অন্তত আরও চারখানি বেদান্ত ও মীমাংসা বিষয়ের পুঁথি রচনা করিয়াছিলেন, কিন্তু ইহাদের একটিও আজ বাচিয়া নাই। প্রশস্তপাদের পদার্থ-ধর্ম-সংগ্ৰহ নামে বৈশেষিক সূত্রের যে ভাষ্য আছে, ন্যায়কন্দলী-গ্ৰন্থ তাহারই টীকা। শ্ৰীধর-ভট্টই বোধ হয় সর্বপ্রথম এই গ্রন্থে ন্যায়বৈশেষিক মতের আস্তিক্য ব্যাখ্যা দান করেন এবং সেই হিসাবেই ন্যায়কন্দলীর সবিশেষ মূল্য। ন্যায়কন্দলী বাঙলাদেশে খুব সমাদর লাভ করিয়াছিল বলিয়া মনে হয় না; খুব পঠিত বা আলোচিতও বোধ হয় হইত না। এই গ্রন্থের একটি টীকাও বাঙলাদেশে রচিত হয় নাই। যে দু’টি মূল্যবান টীকার কথা আমরা জানি তাহার একটির রচয়িতা মৈথিলী পণ্ডিত পদ্মনাভ এবং আর একটির পশ্চিম-ভারতীয় জৈনাচার্য রাজশেখর। শ্ৰীধর-ভট্টের পিতার নাম ছিল বলদেব, মাতার নাম আবেবাকা বা অভ্ৰোকী; জন্ম দক্ষিণ-রাঢ়ের সুপ্ৰসিদ্ধ ভূরিশ্রেষ্ঠ গ্রামে, এবং ন্যায়কন্দলী-গ্ৰন্থ রচিত হইয়াছিল ৯১৩ বা ৯.১০ শকে, জনৈক “গুণরত্নাভরণ কায়স্থ কুলতিলক” পাণ্ডুদাসের অনুরোধে এবং পৃষ্ঠপোষকতায়।
শ্ৰীধর-ভট্টের সমসাময়িক ছিলেন লক্ষণাবলী, কিরণাবলী (দুইটিই প্রশস্তপাদাভায্যের টীকা), কুসুমাঞ্জলি এবং আত্মতত্ত্বৰিবেক-গ্রন্থের রচয়িতা উদয়ন। কুলজী—ঐতিহ্য মতে উদয়ন ছিলেন ভাদুড়ী-গাঞী বরেন্দ্ৰ ব্ৰাহ্মণ; কিন্তু এই ঐতিহ্য কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য বলা কঠিন। উদয়ন তাহার রচনায় এক স্থানে বলিয়াছেন, গৌড়মীমাংসক যথার্থ বেদজ্ঞান বিরহিত ছিলেন। এই গৌড়মীমাংসক বলিতে তিনি কি শ্ৰীধর-ভট্টকে বুঝাইতেছেন, না, গৌড়ীয় মীমাংসা-শাস্ত্ৰজ্ঞ সকল পণ্ডিতকেই বুঝাইতেছেন, তাহা নিঃসংশয়ে বলা যায় না। উদয়ন বাঙালী হইলে এই উক্ত করিতেন। কিনা সন্দেহ। আশ্চর্য এই, আনুমানিক ত্ৰয়োদশ শতকে বাঙালী গঙ্গেশ-উপাধ্যায়ও গৌড়মীমাংসক সম্বন্ধে একই উক্তি করিয়াছেন।
বেদান্তদর্শন চর্চা বাঙলাদেশে বোধ হয় খুব বেশি ছিল না; ন্যায়-বৈশেষিক এবং বৌদ্ধ মাধ্যমিক দর্শনের আদরই ছিল বেশি। কৃষ্ণমিশ্র রচিত প্ৰবোধচন্দ্ৰোদয়-নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে আছে, দক্ষিণ-রাঢ়বাসী ব্ৰাহ্মণ অহঙ্কার কাশীতে গিয়া সেখানে বেদান্ত-চৰ্চার বাহুল্য দেখিয়া বিদ্রুপ করিয়া বলিতেছেন,
প্ৰত্যক্ষাদি প্রমাসিদ্ধ বিরুদ্ধার্থবিবোধিনঃ।
বেদান্তাং যদি শাস্ত্ৰাণি বোদ্ধৈঃ কিমপরাধ্যতে।।
প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ যাঁরা অসিদ্ধ ও বিরুদ্ধার্থজ্ঞাপক বলিয়া মনে করেন, বেদান্ত যদি শাস্ত্ৰ হয়, তাহা হইলে বৌদ্ধরা কি অপরাধ করিল!
গৌড়নিবাসী এক অভিনন্দ নামীয় লেখকের যোগবাশিষ্ঠ-সংক্ষেপ নামে একটি গ্রন্থের সংবাদ আমরা জানি। নামেই প্রমাণ যে গ্রন্থটি যোগবাশিষ্ঠের সংক্ষিপ্ত সার; সমগ্র বিষয়বস্তু ৬ প্রকরণ এবং ৪৬টি সর্গে বিন্যস্ত। গ্রন্থের শেষে লেখক সম্বন্ধে একটু সংক্ষিপ্ত পরিচয় আছে : “তৰ্কবাদীশ্বর-সাহিত্যাচার্য-গীড়মণ্ডলালঙ্কার-শ্ৰীমৎ—”। অভিনন্দ ন্যায়শাস্ত্র এবং সাহিত্যে সুপণ্ডিত ছিলেন বলিয়া মনে হয়।
ব্যাকরণ ও অভিধান-চৰ্চা
এই পর্বে ব্যাকরণ-রচনায় চন্দ্ৰগোমীর ধারা রক্ষা করিয়াছেন দুই বৌদ্ধ বৈয়াকরণিক, মৈত্ৰেয়-রক্ষিত এবং জিনেন্দ্রিবৃদ্ধি। জিনেদ্রবৃদ্ধি ‘বোধিসত্ত্ব-দেশীয়াচার্য বলিয়া আত্ম পরিচয় দিয়েছেন; তিনি বিবরণ-পঞ্জিকা (বা ‘ন্যাস নামে পরিচিত) নামে কাশিকার উপর একটি সুবিস্তৃত টীকা রচনা করিয়াছিলেন। মৈত্ৰেয়-রক্ষিত জিনেৰুদ্ৰবুদ্ধির বিবরণ পঞ্জিকার উপর তন্ত্রপ্ৰদীপ নামে একটি টীকা রচনা করিয়ছিলেন এবং ভীমসেন-রচিত ধাতুপাঠ অবলম্বন করিয়া ধাতুপ্ৰদীপ নামে আর একটি ব্যাকরণ-গ্ৰন্থ রচনা করিয়াছিলেন। টাকাসর্বস্ব রচয়িতা সর্বানন্দ, শরণদেব, উজ্জ্বলদত্ত, বৃহস্পতি রায়মুকুট, ভট্টোজি দীক্ষিত অনেক ব্যাকরণ ও অভিধানকার মৈত্ৰেয়-রক্ষিতের তন্ত্রপ্ৰদীপ গ্ৰন্থ নিজ নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করিয়াছেন।
