সাহিত্য-রচনার একটি বেগবান প্রবাহ যে বাঙলাদেশের পলিভূমির উপর দিয়া বহিয়া যাইত তাহার নিঃসংশয় প্রমাণ পাওয়া যায়। এই পর্বে গৌড়ী রীতির উদ্ভব, বিকাশ ও প্রসিদ্ধির মধ্যে। সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে হর্ষচরিত-গ্রন্থের মুখবন্ধে বাণভট্ট সমসাময়িক ভারতবর্ষে প্রচলিত সাহিত্য-রচনারীতি সম্বন্ধে বলিতেছেন,
‘শ্লেষপ্রায়মুদীচ্যেযু প্রতীচ্যেধর্থমাত্ৰকম।
উৎপ্রেক্ষা দাক্ষিণাত্যেষু গৌড়েম্বাক্ষরডম্বরম।।
নবোহর্থো জাতিরগ্রাম্য শ্লেষো ক্লিষ্ট স্ফুটো রসঃ।
বিকটাক্ষরবন্ধশ্চ কৃৎসমেকত্র দুষ্করম।।
উত্তর-ভারতের রচনারীতিতে শ্লেষই (অর্থাৎ শব্দ-ব্যবহারের চাতুর্য) সমধিক, পশ্চিমে কেবল অর্থগৌরব; দক্ষিণে উৎপ্রেক্ষালঙ্কারের প্রাবল্য (অর্থাৎ, কবিকল্পনার অবাধ সঞ্চারণ) এবং গৌড়জনদের মধ্যে অক্ষর-ডম্বর (অর্থাৎ, মাত্রার আড়ম্বর)। বস্তুত, নূতন অর্থ, অগ্রাম্য জাতি বা রচনাশৈলী, অক্লিষ্ট শ্লেষ, স্ফুটিরস এবং বিকটাক্ষরবন্ধ, এই সকল গুণের একত্র সমাবেশ দুষ্কর। বাণভট্ট দুঃখ করিয়াছেন, ভারতবর্ষের কোথাও একই জনপদে সু-কাব্যের এই সমস্ত লক্ষণগুলি একত্ৰ দেখিতে পাওয়া যায় না; কোথাও শুধু শ্লেষের প্রাধান্য, কোথাও অর্থগৌরবের, কোথাও অক্ষরাড়ম্বরের প্রাবল্য, কোথাও বা শুধু কল্পনার অবাধসঞ্চরণ। তাঁহার মতে ভালো কাব্যের যাহা লক্ষণ তাহা যে এই তালিকাতেই শেষ হইয়া গেল এমন নয়; এই লক্ষণগুলি শুধু কয়েকটি দৃষ্টান্ত মাত্র। কাজেই গৌড়ীয় কবিদের নিন্দাচ্ছলে বাণভট্ট অক্ষরাড়ম্বরের কথা বলিয়াছেন, এমন মনে করিবার কারণ নাই। অক্ষরাড়ম্বরের অর্থ হইতেছে শব্দপ্রয়োগগত ধ্বনি-সমারোহ; এই সাহিত্যিক গুণটিকেই বলা হইয়াছে বিকটাক্ষরবন্ধ (বিকট-উদারতা লক্ষণযুক্ত)।
গৌড়ীরীতি
সপ্তম-অষ্টম শতকে গৌড়-বঙ্গে যে একটি বিশেষ কাব্যরচনা-রীতির প্রবর্তনা হইয়াছিল এবং সমস্ত ভারতবর্ষে সেই রীতি সুপরিচিত স্বীকৃতি লাভ করিয়াছিল তাহার প্রমাণ আলংকারিক ভামহ ও দণ্ডীর (সপ্তম-অষ্টম-শতক) সাক্ষ্য। এই দুই জনই গৌড়ীরীতি বা গৌড়মার্গের কথা বলিতেছেন বৈদৰ্ভরীতির সঙ্গে সঙ্গে, অর্থাৎ বৈদভী ও গৌড়ী, এই দুই রীতিই যে তখন প্রধান প্রচলিত কাব্যরীতি, তাহার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিতেছেন। দণ্ডীর পক্ষপাত ছিল বৈদভী রীতির প্রতি এবং এই রীতিই কাব্যরচনার মানদণ্ড বলিয়া তিনি মনে করিতেন। তাহার মতে এই মানদণ্ডের বিচারে গৌড়ী রীতি বিপর্যয় লক্ষণাক্ৰান্ত, তাহার রূপ পৃথক, রীতি পৃথক, কিন্তু এই পৃথক রূপ ও রীতি সহজেই প্রস্ফুট। বৈদভী, বিশুদ্ধ মাৰ্গপদ্ধতির অনুসারী, গৌড়ী একটু অলংকার ও আড়ম্বরবহুল, পল্লবিত। দণ্ডী পরিষ্কারই বলিতেছেন, গৌড়জনেরা অতি ও উচ্চকথন এবং অলংকার ও আড়ম্বর প্রিয়; গৌড়ী রীতির প্রধান লক্ষণই হইতেছে ‘আর্থ-ডম্বর’ এবং “অলংকার-ড়ম্বর, অনুপ্রাসপ্রিয়তা এবং বন্ধগৌরব বা রচনার গাঢ়তা। ভামহ। কিন্তু বৈদভী রীতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে সন্দিহান ছিলেন; বরং সুপ্রযোজিত গৌড়ী রীতির প্রতিই তাহার কিছুটা পক্ষপাত সুস্পষ্ট। বৈদভী রীতির প্রধান গুণ ছিল শ্লেষ, প্রসাদ, মাধুর্য, সৌকুমাৰ্য ইত্যাদি।
বাণভট্ট, ভামহু এবং দণ্ডীর সাক্ষ্যে এ-তথ্য পরিষ্কার যে, গৌড়জনেরা সপ্তম শতকের আগেই সুস্পষ্ট লক্ষণাক্ৰান্ত একটি বিশিষ্ট কাব্যরীতি গড়িয়া তুলিয়াছিলেন এবং এই রীতি সর্বভারতগ্রাহ্য বৈদন্তী রীতিমানের পাশেই আপন আসন এতটা সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল যে, বাণভট্ট, ভামহ বা দণ্ডী কেহই তাহাকে অস্বীকার করিতে পারেন নাই; দশম-একাদশ শতকে গৌড়ী রীতির যখন পূর্ণ বিকশিত অবস্থা, যখন আড়ম্বরা অলংকার এবং পল্লবিত বিস্তৃতির প্রসার আরও বেশি, তখন রাজশেখর (দশম শতক) তাঁহার কাব্য মীমাংসা-গ্রন্থে গৌড়ী রীতির উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু কোনও উৎসাহ প্রকাশ করেন নাই। বোধ হয়, সেই জনাই কপূরমঞ্জরী-গ্রন্থে বিভিন্ন রীতির তালিকা দিতে গিয়া তিনি গৌউী রীতির উল্লেখ করেন নাই, তাহার স্থানে মাগধী রীতির কথা বলিয়াছেন। মাগধী রীতিকে যথার্থত কোনও বিশিষ্ট সম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র রীতি রাজশেখর ছাড়া আর কেহ বলেন নাই। একাদশ শতকে ভোজদেব গৌড়ী ও মাগধী, এই দুই রীতির কথা বলিয়াছেন, সন্দেহ নাই, কিন্তু মাগধীকে বলিয়াছেন খণ্ডরীতি, অর্থাৎ অসম্পূর্ণ, অ-স্বতন্ত্র, অপ্রস্ফুটিত রীতি। নাটকেও বোধ হয় অন্যান্য প্রাচ্য দেশের সঙ্গে বাঙলাদেশে একটি বিশিষ্ট রূপ ও রীতির প্রচলন হইয়াছিল। ভারতের নাট্যশাস্ত্ৰে চারিটি বিশিষ্ট নাটকীয় রীতির বা প্রবৃত্তির উল্লেখ আছে : অবন্তী, পঞ্চাল-মধ্যমা, দক্ষিণাত্যা এবং ওড্র মাগধী। ওড্র, বঙ্গ, পৌণ্ড এবং নেপালে ওড্র-মাগধী প্রবৃত্তি প্রচলিত ছিল।
এই গৌড়ী রীতির (মাগধী রীতি এবং ভরতনাট্যশাস্ত্ৰ কথিত ওড্র-মাগধী প্রবৃত্তিরও বটে) উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস প্রাচীন বাঙলার সংস্কৃতির ইতিহাসের দিক হইতে গভীর অর্থবহ। আর্যমঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প-কথিত ‘গৌড় তন্ত্র কথাটি এই প্রসঙ্গে স্মর্তব্য। ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি হইতেই গৌড়জনেরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য সম্বন্ধে সচেতন হইতে আরম্ভ করেন; ঈশানবৰ্মার হড়াহা-লিপি তাহার প্রথম প্রমাণ। তাহার পর হইতেই গৌড় ধীরে ধীরে নিজস্ব জন্য দিকে আশ্রয় করিয়া স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গড়িয়া তুলিতে যত্নবান হয়, শশাঙ্কে আসিয়া তাহা একটা সুস্পষ্ট রূপ গ্রহণ করে। মালব-স্থানীশ্বর-কনৌজ -উজ্জয়িনী-প্ৰয়াগ-বান্নারসীকেন্দ্ৰিক মধ্য-ভারতীয় রাষ্ট্ৰীয় প্রভাব হইতে মুক্ত, স্বতন্ত্র রাষ্ট্রই হইয়া উঠিল গৌড়তন্ত্রের রাষ্ট্রদর্শ। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এই গৌড়তন্ত্র রূপ লাভ করিল গৌড়ী রীতিতে—সর্বভারতীয়, বৈদভী রীতিকে অস্বীকার করিয়া, তাহার প্রভাব হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীন স্বতন্ত্র রীতির উদ্ভবে ও বিকাশে। সন্দেহ নাই, এই উদ্ভব ও বিকাশ ঘটিয়াছিল। গৌড়জনের নিজস্ব প্রতিভা, প্রকৃতি, রুচি ও সংস্কার অনুযায়ী এবং ইহাদেরই প্রেরণায়, শুধু বিশিষ্ট জনপদসুলভ অহংকৃত স্বতন্ত্রপ্রিয়তা ও স্বাধিকার প্রমত্ততায় নয়।
০৩. পাল-চন্দ্ৰপর্ব – ব্ৰাহ্মণ্য জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্য-শিক্ষা-সংস্কৃতি
পাল-বংশ ও পাল-সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় এবং তাহার দুই এক শতাব্দী আগে হইতেই বাঙলাদেশে সংস্কৃত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চা পরম উৎসাহে আরম্ভ হইয়া গিয়াছিল। লোকনাথের ত্রিপুরা-পট্টোলীতে কিংবা ভাস্করবর্মার নিধানপুর-লিপিতে যে অলংকৃত কাব্যরীতির সূচনা দেখা গিয়াছিল সপ্তম শতকে, পাল-বংশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই রীতিরই পরিপূর্ণ বিকাশ ধরা পড়িল। দশম-একাদশ শতকের অগণিত প্রশস্তি লিপিমালায় সংস্কৃত সাহিত্যচর্চা ও রচনারীতির যে-সাক্ষ্য উপস্থিত তাহা মধ্য-ভারতীয় প্রশস্তি-কাব্যরীতির ধারানুযায়ী হইলেও একেবারে উপেক্ষা করিবার মতো নয়। তাহা ছাড়া এই লিপিগুলিতে সমসাময়িক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও শিক্ষা-দীক্ষার যে প্রত্যক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়, ইতিহাসের দিক থেকে তাহা মূল্যহীন নয়। এই লিপিগুলি এবং চতুর্ভুজের হরিচারিত-কাব্য হইতে জানা যায়, বাঙলাদেশে যে-সকল বিদ্যার চর্চা হইত, বেদ, আগম, নীতি, জ্যোতিষ, ব্যাকরণ, তর্ক, মীমাংসা, বেদান্ত, প্রমাণ, শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ, কাব্য প্রভৃতি সমস্তই তাহার অন্তর্গত ছিল। চারি বেদেরই অধ্যয়ন-অধ্যাপনা হইত, যজুৰ্বেদীয় বাজসনেয়ী শাখার প্রসারই ছিল বেশি। এই সব বিচিত্র বিদ্যার চর্চা যে শুধু ব্ৰাহ্মণ পণ্ডিত ও বিদ্বজন সমাজেই আবদ্ধ ছিল তাঁহাই নয়; মন্ত্রী, সেনানায়ক প্রভৃতি রাজপুরুষেরাও এই সব শাস্ত্রের অনুশীলন করিতেন। দর্ভপাণি, কেদারমিশ্র ও গুরুত্বমিশ্রের অগাধ পাণ্ডিত্যের কথা, যোগদেব, বোধিদেব ও বৈদ্যদেবের বিস্তৃত শাস্ত্রানুশীলনের কথা, ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিত-সমাজে নানা বিদ্যাচর্চার কথা বর্ণ-বিন্যাস ও ধৰ্মকৰ্ম-অধ্যায়ে বলিয়াছি, এখানে আর পুনরুক্তি করিয়া লাভ নাই। এই বিদ্যানুশীলনের অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান কী কী ছিল, পাঠক্রম কী ছিল, তাহার বিবরণ বা আভাস পর্যন্ত কিছু পাইতেছি না; তবে, অনুমান হয়, ব্ৰাহ্মণ-পণ্ডিতেরা নিজেদের গৃহে কিংবা বড় বড় মন্দিরকে আশ্রয় করিয়া ক্ষুদ্র বৃহৎ চতুষ্পাঠী গড়িয়া তুলিতেন এবং সাধ্যানুযায়ী বিদ্যার্থী সংখ্যা গ্ৰহণ করিতেন। একজন আচার্যই যে সমস্ত বিদ্যার অধিকারী হইতেন এমন নয়; বিদ্যার্থীরা এক বা একাধিক শাস্ত্ৰে এক জনের নিকট শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া অন্য শাস্ত্ৰ পাঠ করিবার জন্য অন্য বিশেষজ্ঞ আচার্যের দুয়ারে উপস্থিত হইতেন। প্রয়োজন হইলে বিদ্যা ও শাস্ত্রাভ্যাসের জন্য বিদ্যার্থীরা ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশে গিয়া প্রবাস-জীবনও যাপন করিতেন। ক্ষেমেন্দ্রের দশোপদেশ-গ্রন্থের সাক্ষ্যে মনে হয়, বাঙালী বিদ্যার্থীরা কাশ্মীরে যাইতেন বিদ্যালাভের জন্য এবং সেখানে তর্ক, মীমাংসা, পাতঞ্জল-ভায্য প্রভৃতির অনুশীলন করিতেন। বাঙালী বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ আচার্যরাও যে আমন্ত্রিত হইয়া বাঙলার বাহিরে নানাস্থানে যাইতেন বিদ্যাদান ও ধর্মপ্রচারোদেশে, তাহার নানা প্রমাণ বিদ্যমান। অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা যাঁহারা করিতেন, রাজা-মহারাজ ও সামন্ত-মহাসামগুরা সম্পন্ন ব্যক্তিরা তাঁহাদের অধ্যয়ন-অধ্যাপনার জন্য অর্থদান, ভূমিদািন ইত্যাদি করিতেন, এমন সাক্ষ্যও ষে নাই তাহা নয়। পণ্ডিত, কবি, আচার্য প্রভৃতিদের মাঝে মাঝে তাহারা পুরুস্কৃতও করিতেন, সে সাক্ষ্যও বিদ্যমান। লিপিমালা ও সমসাময়িক সাহিত্যে এ-সব সাক্ষ্য বিস্তৃত।
