প্রাক-আর্য ধ্যান-ধারণা
প্রাক-আর্য কৌম বাঙালী সমাজের ধ্যান-ধারণার কথা আগেই কিছু বলিয়াছি, বর্তমান অধ্যায়ে এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে। ভূতপ্রেতিবাদে বিশ্বাস, পুনর্জন্মবাদে বিশ্বাস, প্ৰজনন শক্তি, যাদুশক্তি প্রভৃতি প্রতীকের উপর দেবত্ব আরোপ এবং তাঁহাদের শুভ-অশুভ নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতায় বিশ্বাস প্রভৃতি সমস্তই তাহাদের ধ্যান-ধারণার অন্তর্গত ছিল। আজও সেই সব ধ্যান-ধারণা বাঙালী সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারণার উপর প্রভাব বিস্তার করিয়া আছে এবং আমাদের ধর্মকর্মানুষ্ঠানের অনেক আচার-ব্যবহারকে নিয়ন্ত্ৰণ করিতেছে। শ্ৰাদ্ধানুষ্ঠান, পিতৃপুরুষের তর্পণ প্রভৃতি ব্যাপারে যে ধ্যান আমাদের মনন-কল্পনায় তাহার মূলে প্রাক-আর্য কৌম সমাজের বিশ্বাস সক্রিয়, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। শ্রাদ্ধের সঙ্গে জড়িত বৃষিকাষ্ঠ ও তাহার বিসর্জন, রান্নার পর কাক ডাকিয়া হবিষ্যান্ন খাওয়ানো, পিণ্ডদান প্রভৃতি সমস্তই আমরা আহরণ করিয়াছি আমাদেরই প্রতিবেশী শবর-পুলিন্দ-কিরাত-সঁওতাল-মুণ্ডা-কোল-ভিলদের নিকট হইতে। মঙ্গলানুষ্ঠানের প্রারম্ভে আভ্যুদয়িক অনুষ্ঠানে মৃত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁহাদের পূজা ইহাদের ধ্যান-ধারণা হইতেই আহৃত। বাঙলাদেশের বিবাহনুষ্ঠানে হােম, সম্প্রদান ও সপ্তপদীগমন ছাড়া যে-সব স্ত্রী-আচার, লোকাচার প্রভৃতি প্রচলিত তাহাও মূলত এই কৌম সমাজেরই দান। এই আদিমতম ধর্মকর্ম ও ধ্যান-ধারণার উপরই বাঙলার বৈদিক ও পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্য এবং অবৈদিক বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি ধর্মের প্রতিষ্ঠা ও প্রসার।
১৩. ভাষা-সাহিত্য-জ্ঞানবিজ্ঞান-শিক্ষা দীক্ষা
১. প্রাক-আৰ্য ভাষার কথা
প্রাচীন বাঙলার, তথা প্রাচীন ভারতবর্ষের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষার ইতিহাস সাধারণত আমরা আরম্ভ করিয়া থাকি বেদ-ব্ৰাহ্মণ-উপনিষদ লইয়া। উপাদানের অভাবে প্রাক-বৈদিক কাল সম্বন্ধে আজও কিছু বলিবার উপায় নাই। কিন্তু বেদ-ব্ৰাহ্মণ-উপনিষদে, এমন কি ধর্মশাস্ত্ৰ-ধৰ্মসূত্রে এবং অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থে যে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষা প্রতিফলিত, বাঙলাদেশ বহুদিন তাহার স্পর্শও পায় নাই। ব্ৰহ্মাবর্ত ও আর্যাবর্তের হৃদয়দেশ হইতে বহুদূরে, আর্যাবর্তের প্রাচ্য প্রত্যন্তে অবস্থিত এই দেশে আর্য জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা-দীক্ষার প্রসার ঘটিয়াছিল বহু বিলম্বে। কিন্তু তাহারও আগে এ-দেশে গৃহবদ্ধ, পরিবারবদ্ধ, সমাজবদ্ধ জনমানুষ বাস করিত; এবং তাঁহাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের এবং শিক্ষা-দীক্ষার একটা সংস্কারও ছিল, শিল্পসাহিত্য-সংগীতের একটা সংস্কৃতিও ছিল। এই সংস্কার ও সংস্কৃতিকে অনাগত কালের জন্য ধারণ করিয়া রাখে প্রত্যেক জন ও গোষ্ঠীর বিশিষ্ট লিপিবদ্ধ ভাষা। বস্তুত, লিপিবদ্ধ ভাষাই সেই বাহন যাহা এক যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কার-সংস্কৃতিকে বহন করিয়া লইয়া যায়। ভবিষ্যৎ যুগের দুয়ারে। কিন্তু সেই প্রাক-আর্য নরনারীদের ভাষার লিপি কিছু ছিল না; থাকিলেও এ-পর্যন্ত আমাদের জানা নাই। কাজেই তাঁহাদের শিক্ষা-দীক্ষা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য আজ আমাদের দুয়ারে আসিয়া পৌঁছে নাই। তবে, তাহাদের শিল্প-সাহিত্য-নৃত্যগীতের, অর্থাৎ চলমান সংস্কৃতির কিছুটা ধরিতে পারা সম্ভব আদিম কৌমসমাজের যে-সব নরগোষ্ঠী আজও আমাদের মধ্যে বিচরমান তাহাদের শিল্প-সাহিত্য-নৃত্যগীতে, এক কথায় তাহাদের সামগ্রিক জীবনচর্যায়।
প্রাক-আৰ্য ভাষার কথা
প্রাক-আর্য প্রাচ্য ভারতীয় নরনারীর ভাষা লইয়া আলোচনা-গবেষণা হইয়াছে প্রচুর, আজও হইতেছে। ভাষাতাত্ত্বিকদের সুদীর্ঘ ও সুবিস্তৃত গবেষণার ফলে আজ আমরা জানি, প্রাচ্য ভারতের, তথা বাঙলার সর্বপ্রাচীন ভাষা ছিল (যতটুকু নির্ণয় করা যায়) অস্ট্রিক্গোষ্ঠীর ভাষা এবং সেই ভাষার ঘনিষ্ঠতর আত্মীয়তা ছিল মন-খমের ভাষা-পরিবারের সঙ্গে; কিছুটা আত্মীয়তা কোল-মুণ্ডা ভাষা-পরিবারের সঙ্গেও ছিল। এই মুণ্ডা-মন-খমের ভাষা-ভিত্তির উপর নূতন পলি রচনা করিয়াছিল দ্রাবিড় ভাষা-পরিবারের স্রোত, বিশেষভাবে বাঙলার পশ্চিমাঞ্চলে এবং কিছুটা মধ্য-বাঙলায়ও। পূর্ব ও উত্তর-বাঙলায় দ্রাবিড় ভাষার পলি বিশেষ বিস্তৃতি লাভ করে নাই, মোটামুটি এ-কথা বলা চলে। পশ্চিম ও মধ্য-বাঙলায়ও দ্রাবিড় ভাষার প্রভাবের বিস্তৃতি ও গভীরতা কতটা ছিল তাহা নিশ্চয় করিয়া বলিবার উপায় আজও নাই। পূর্ব ও উওর-বাঙলার প্রাচীনতর মুণ্ডা-মন-খমের মূল ভাষার উপর তৃতীয় একটি ভাষাস্রোত আপন প্রবাহ মিশাইয়াছিল; সে-ভাষা ভোটগ্ৰহ্ম নরগোষ্ঠীর ভাষা, প্রাচীন কিরাতজনদের ভাষা। নানা নরগোষ্ঠীকে আশ্রয় করিয়া নানা ভাষার এই জটিল সংমিশ্রণের সূচনা বাঙলাদেশে, তথা প্ৰাচ্য-ভারতে আরম্ভ হইয়াছিল খ্ৰীষ্ট জন্মের বহু শতাব্দী আগে হইতেই।
বেদ-ব্ৰাহ্মণের আর্য ঋষিরা প্রাচ্য ভারতকে খুব সুনজরে দেখিতেন না, এ-কথা তো আগেই একাধিক-প্রসঙ্গে বলিয়াছি। তাহার অন্যতম প্রধান কারণ, প্রাচ্য নরনারীর ভাষা ছিল তাহদের নিকট দুর্বোধ্য, অর্থহীন। অথর্ববেদের ঋষিদের কাছে প্রাচ্যদেশ বহু দূরদেশ; শতপথ-ব্রাহ্মণে এ-দেশের লোকেরা ‘আসূর্য অর্থাৎ অসুরপ্রকৃতি বিশিষ্ট; ঐতরেয় ব্রাহ্মণে এ-দেশ দসু্যদের দেশ; বৌধায়ন-ধর্মসূত্র রচনাকালেও এ-দেশ অস্পৃশ্যদের দেশ। কিন্তু ক্ৰমে ক্ৰমে ধীরে ধীরে প্রাচ্য ভারতে আর্যভাষার প্রসার ঘটিতে আরম্ভ করিল এবং বোধ হয় কিছু কিছু আর্য-সংস্কৃতিরও; তবে, যতটুকু জানা যায়, এই আর্যভাষা ও সংস্কৃতি, দীর্ঘমুণ্ড ঋগ্বেদীয় আর্যভাষা ও সংস্কৃতি নয়, হ্রস্বমুণ্ড অ্যালপীয় আর্যদের ভাষা ও সংস্কৃতি শ্ৰীয়ার্সন যাঁহাদের বলিয়াছেন ‘বহিরার্য। এই অ্যালপীয় (বা অ্যালপো-দীনারায়) আর্যরা ছিলেন অবৈদিক এবং সেই- হেতু ‘আযজ্ঞা অর্থাৎ যজ্ঞধর্মবিরোধী। অর্থবাবেদের এবং পাণিনি-ব্যাকরণের সাক্ষ্য হইতে মনে হয়, প্রাচ্য-ভারতীয় ব্রাতাদের ভাষা আর্যপরিবারের হইলেও সে-ভাষা ঋগ্বেদীয় আর্যভাষা হইতে পৃথক এবং তাহার ‘প্রাকৃত’-লক্ষণ সুস্পষ্ট। এ-তথ্য লক্ষণীয় যে, রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী এবং অন্যান্য বীরগাথা যাঁহারা গাহিয়া বেড়াইতেন তাঁহাদের বলা হয় ‘সূত এবং ‘মাগধী এবং বাজসনেয়ী-সংহিতায় মগধের লোকদের বলা হইয়াছে ‘স্ট্রীষ্ম’ বা উচ্চস্বর বিশিষ্ট’ (অতিক্রুষ্টিায় মাগধম)। যাহাই হউক, এ-পর্যন্ত যে সাক্ষ্য প্রমাণ আমাদের গোচর তাহাতে অনুমান করা চলে, ভারতের পূর্বাঞ্চলের আর্যভাষা উত্তর-ভারতীয় আর্যভাষা হইতে ছিল পৃথক এবং তাহার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও কিছু কিছু ছিল। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসী পাণিনি সেই জন্যই তাহার ব্যাকরণে বিশেষভাবে প্রাচ্য ‘সংস্কৃত ভাষা ও বাকভঙ্গির বিশৈষ উল্লেখ ও আলোচনা করিয়াছেন, এবং প্রাচ্য বৈয়াকরণিকদের বিশিষ্ট মতামত উল্লেখ করিতেও ভুলেন। নাই! প্রসঙ্গত এ-কথা বলা উচিত, পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীতে গৌড় এবং গণপাঠে বঙ্গের উল্লেখ আছে। এ-তথ্য সুস্পষ্ট যে, পাণিনি উদীচ্য উত্তরাখণ্ডের ভাষাকেই আর্যভাষার মাপকাঠি বলিয়া মনে করিতেন এবং প্রাচ্য ভাষার বিচারও সেই ভাবেই করিয়াছেন। কৌষীতকি-ব্রাহ্মণেও সুস্পষ্ট বলা হইয়াছে, ‘’উদীচ্যখণ্ডের ভাষাই শুদ্ধ ও মার্জিতন্তর; লোকেরা সেইজনাই ভাষা শিখিবার জন্য উত্তরে গিয়া থাকে, এবং সেখান হইতে যিনি আসেন তাহার ভাষা শুনিতে ভালোবাসে ‘। উত্তর ও মধ্য-ভারতীয় আর্যভাষার সঙ্গে প্রাচ্য-ভারতের ভাষার পার্থক্য পতঞ্জলিরও দৃষ্টি এড়ায় নাই। তিনি স্পষ্টই বলিয়াছেন, পূর্বাঞ্চলের লোকেরা বিশেষ অর্থে কতকগুলি অদ্ভুত ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে, এবং ‘র’ স্থানে ‘’ল” ব্যবহার করা তাহদের ভাষার একটি প্রধান বৈশিষ্টা; সঙ্গে সঙ্গে তিনি এ-কথাও বলিয়াছেন যে, এই উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য ‘আসুর বা অসুর নরগোষ্ঠীর; আমরা জানি, ‘র’ স্থানে ‘ল ব্যবহার পরবর্তী মাগধী প্রাকৃতের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য; এবং আচার্য লেভি প্রমাণ করিয়াছেন, এই বৈশিষ্ট্য মুণ্ডা-মনুখমের ভাষা-পরিবারের। আর্যমঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প-গ্রন্থে স্পষ্টতই বলা হইয়াছে (আৰ্যদের দৃষ্টিভঙ্গি হইতে), অসুরদের ভাষা ছিল ‘র’ ও ‘ল’-কার বহুল, অব্যক্ত, অস্পষ্ট, নিষ্ঠুর (রূঢ়) ইত্যাদি। আগেই দেখিয়াছি। শতপথ ব্রাহ্মণে প্রাচ্য-ভারতের লোকদের বলা হইয়াছে ‘আসূর্য এবং পতঞ্জলি যখন ‘র’ স্থানে “লা-বৈশিষ্ট্য বলিতেছেন ‘আসুর’ তখন বুঝিতে দেরি হয় না যে, বাঙলা ও প্রাচ্যখণ্ডের প্রাক-আর্য আদিভাষা ছিল মুণ্ডা-মনখমের পরিবারের ভাষা এবং তাঁহারই প্রভাব পড়িয়া অবৈদিক আর্যভাষার যে-সব বিশিষ্ট লক্ষণ গড়িয়া উঠিয়াছিল তন্মধ্যে ‘র’–“ল রূপান্তর একটি। হয়তো আরও ছিল, কিন্তু পতঞ্জলি তাহাদের উল্লেখ করেন নাই। তিনি যে বিশেষ বিশেষ অর্থে কতকগুলি অদ্ভুত ক্রিয়াপদের ব্যবহারের কথা বলিয়াছিলেন, তাহাও যে “অসুর ভাষার প্রভাবে নয়, তাহাও জোর করিয়া বলা যায় না।
