পাণিনি প্রাচ্যখণ্ডের বৈয়াকরণিকদের বিশিষ্ট মতামতের কথা বলিয়াছেন। এ-তথ্য সুস্পষ্ট যে, এই সব বৈয়াকরণিকদের মতামত যথেষ্ট শক্তি ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করিয়াছিল; তাহা না হইলে পাণিনি তাহা উল্লেখ করিবার ক্লেশ স্বীকায় করিতেন না। কিন্তু সাহিত্য রচিত ও গ্রথিত না। হইলে ব্যাকরণ রচিত হয় না, রচনার প্রয়োজনও হয় না; বৈয়াকরণিকদের বিশিষ্ট মতামতও গড়িয়া উঠে না। সুতরাং অনুমান করা চলে, প্রাচ্য অ-বৈদিক আর্যভাষায় কিছু কিছু সাহিত্য রচিত ও গ্রথিত হইয়াছিল, ভাষার রীতি-পদ্ধতি লইয়া আলোচনা-গবেষণাও হইয়াছিল; কিন্তু কী ছিল সেই সব জ্ঞান-বিজ্ঞানের রূপ ও প্রকৃতি তাহা বলিবার মতো কোনো উপাদানই আমাদের হাতে নাই!
অবৈদিক প্রাচ্য আর্যভাষা ও সংস্কৃতির পদানুসরণ করিয়া ক্রমশ উত্তর ও মধ্য-ভারতীয় আর্যভাষা প্রাচ্যদেশে বিস্তার লাভ করিতে আরম্ভ করিল; এবং প্রাচ্য প্রাকৃত এবং উত্তর ও মধ্য ভারতীয় সংস্কৃতির স্রোত বাঙলাদেশে সবেগে প্রবাহিত হইতে লাগিল। খ্ৰীষ্টীয় শতকের কিছু আগে হইতেই, বোধ হয়, মৌর্য-আমল হইতে— গোড়ার দিকে বাঙলার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে এবং পরে ক্রমশ পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলেও। এই স্রোতের বাহক হইলেন মধ্য-ভারতীয় নানাধর্মী যতি-সন্ন্যাসীরা, বণিক-সার্থবাহরা, সৈনিক-রাজপুরুষেরা। প্রাক-আর্য ও অনার্য নরনারীরা ক্রমশ বৌদ্ধ, জৈন ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের আশ্রয়লাভের সঙ্গে সঙ্গে আৰ্য-ভাষা ও সংস্কৃতির নিকট মাথা নোয়াইতে বাধ্য হইলেন। উওর-বাঙলা (এবং সম্ভবত পশ্চিমবাংলায় ) মৌৰ্য-সাম্রাজ্যান্তর্গত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্যভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার প্রতিপত্তি বিস্তার আরও সহজ হইয়া গেল। মহাস্থানের ব্ৰাহ্মী লিপিখণ্ডই সমসাময়িক বাঙলায় প্রচলিত আর্যভাষার একমাত্র অভিজ্ঞান।
— নেন সবর্গীয় [া] নং [গলদানস] দুমদিন [মহা-] মাতে সুলখিতে পুডনগলতে এ [ত] ং [নি] বহিপয়িসতি। সংবগীয়ানাং [চ দি] নে [তথা] [ধা]] নিয়ং নিবহিসতি। দ। [ং] গ [া] তিয়া [ি]য়া [ি] য় [ে]ক [ে] দ [বা-] [তিয়ায়ি] কসি। সুঅতিয়ায়িক [সি] পি গংডি [কেহি] [ধানিয়ি] কেহি এস কোঠাগালে কোসং [ভর-] [নীয়ে]।
বলা বাহুল্য, এই ভাষা প্রাচীন মাগধী বা প্রাচ্য প্রাকৃতে লক্ষণাক্রান্ত। যাহাই হউক। এই ভাবে প্রাক-আর্য ও অনার্য ভাষাগুলি আর্যভাষার পথ ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হইল; এবং বিগত দুই হাজার বৎসর ধরিয়া প্রাচ্য ভূখণ্ডে আর্যভাষা অনার্য ও প্রাক-আর্য ভাষাকে গ্রাস করিয়া করিয়া অগ্রসর হইতেছে। সে-ক্রিয়া আজও চলিতেছে এবং যতদিন মুণ্ডা-কোল। —মনখমের, দ্রাবিড় ও ভোট-ব্রহ্ম ভাষা ও বুলিগুলির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি না ঘটিবে ততদিন চলিতেই থাকিবে।
০২. গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্ব
মহাস্থান-লিপির কাল হইতে আরম্ভ করিয়া বাঙলায় গুপ্তাধিকার বিস্তৃতির কাল পর্যন্ত আর্য ভাষার রূপ ও প্রকৃতি কিরূপ ছিল এবং সে-ভাষার জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার কিরূপ হইয়াছিল তাহা জানিবার কোনো উপায় নাই। অনুমান করা চলে, আৰ্য-ভাষার প্রাচ্য মাগধী-প্ৰাকৃত রূপই ক্রমশ বিস্তার লাভ করিতেছিল, কিন্তু এ-কথাও বোধ হয়। সত্য যে, পোশাকী ভাষা হিসাবে অর্থাৎ পণ্ডিত-সমাজে এবং রাজকীয় ক্রিয়াকর্মে সেই ভাষা স্বীকৃতি ও সমাদর লাভ করিতে পারে নাই। কারণ, পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে যে ক’টি গুপ্তবংশীয় রাজকীয় পট্টোলী আমাদের হস্তগত হইয়াছে তাহার একটিরও ভাষা প্রাচ্য প্রাকৃত নয়, মধ্য ভারতীয় বিশুদ্ধ সংস্কৃত। বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড়ের নিকট পোখরুণা বা পুষ্করণ গ্রামে প্রাপ্ত চতুর্থ শতকের চন্দ্ৰবৰ্মার লিপির ভাষাও সংস্কৃত। লক্ষণীয় এই যে, এই প্রত্যেকটিই লিপিই রচিত গদ্যে এবং সাহিত্যরসের কোনো আভাসও এই রচনাগুলিতে নাই। বস্তুত, সপ্তম শতকীয় লোকনাথের ত্রিপুরা পট্টোলী বা কামরূপরাজ ভাস্করবর্মার নিধনপুর পট্টোলীর আগে সমসাময়িক মধ্য-ভারতীয় অলংকারবহুল কাব্যরীতির কোনও পরিচয়ই বাঙলাদেশে পাইতেছি না। মনে হয়, ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের আগে বাঙালী পণ্ডিত-সমাজ সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রাপধারার সঙ্গে ভালো করিয়া আত্মীয়তা স্থাপন করিতেই পারেন নাই। চেষ্টাটা বোধ হয় আরম্ভ হইয়াছিল আরও কয়েক শতাব্দী আগে হইতেই এবং বৌদ্ধ সংঘারাম এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মকেন্দ্রগুলি ক্ষুদ্র বৃহৎ শিক্ষায়তন হইয়া গড়িয়াও উঠিতেছিল। নহিলে পঞ্চম শতকে তাম্রলিপ্তিতে বসিয়া অধ্যয়ন ও পুঁথি নকল করিয়া চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন সুদীর্ঘ দুই বৎসর কাটাইতেন না। সপ্তম শতকে যখন য়ুয়ান-চোয়াঙ কযঙ্গল, পুণ্ড্রবর্ধন, কামরূপ, সমতট, তাম্রলিপ্তি এবং কর্ণসুবর্ণ ভ্ৰমণে আসিয়াছিলেন তখন বৌদ্ধ, নিগ্ৰস্থ ও ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা-দীক্ষার প্রসার আরও বাড়িয়া গিয়াছে। এই সব জনপদের লোকদের জ্ঞানস্পাহা ও জ্ঞানচর্চার তিনি ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন। কযঙ্গলে তখন ছ’সাতটি বৌদ্ধ বিহারে তিন শতের উপর বৌদ্ধ শ্রমণ; পুণ্ড্রবর্ধনের বিশটি বিহারে তিন হাজারের উপর শ্রমণ সংখ্যা, সমতটের ত্রিশটি বিহারে শ্রমণ সংখ্যা দুই হাজারের উপর, কর্ণসুবর্ণের দশটি বিহারে দুই হাজারের উপর এবং তাম্রলিপ্তির দশটি বিহারেও প্রায় একই সংখ্যক শ্রমণের বাস। পুণ্ড্রবর্ধনের পো-সি —পো-(মহাস্থানের সন্নিকটে ভাসু বিহার?)। বিহার এবং কর্ণসুবর্ণের রক্তমৃত্তিকা -(লো-টো-মো-চি) বিহার যে খুবই প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল, যুয়ান-চোয়াঙের সাক্ষ্যই তাহার প্ৰমাণ। নালন্দার-মহাবিহারের সঙ্গে ষষ্ঠ-সপ্তম শতকীয় বাঙলার জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষাদীক্ষার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং বাঙলার শিক্ষার্থী, আচার্য ও রাজবংশ নালন্দা-মহাবিহারের সংবর্ধনের জন্য যে প্রয়াস করিয়াছেন তাহা তুচ্ছ করিবার মতো নয়। এই মহাবিহারের মহাচার্য বিশ্রুতকীর্তি শীলভদ্র ছিলেন সমতটের ব্রাহ্মণ্য রাজবংশের অন্যতম সন্তান এবং তিনিই ছিলেন। য়ুয়ান-চোয়াঙের গুরু। শীলভদ্র ভারতের নানাস্থানে জ্ঞানান্বেষণে ঘুরিয়া ঘুরিয়া অবশেষে নালন্দায় আসিয়া স্থিতিলাভ করেন এবং আচার্য ধর্মপালকে গুরুত্বে বরণ করিয়া লন। দেখিতে দেখিতে বৌদ্ধধর্মের সূক্ষ্ম ও জটিল চিন্তাধারায় তাহার গভীর জ্ঞানলাভ ঘটে এবং তাহার জ্ঞান ও জীবনচর্যার খ্যাতি দেশে বিদেশে ছাড়াইয়া পড়ে। শীলভদ্রের যখন মাত্র ত্রিশ বৎসর বয়স তখন দক্ষিণ-ভারত হইতে এক ব্রাহ্মণ আচার্য নালন্দায় আসেন আচার্য ধর্মপালের সঙ্গে বিতর্কের জন্য। ধর্মপাল শীলভদ্রকে আদেশ করিলেন বিচারে প্রবৃত্ত হইতে। শীলভদ্র অচিরেই সেই ব্ৰাহ্মণ আচার্যকে বিতর্কে পরাভূত করিয়া আপন সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করিলেন। মগধের রাজা সন্তুষ্ট হইয়া শীলভদ্রকে একটি গ্রামের রাজস্ব পুরস্কার স্বরূপ দিতে চাহিলেন; শীলভদ্র প্রথমে রাজী হন নাই; পরে তাঁহাকে স্বীকৃত হইতে হয়। সেই অর্থ দ্বারা তিনি একটি বিহার নির্মাণ করেন এবং বাৎসরিক রাজস্ব দান করিয়া দেন। সেই বিহারের ব্যয় নির্বাহের জন্য। কালক্ৰমে শীলভদ্র নালন্দা মহাবিহারের মহাচার্যের পদে প্রতিষ্ঠিত হন; মহাবিহারের তখন প্রায় ১০,০০০ শ্রমণের বাস। তাঁহাদের মধ্যে একমাত্র শীলভদ্রই সমস্ত শাস্ত্র ও সূত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। বিনীত শ্রদ্ধায় মহাবিহারের সকল শ্রমণেরা তাঁহাকে ‘সদ্ধার্মের ভাণ্ডার বলিয়া সম্ভাষণ করিত। শীলভদ্রের নিকট য়ুয়ান-চোয়াঙ যোগশাস্ত্ৰ অধ্যয়ন করিতেন; য়ুয়ান-চোয়াঙের সঙ্গে সঙ্গে একটি ব্রাহ্মণও সেই অধ্যয়নে যোগদান করিয়াছিলেন। শীলভদ্রের অনুরোধে রাজা শিলাদিত্য হর্ষবর্ধন সেই ব্ৰাহ্মণকে তিনটি গ্রামের ভূমি-রাজস্ব দান করিয়াছিলেন। শীলভদ্র রচিত অন্তত একটি গ্রন্থের কথা আমরা জানি; সে-গ্রন্থটি হইতেছে আৰ্য-বুদ্ধ-ভূমি-ব্যাখ্যান; এই গ্রন্থটি তিব্বতী ভাষায় অনূদিত হইয়াছিল।
