ভাষায় কথা
এই পর্বে অর্থাৎ আনুমানিক ৮০০-১১০০র মধ্যে এবং তাহার পরেও বাঙলাভাষা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত সাহিত্যিক ভাষা হিসাবে বাঙলাদেশে সংস্কৃত, বিভিন্ন প্রকারের প্রাকৃত এবং শৌরসেনী অপভ্ৰংশ এই তিন রকমের ভাষা প্রচলিত ছিল। শিল্পে ও সাহিত্যে, জ্ঞানে ও বিজ্ঞানে, দর্শনে ও বিচারে, শিক্ষায় ও দীক্ষায় শিক্ষিত লোকেরা সকলেই সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার করিতেন; সকলেরই চেষ্টা ছিল প্রাকৃতজনের কথ্যভাষাকে শুদ্ধ ও সংস্কৃত করিয়া ব্যাকরণসম্মত করিয়া নিজের বক্তব্যকে প্রকাশ করিবার। এই শুদ্ধ, ‘সংস্কৃত, ব্যাকরণসম্মত ভাষাই সংস্কৃত ভাষা। প্রাকৃতের চর্চা বাঙলাদেশে বড় একটা হইত না; অন্তত বাঙলাদেশে প্রাকৃতে সাহিত্যরচনার কোনো ধারা সুপ্রতিষ্ঠিত হইতে পারে নাই; তাহার পরিচয়ও নাই। এ-দেশের মহাযানী-বজ্রযানী প্রভৃতি বৌদ্ধারাও যে-ভাষা ব্যবহার করিতেন তাহাও হয় শুদ্ধ সংস্কৃত না হয় প্রাকৃতাশ্রয়ী মিশ্র সংস্কৃত যাহাকে বলা হয় ‘বৌদ্ধ সংস্কৃত। দশম শতকে গৌড়জনের সাহিত্যরুচির পরিচয় দিতে গিয়া সেইজন্যই কাব্যমীমাংসার লেখক রাজশেখর বলিতেছেন,
গৌড়ােদ্যাঃ সংস্কৃতস্থঃ পরিচিতরুচিয়ঃ প্রাকৃতে লাটদ্দেশ্যাঃ।
স্পষ্টতই বোঝা যাইতেছে, গৌড় ও প্রতিবাসী জনপদগুলিতে সংস্কৃতের চর্চাই ছিল বেশি, প্রাকৃতের তেমন ছিল না। এদেশীয় পণ্ডিতদের সংস্কৃত উচ্চারণের প্রশংসাও রাজশেখর করিয়াছেন, কিন্তু তাঁহাদের প্রাকৃত বাচনভঙ্গি ছিল কুষ্ঠিত।
পঠন্তি সংস্কৃতং সুঠু কুণ্ঠঃ প্রাকৃত বাচি তে।
বাণারসীতঃ পূর্বেণ যে কেচিন মগধাদয়ঃ ॥
রাজশেখর বাঙালীর এই কুষ্ঠিত প্রাকৃত উচ্চারণ লইয়া একটু বিদ্রুপই করিয়াছেন। দেবী সরস্বতী গৌড়বাসীর প্রাকৃত উচ্চারণে অতিষ্ঠ হইয়া নিজের অধিকার ত্যাগ করিবার সংকল্প করিয়া ব্ৰহ্মাকে গিয়া বলিলেন, হয় গৌড়জনেরা প্রাকৃত ছাড়ক, না হয় অন্য সরস্বতী হউক।
ব্ৰহ্মন বিজ্ঞাপয়ামি ত্বাং স্বাধিকারজিহাসয়া।
গৌড়স্ত্যজতু বা গাথামন্যা বাহঞ্জ সরস্বতী।
গৌড়ীয়দের প্রাকৃত উচ্চারণের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে রাজশেখর বলিয়াছেন, ইহাদের পাঠ অস্পষ্টও নয় আঁতি স্পষ্টও নয়, রুক্ষও নয় অতি কোমলও নয়, গভীরও নয় অতি-তীব্ৰও নয়।
যাহা হউক, সংস্কৃত ও প্রাকৃত ছাড়া এবং প্রাকৃতের চেয়ে অনেক বেশি প্রচলিত ছিল পশ্চিমী বা শৌরসেনী অপভ্রংশ, যে-ভাষার প্রসার ও প্রতিষ্ঠা ছিল সমগ্র উত্তর-ভারত ব্যাপিয়া এবং মহারাষ্ট্র ও সিন্ধুদেশেও। বাঙলাদেশের সহজযানী সিদ্ধাচার্যরা এবং ব্রাহ্মণ্য কবিরাও কেহ কেহ শৌরসেনী অপভ্রংশে কিছু কিছু কাব্য রচনা করিয়া গিয়াছেন; কাহ্নপাদ, সরহপাদ প্রভৃতি সাধকেরা এই ভাষাতেই তাহদের দোহাগুলি রচনা করিয়াছিলেন আর পঞ্চদশ শতকের গোড়ায় মৈথিল কবি বিদ্যাপতি এই শৌরসেনী অপভ্রংশেই তাঁহার কীর্তিলতা কাব্য রচনা করেন।
এই পর্বে লোকায়াত বাঙালী সমাজের লোকভাষা ছিল মাগধী অপভ্রংশের গৌড়-বঙ্গীয় রূপ যে-রূপ ক্রমশ প্রাচীন বাঙলা ভাষায় বিবর্তিত হইতেছিল। এই মাগধী অপভ্রংশের স্থানীয় রূপের সঙ্গে শৌরসেনী অপভ্রংশের খুব বড় একটা পার্থক্য কিছু ছিল না; একটা যিনি বুঝিতেন অন্যটা। বুঝিতে তাহার খুব বেশি পরিশ্রম করিতে হইত না। আর, এই দুই ভাষাই ছিল খুব সহজবোধ্য এবং নিরক্ষার জনসাধারণের অধিগম্য। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের উদ্দেশ্য ছিল, তাহাদের ধর্মের তত্ত্বকথা লোকায়ত ভাষায় জনসাধারণের চিত্তদুয়ারে পৌছাইয়া দেওয়া। এই উদ্দেশ্যে তাহারা এবং কোনও কোনও পণ্ডিতেরা, এই দুই ভাষাই বেশি ব্যবহার করিতে আরম্ভ করেন। ক্রমে মাগধী অপভ্রংশ যখন প্রাচীন বাঙলা ভাষায় বিবর্তিত হইতে আরম্ভ করিল। তখন সৃজ্যমান এই নূতন ভাষাকেও বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা সানন্দে ও সাভার্থনায় গ্রহণ করিলেন। প্রাচীন বাঙলার চর্যাগীতিগুলিই এই নূতন সৃজ্যমান ভাষার একমাত্র পরিচয়। কিন্তু, এই ভাষা তখনও সূক্ষ্ম ও গভীর ভাব-প্রকাশের বাহন হইয়া উঠিতে পারে নাই; ধর্ম ও তুত্ত্বকথা বুঝাইবার জন্য যতটুকুই প্রয়োজন ততটুকুই মাত্র ইহার বিস্তার ও গভীরতা! বস্তুত, তুর্কী-বিজয়ের পূর্বে বাঙলাদেশে দুই-তিন শতাব্দী ধরিয়া শৌরসেনী অপভ্রংশ এবং নৃত্ন বাঙলা ভাষা লইয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলিতেছিল মাত্র। শিক্ষিত, বিদগ্ধ ও সংস্কৃতিপূত চিত্ত লোকদের মধ্যে প্রাথ সরবুদ্ধি ও গণচেতনাসম্পন্ন মাত্র কিছু কিছু পণ্ডিত ও কবি এই কার্যে ব্ৰতী হইয়াছেন এবং তাঁহাদের মধে সকলেই কিন্তু সাহিত্যধর্মী বা কবিধর্মী ছিলেন না।
ধর্ম, দর্শন, ব্যাকরণ, অলংকার, ব্যবহার, চিকিৎসা-বিদ্যা প্রভৃতি সম্বন্ধে পণ্ডিতেরা যখন গ্রন্থাদি লিখিতেন তখন সংস্কৃত ছাড়া অন্য কোনও ভাষার আশ্রয় লওয়ার কথা তাহাদের মনেই হইত না। কাজেই এ-পর্বে জ্ঞান বিজ্ঞান সম্বন্ধে যত গ্ৰন্থ রচিত হইয়াছে তাহা সমস্তই সংস্কৃত ভাষায় এবং সেই কারণেই এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তার শিক্ষিত, পণ্ডিত ও উচ্চকোটি সমাজেই আবদ্ধ ছিল। বাঙলাদেশে সংস্কৃত-চৰ্চা এবং বিশেষভাবে সংস্কৃত কাব্য-সাহিত্যচর্চার প্রাবল্য এর আগের পর্বেই দেখা দিয়াছিল, নহিলে গৌড়ীরীতির উদ্ভব এবং বিকাশই সম্ভব হইত না। এই পর্বে তাহা আরও সমৃদ্ধি, আরও প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে এবং বাঙালীর কল্পনোজল প্রতিভা নানা সূক্তি ও শ্লোকে, নানা কাব্যে আপনাকে প্রকাশ করিয়াছে। ‘কালিদাস ভবভূতি-ভারবি বাণভট্ট-রাজশেখর পড়িয়া ব্লসগ্রহণের সামর্থ্য না থাকিলে এই পর্বের অগণিত বাঙালী কবির পক্ষে এই সব প্রকীর্ণ শ্লোক ও কাব্য রচনা সম্ভবই হইত না। এই অনুমানও বোধ হয় সঙ্গত যে, পণ্ডিত-সমাজেব বাহিরে একটি বৃহত্তর সাধারণ সংস্কৃত শিক্ষিত সমাজও ছিল যাহার লোকেরা এই সব শ্লোক ও কাব্য পড়িয়া তাহদের রস গ্রহণ করিতে পারিতেন! এই হিসাবে কাবা ও নাটকের সামাজিক বিস্তার বেশি ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু কথ্যভাষার সাহিত্যিক রূপ অপভ্রংশের সঙ্গে তাহার তুলনা হইতে পারে না। সংস্কৃতে যাঁহারা লিখিতেন, তাঁহাদের মানসিক ও সামাজিক পরিধির মধ্যে বৃহত্তর জনসমাজের স্থান ছিল না, এ-কথা বলিলে অনৈতিহাসিক কিছু বলা হয়। না; তবে, তাহাদের কাহারও কাহারও রচনায় বৃহত্তর জনসমাজের নানা সুখ-দুঃখ-আনন্দ –বেদনা-ভাবনা-কল্পনা বস্তুময় কাব্যময় রূপ লাভ করিয়াছে, এ-কথাও সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করিতে হয়। যাহাই হউক, এ-তথ্য অনস্বীকার্য যে, সংস্কৃত এখন আর শুধু কোনওপ্রকারে নিজেকে ব্যক্তি করিবার ভাষামাত্র নয়; এই পর্বে তাহা মানবজীবনের সূক্ষ্ম ও গভীর ভাবকল্পনা প্রকাশের ভাষা হইয়া উঠিয়াছে।
