প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বৈয়াকরণিক চন্দ্ৰগোমী, তিব্বতী ঐতিহ্যের নৈয়ায়িক চন্দ্ৰগোমী এবং একই ঐতিহ্যের বজ্রযানী বৌদ্ধ তান্ত্রিক চন্দ্ৰগোমী কি একই ব্যক্তি? এ-প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়া কঠিন; তবে বৈয়াকরণিক এবং নৈয়ায়িক চন্দ্ৰগোমী এক ব্যক্তি হইলেও বজ্রযানী চন্দ্ৰগোমী একই ব্যক্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব বলিলেই চলে; খুব সম্ভব, পরবর্তী তিব্বতী ঐতিহ্য প্রাচীনতর চন্দ্ৰগোমী এবং অর্বাচীন চন্দ্ৰগোমীকে এক ব্যক্তিতে পরিণত করিয়া দুই জনের জীবন-কাহিনী একত্র মিশাইয়া দিয়াছিল।
গৌড়পাদ ও গৌড়পাদ-কারিকা
এই পর্বে ব্যাকরণ ও তর্কশাস্ত্র ছাড়া দর্শনের আলোচনায় বাঙলাদেশের কিছু প্ৰসিদ্ধি লাভ ঘটিয়াছিল। গৌড়পাদকীরিক নামে সুপরিচিত একটি আগম-শাস্ত্রগ্রন্থ এই যুগে বাঙলাদেশে রচিত হইয়াছিল, এ তথ্য নিঃসংশয়; তবে ইহার রচয়িতা কে ছিলেন তাহা লইয়া পণ্ডিত মহলে নানা মতামত বিদ্যমান। গ্রন্থকারের নাম বা উপাধি ছিল গৌড়পাদ, এইরূপ অনুমিত হইয়াছে; তিনি গৌড়াচার্য বলিয়াও কারিকায় উল্লিখিত হইয়াছেন। তাহার বাড়ি ছিল গৌড়দেশে, এই অনুমানেও সংশয় কিছু নাই। গৌড়পাদ ছিলেন শুকের শিষ্য এবং আচার্য শংকরের পরমগুরু বা গুরুর গুরু। শংকরাচার্যের শিষ্য সুরেশ্বর তাহার নৈষ্কর্মসিদ্ধি নামক গ্রন্থে গৌড়পাদকীরিকা হইতে দুইটি শ্লোক উদ্ধার করিয়াছেন। শংকরের ব্রহ্মসূত্ৰভাষ্যে গৌড়পাদের কোনো উল্লেখ নাই, কিন্তু কারিকার উদ্ধৃতি আছে; গ্রন্থকারের ইঙ্গিত আছে। ‘সম্প্রদায়বিদ’ ও ‘বেদার্থ সম্প্রদায়বিদ-আচাৰ্য’ এই পদে। গৌড়পাদ কারিকার দার্শনিক মতবাদ প্রাক-শংকর বৈদান্তিক মত ও বৌদ্ধ মাধ্যমিক শূন্যবাদের সূক্ষ্ম সংমিশ্রণ ও স্বাঙ্গীকরণ। সমগ্র গ্রন্থ ২১৫টি শ্লোকে গ্রথিত (প্রথম ভাগে আগম ২৯টি শ্লোক; দ্বিতীয় ভাগে বৈতথ্য ৩৮টি শ্লোক; তৃতীয় ভাগে অদ্বৈত ৪৮টি শ্লোক; চতুর্থ ভাগে অলাতশান্তি ১০০টি শ্লোক)। শাস্তুরক্ষিত, কমলশীল প্রভৃতি পরবর্তী কালের মাধ্যমিক মতবাদী একাধিক বৌদ্ধ আচার্য গৌড়পাদের গ্রন্থ হইতে শ্লোক উদ্ধার করিয়া তাহাদের মতামত ব্যক্ত করিয়াছেন। গৌড়পাদ আরও দুইটি কারিকা রচনা করিয়াছিলেন, একটির নাম সাংখ্য-কারিকা, আর একটির উত্তরগীতা। অল-বেরুনী জনৈক গৌড়-সন্ন্যাসী রচিত এক সাংখ্য-কারিকার কথা জানিতেন; গৌড়পাদের গ্রন্থ এবং আল-বেরুনী-উদ্দিষ্ট গ্রন্থ বোধ হয় একই গ্রন্থ।
রোমপাদ।৷ পালকাপ্য কাহিনী ॥ হস্ত্যায়ুৰ্বেদ
আর একটি বিদ্যায়ও প্রাচ্য ভারতের এবং বাঙলাদেশের কিছু প্ৰসিদ্ধি লাভ ঘটিয়াছিল বলিয়া মনে হয়; সে-বিদ্যার নাম হস্তী-আয়ুৰ্বেদবিদ্যা। কৌটিল্য ও গ্ৰীক-ঐতিহাসিকবৰ্গ হইতে আরম্ভ করিয়া য়ুয়ান-চোয়াঙ পর্যন্ত সকলেই প্রাচ্য দেশকে হস্তীর লীলাভূমি বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন; কৌটিল্য তো হস্ত্রী-চিকিৎসকদের কথাও বলিয়াছেন। কাজেই এ-দেশে হস্তী-চিকিৎসা সম্বন্ধে এক বিশেষ শাস্ত্র গড়িয়া উঠিবে, ইহা কিছু আশ্চর্য নয়। চম্পার রাজা রোমপাদের সঙ্গে এক ঋষি পাল্যকাপ্য বা পালক্যাপ্লের সুদীর্ঘ বাক্যালাপ হইয়াছিল হস্তী-চিকিৎসা সম্বন্ধে। গ্রন্থাকারে গ্রথিত এই সুদীর্ঘ। কথোপকথনই হস্তায়ুৰ্বেদ (বা গজ-চিকিৎসা, বা গজবিদ্যা, বা গজবৈদ্য বা গজায়ুৰ্বেদ)-গ্ৰন্থ নামে খ্যাতি লাভ করিয়াছে। লৌহিত্য যেখানে হিমালয় হইতে নিৰ্গত হইয়াছে সেইখানে ছিল ঋষি পালক্যাপ্যের আশ্রম। পালক্যাপ্যের নাকি জন্ম হইয়াছিল কাপ্যগোত্রে, এক ঋষির ঔরসে, হস্তিনীর গর্ভে। আর, রোমপাদ নাকি ছিলেন রামায়ণ-কীর্তিত দশরথের সমসাময়িক! সমস্ত বর্ণনাটিই পৌরাণিক স্বপ্ন-কল্পনার সৃষ্টি, সন্দেহ নাই। পালকাপ্য নামে যথার্থ কোনও পুরুষ ছিলেন, কিনা তাহাও সন্দেহজনক; দ্রাবিড় ভাষায় পাল অর্থই হন্তী এবং কপিও এক অর্থে হন্তী। তবে, গ্রন্থটি বিদ্যমান এবং দশম-একাদশ শতকের আগেই যে ইহা রচিত হইয়াছিল তাহারও প্রমাণ একাধিক। অগ্নিপুরাণের গজ-চিকিৎসা অধ্যায় পালকাপ্যরোমপাদের কথোপকথনের উপর ভিত্তি করিয়া রচিত হইয়াছিল, এ-কথা অগ্নিপুরাণেই বলা হইয়াছে; এবং অগ্নিপুরাণের শাস্ত্রীয় অংশ দশম শতকের আগেই রচিত হইয়াছিল, সন্দেহ নাই। একাদশ শতকে ক্ষীরস্বামী-রূচিত আমরকোয-টীকায় একাধিক বার পালক্যাপ্যের উদ্ধৃতি আছে। রঘুবংশ কাব্যে ইন্দুমতীর স্বয়ম্বর বর্ণনা-প্রসঙ্গে এক অঙ্গরাজার হন্তীশালায় সূত্রকারগণ কর্তৃক হস্তীকে-শিক্ষাদানের উল্লেখ আছে। পালকাপ্য এই সূত্রকারদের অন্যতম হওয়া অসম্ভব নয়। যাহাই হউক, এ-তথ্য প্রায় নিঃসংশয় যে, বহু প্রাচীনকাল হইতেই হন্তী-চিকিৎসার একটি ঐতিহ্য প্রাচ্য দেশে বর্তমান ছিল, কিছু গ্ৰন্থও রচিত হইয়াছিল সন্দেহ নাই; কিন্তু পালকাপের হন্তী-আয়ুৰ্বেদ গ্রন্থ যে-ভাবে ও রূপে আমরা পাইয়াছি তাহা এত সুপ্রাচীন কালের নয়, যদিও রোমপাদ-পালক্যাপ্যের কাহিনীর মূল সুপ্রাচীন হইলেও হইতে পারে। বর্তমান গ্রন্থটি খুব সম্ভব খ্ৰীষ্টোত্তর ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে, ব্ৰহ্মপুত্র তীরে, কোথাও সংকলিত হইয়াছিল, প্রাচীনতর গ্রন্থাদির উপর নির্ভর করিয়া।
এ-পর্যন্ত যে ক’টি গ্রন্থের উল্লেখ করা হইল তাহার প্রত্যেকটিই জ্ঞান-বিজ্ঞানগত। এইগুলি ছাড়া আরও অনেক গ্ৰন্থ এই পর্বে রচিত হইয়াছিল, সন্দেহ নাই, কিন্তু সে সব গ্রন্থ কালের প্রভাব এড়াইয়া মানুষের স্মৃতিতেও বাচিয়া থাকে নাই। নানা শাস্ত্র, নানা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যে বাঙলাদেশে হইত। তাহা তো আগেই দেখিয়াছি এবং যে দেশে এই পর্বে চান্দ্র-ব্যাকরণ ও গৌড়পাদকীরিকার মতো গ্ৰন্থ রচিত হইয়াছিল, সে-দেশে সেই পর্বে অন্য বহু গ্ৰন্থ রচিত হইয়া ভূমি ও পশ্চাদপট রচনা করে নাই, এমন হইতে পারে না। চন্দ্ৰগোমী তো কাব্য ও নাটকও রচনা করিয়াছিলেন। সাহিত্যরচনার একটা ধারাও প্রবহমান ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু তাহার উল্লেখ অথবা অবশেষ কোথাও দেখিতেছি না।
