সমসাময়িক তাম্রলিপ্তির শিক্ষাদীক্ষার সংবাদ আরও একাধিক চীনা শ্রমণের সাক্ষ্য হইতে জানা যায়। তা চে’ঙ-টেঙা নামে এক চীনা শ্রমণ বারো বৎসর তাম্রলিপ্তিতে বসিয়া সংস্কৃত বৌদ্ধগ্রন্থাদি অধ্যয়ন করিয়া বৌদ্ধধর্মে অসাধারণ বুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন এবং তাহার পর চীনদেশে ফিরিয়া গিয়া সেখানে উল্লঙ্গের নিদানশাস্ত্ৰ ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। তাও-লিন নামে আর একজন চীনা শ্রমণ তিন বৎসর তাম্রলিপ্তিতে বসিয়া সংস্কৃত শিখিয়া ছিলেন এবং সর্বাস্তিবাদ-নিকায় দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইৎসিঙ তাম্রলিপ্তি আসিয়াছিলেন ৬৭৩ খ্ৰীষ্ট শতকে; সুবিখ্যাত পো-লো-হো (বরাহ?)-বিহারে তা চে’ঙ-টেঙা’র সঙ্গে তাহার দেখা য়াছিল; তিনি এই বিহারে কিছুকাল কাটাইয়াছিলেন, সংস্কৃত ভাষা এবং শব্দবিদ্যার চর্চা করিয়াছিলেন এবং নাগাৰ্জ্জুন-বোধিসত্ত্ব-সুহৃল্লেখ নামে অন্তত একখানি সংস্কৃত গ্রন্থ চীনা ভাষায় অনুবাদ করিয়াছিলেন। অন্য এক চীনা পরিব্রাজক সং-চি বলিতেছেন, সমতটের তদানীন্তন রাজা প্রতিদিন মহাপ্রজ্ঞাপারমিতা-সূত্রের লক্ষ শ্লোক আবৃত্তি করিতেন।
বৌদ্ধ বিহার-সংঘারামগুলির প্রত্যেকটিই ছিল বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষার কেন্দ্র এবং য়ুয়ান-চোয়াঙ এবং অন্যান্য চীনা-সাক্ষ্যেই সপ্রমাণ যে, এই কেন্দ্রগুলিতে শুধু বৌদ্ধধর্মের চর্চা এবং বৌদ্ধ শাস্ত্ৰই শুধু পঠিত হইত। তাহা নয়, ব্যাকরণ, শব্দবিদ্যা, হেতুবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, চতুর্বেদ, সাংখ্য, সংগীত ও চিত্ৰকলা, মহাযান শাস্ত্ৰ, অষ্টাদশ নিকায়বাদ, যোগশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি জ্ঞানের বিভিন্ন দিকও বৌদ্ধ শ্রমণদের অধিতব্য বিষয়ের অন্তর্গত ছিল। য়ুয়ান-চোয়াঙ যে অসংখ্য দেবমন্দিরের কথা বলিয়াছেন, তাহদের কেন্দ্ৰ করিয়া ব্ৰাহ্মণ-আচার্য –উপাধ্যায় ইত্যাদিও কম ছিলেন না এবং যে অগণিত দেবপূজকের কথা য়ুয়ান-চোয়াঙ বলিয়াছেন, তাহারা যে শুধু ব্ৰাহ্মণ্য ধর্মশাস্ত্রেরই চর্চা করিতেন, এমন মনে করিবার কারণ নাই। নানা পার্থিব, দৈনন্দিন সমস্যাগত জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষার চর্চাও নিশ্চয়ই তাহদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। যাহাই হউক, এ-তথ্য সুস্পষ্ট যে, ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের মধ্যে বাঙলাদেশে সংস্কৃত ভাষা এবং বৌদ্ধ-জৈন-ব্ৰাহ্মণ্য ধর্মকে আশ্রয় করিয়া আর্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষা বাঙলাদেশে প্রোথিত মূল হয় এবং শতাব্দী কালের মধ্যেই ফসল ফলাইতে আরম্ভ করে। সপ্তম শতকের লিপিগুলির অলংকারময় কাব্যরীতিই তাহার প্রমাণ। এই কাব্যরীতি একান্তই মধ্য-ভারতীয় রচনাস্ত্রীতি ও আদর্শের প্রেরণা ও অনুকরণে সৃষ্ট, সন্দেহ নাই। কিন্তু এই লিপিগুলি ছাড়া কাব্যসাহিত্য-চৰ্চার আর কোনো প্রমাণ আমাদের সম্মুখে অনুপস্থিত।
ব্যাকরণচন্দ্ৰগোমী ও চান্দ্র-ব্যাকরণ
জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানাদিক সম্বন্ধে অনুশীলনের কিছু কিছু পরিচয় বিদ্যমান। ব্যাকরণের চর্চায় প্রাচ্য-ভারত, তথা বাঙলাদেশ অতি প্রাচীন কালেই প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল; পাণিনির সাক্ষ্যই তাহার প্রমাণ। সপ্তম শতকে ইৎ-সিঙ যে-সব বিদ্যা অনুশীলন করিবার জন্য তাম্রলিপ্তি আসিয়াছিলেন তাহার মধ্যে শব্দবিদ্যা অন্যতম। প্রাচীন বাঙলার এই ব্যাকরণ প্রসিদ্ধি যাঁহাদের জ্ঞান ও খ্যাতির উপর প্রতিষ্ঠিত তাহাদের মধ্যে চান্দ্র-ব্যাকরণ পদ্ধতির স্রষ্টা চন্দ্ৰগোমী অন্যতম। চান্দ্র-ব্যাকরণ ও তাহার বৃত্তি বা টীকা চন্দ্ৰগোমীর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। এই ব্যাকরণ মুখ্যত পাণিনি-অনুসারী, এবং এক সময়ে কাশ্মীর নেপাল-তিব্বত-সিংহলে ইহার প্রচলনও ছিল প্রচুর, কিন্তু মৌলিকতা এবং নূতন কোনও তত্ত্ব বা রীতির অভাবে এই প্রসার বা প্রসিদ্ধি পরবতী কালে স্থায়িত্ব লাভ করিতে পারে নাই। পাগ-সাম-জোন-জাং-গ্রন্থে বলা হইয়াছে যে, চন্দ্ৰগোমী ছিলেন পতঞ্জলির মহাভাষ্য-রীতিপদ্ধতির বিরোধী। ভর্তৃহরি তাহার বাক্যপদীয়-গ্রন্থে জনৈক বৈয়াকরণিক চন্দ্রাচার্যের নাম করিয়াছেন এবং তিনি যে মহাভাষ্য-মতবিরোধী ছিলেন এরূপ ইঙ্গিতও করিয়াছেন; কলহণও তাহার রাজতরঙ্গিনী-গ্রন্থে চন্দ্রাচার্য ও তাহার ব্যাকরণের উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু বলিতেছেন, চন্দ্রাচার্য মহাভাষ্য-চৰ্চার পুনঃপ্রচলন করিয়াছিলেন। যাহাই হউক, বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মনে করেন, চন্দ্ৰগোমী ও চন্দ্রাচার্য একই ব্যক্তি। চন্দ্ৰগোমিন ও তাহার ব্যাকরণের সন-তারিখ লইয়া পণ্ডিতদের ভিতরে মত-বিরোধের অন্ত নাই। তবে মোটামুটি বলা চলে, জয়াদিত্য ও বামনের কাশিকা-গ্রন্থের (পাণিনি-টীকা) আগেই চান্দ্র-ব্যাকরণ রচিত ও সুপ্রচলিত হইয়াছিল; কারণ এই টীকায় চন্দ্ৰগোমীর মূল ৩৫টি সূত্র বিনা স্বীকৃতিতে উদ্ধৃত হইয়াছে। এই ৩৫টি সূত্র পাণিনি-ব্যাকরণে কোথাও নাই। যাহাই হউক, চন্দ্ৰগোমী সপ্তম শতক বা.. সপ্তম শতকের আগেই কোনও সময়ে বিদ্যমান ছিলেন, এ-সম্বন্ধে কোনও সংশয় নাই। চন্দ্ৰগোমী ছিলেন বৌদ্ধ; তাহার অস্ত্যনাম গোমিন (বাঙলা বর্তমান গুই?) এবং তদ্রচিত ব্যাকরণের বৃত্তি বা টীকার প্রারম্ভে মঙ্গলশ্লোকের সর্বজ্ঞ-স্তুতিই তাহার প্রমাণ। তাহার জন্মভূমি ছিল বরেন্দ্রীতে; কিন্তু পাগ-সাম-জোন-জাং গ্রন্থের সাক্ষ্য প্রামাণিক হইলে স্বীকার করিতে হয়, তিনি পরবর্তী জীবনে কোনও কারণে বরেন্দ্রী হইতে নির্বাসিত হইয়া চন্দ্ৰদ্বীপে গিয়া বাস করেন। তিব্বতী ত্যাঙ্গুরে তালিকাবদ্ধ চন্দ্ৰগোমীর একটি গ্রন্থে তিনি পরিষ্কার দ্বৈপা বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন। তিব্বতী ঐতিহ্যমতে চন্দ্ৰগোমী যে শুধু বৈয়াকরণিক ছিলেন, তাহাই নয়। তর্কবিদ্যায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন এবং ন্যায়সিদ্ধালোক নামে তৰ্কশাস্ত্রের একটি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। শুধু তাঁহাই নয়, তিনি বৌদ্ধ তান্ত্রিক বজ্ৰযান সাধনাগত ৩৬টি গ্রন্থের লেখক ছিলেন; তারা এবং মঞ্জুশ্ৰীর উপর কয়েকটি সংস্কৃত স্তোত্র রচনা করিয়ছিলেন, লোকানন্দ নামে একটি নাটক এবং শিষ্যের নিকট গুরুর পত্র হিসাবে রচিত শিষ্যলেখধর্ম নামে একটি ক্ষুদ্র কাব্যও রচনা করিয়াছিলেন। লোকানন্দ নাটকটির তিব্বতী অনুবাদ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় নাই; শিষ্যলেখধর্ম কাব্যটিতে বিভিন্ন ছন্দে ১১৮টি সংস্কৃত শ্লোক; রচনারীতি দুর্বল ও বহুঅর্ভ্যস্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ সংস্কৃত কাব্যানুসারী। এই তিব্বতী ঐতিহ্যমতেই চন্দ্ৰগোমী এক সময় নালন্দা মহাবিহারে গিয়া আচার্য স্থিরমতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং সেখানে মাধ্যমিক শাস্ত্ৰে সুপণ্ডিত চন্দ্ৰকীর্তির সঙ্গে তাহার দেখা হইয়াছিল। তারনাথ বলেন, চন্দ্ৰগোমীর ব্যাকরণ চন্দ্ৰকীর্তির শ্লোক্যবদ্ধ ব্যাকরণগ্রন্থে সমন্তভদ্রকে প্রায় বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছিল। চন্দ্ৰগোমী নালন্দা-মহাবিহারে আচার্য স্থিরমতির নিকট সূত্র ও অভিধর্মপিটক অধ্যয়ন করিয়াছিলেন এবং ব্যাকরণ, সাহিত্য, জ্যোতিষ, তৰ্কশাস্ত্ৰ, চিকিৎসাবিদ্যা এবং নানা কলায় বুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। আচার্য অশোক তাহাকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষাদান করেন এবং তিনি তারা ও অবলোকিতেশ্বরের পরমভক্ত হন। চন্দ্ৰগোমী সিংহল ও দক্ষিণ ভারতে গিয়াছিলেন এবং দক্ষিণ-ভারতে বসিয়াই নাকি চান্দ্র-ব্যাকরণ রচনা করিয়াছিলেন। নালন্দা-মহাবিহারের আচার্যরা গোড়ায় তাহার প্রতি খুব শ্রদ্ধিত ছিলেন না; কিন্তু পরে চন্দ্ৰকীর্তি তাহার প্রতিভার পরিচয় পান এবং তাহারই প্রেরণায় ও চেষ্টায় চন্দ্ৰগোমী ক্রমে সকলের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেন। চন্দ্ৰগোমী যোগাচায়ী ছিলেন এবং যোগাচার দর্শন লইয়া বিচারালোচনা করিতেন।
