উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসহি সবরী বালী।
মোরঙ্গী পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরী মালী।৷
উমত সবারো পাগল সবরো মা কর গুলী গুহাড়া তোহোরি
নিত্য ঘরিণী নামে সহজ সুন্দরী।।
নানা তরুবর মৌউলিল রে গঅণত লাগেলী ডালী।
একেলী সবরী এ বণ হিণ্ডই কর্ণকুণ্ডলবজ্রধারী৷
তিঅধাউ খাট পাড়িলা সবরো মহাসুখে সেজি ছাইলী।
সবারো ভূজঙ্গ নৈরামণি দারী পেহ্মরাতি পোহাইলী৷।
হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই।
সুন নৈরামণি কণ্ঠে লইয়া মহাসুহে রাতি পোহাই॥
গুরুবাক্ পুচ্ছিআ বিন্ধ নিঅমণ বাণে।
একে শর সন্ধানে বিন্ধহ বিন্ধহ পরমাণ বাণে৷।
উমত সবরো গরুআ রোষে।
উমত-সিহর সন্ধি পাইসন্তে সবারো লোভিরা কই সে৷
০২.১৩ শবরোৎসব
পূর্ব-ভারতে শবরদেব এক সুপ্রাচীন ও সুবিস্তৃত সংস্কৃতির অবশেষ আমাদের জীবনযাত্রার নানাক্ষেত্রে সুপরিস্ফুট। পাহাড়পুর মন্দিরের অসংখ্য মাটির ফলকে শবর নরনারীদের দৈনন্দিন জীবনের নানা ছবি যে-ভাবে উৎকীর্ণ আছে, মনে হয়, জনসাধারণের জীবনের সঙ্গে তাহাদের যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠ। বাঙলার নানা স্থানে, যেমন উত্তরবঙ্গে ও পশ্চিম-দক্ষিণ বঙ্গে, এই শবরীরা কালক্রমে আমাদের হিন্দু সমাজের নিম্নতম স্তরে স্বাঙ্গীকৃত হইয়া গিয়াছে। নীলাচলক্ষেত্র পুরীর সুপ্রসিদ্ধ জগন্নাথদেবের মন্দির ও তাঁহার পূজার সঙ্গে শবরদের ধর্ম ও পূজানুষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের কথা আজ আর অবিদিত নাই। বাঙলাদেশেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই ঘনিষ্ঠতা ধরা পড়িবে, বিচিত্র কী? কালবিবেক-গ্ৰন্থ ও পরবর্তী কালিকাপুরাণে শারদীয়া দুৰ্গাপূজার দশমী তিথিতে শাবরোৎসব নামে এক উৎসবের বিস্তৃত বিবরণ জানা যায়। এই উৎসবে লোকেরা শবরদের মতো নগ্ন অঙ্গে গাছের পাতা জড়াইয়া, সর্বাঙ্গে কাদা মাখিয়া তালে-বোতালে পূর্ণ উদ্যমে গান গাহিত, নাচিত এবং ঢাক বাজাইত। যৌনলীলার নানা গান গাওয়া, কাহিনী বলা এবং তদনুরূপ অঙ্গভঙ্গি করাও এই উৎসবের অঙ্গ ছিল। এ-সব না করিলে নাকি দেবী ভগবতী ক্রুদ্ধ হইতেন! বৃহদ্ধর্ম-পুরাণে এ সম্বন্ধে একটু বিধিনিষেধ আছে; এই সব অনুষ্ঠানে বিশেষ আপত্তি করা হয় নাই, তবে মা বোনদের সম্মুখে এবং শক্তিধর্মে অদীক্ষিত মেয়েদের সম্মুখে পূর্বোেক্তরূপে আচরণ করিতে নিষেধ করা হইয়াছে।
০২.১৪ ঘটলক্ষ্মীর পূজা
মনসাদেবীর ক্ষেত্রে যেমন দুই রকমের পূজা (এক, মনসার মূর্তিপূজা এবং আর এক, তাঁহারই চিত্রাঙ্কিত ঘটের পূজা) বাঙলার অন্যান্য দুই একটি দেবীমূর্তির ক্ষেত্রেও তাহাই। আমাদের দেশে লক্ষ্মীর পৃথক মূর্তিপূজা খুব সুপ্রচলিত নয়। বিষ্ণু-নারায়ণের শক্তি হিসাবেই তাঁহার যাহা কিছুই প্রতিপত্তি; অন্তত প্রাচীন বাঙলায় তাহাই ছিল। সাহিত্যে ও শিল্পে নারায়ণের শক্তিরূপিণী এই পৌরাণিক লক্ষ্মীই বন্দিত হইয়াছেন। কিন্তু আমাদের লোকধর্মে লক্ষ্মীর আর একটি পরিচয় আমরা জানি এবং তাঁহার পূজা বাঙালী সমাজে নারীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। এই লক্ষ্মী কৃষিসমাজের মানস-কল্পনার সৃষ্টি; শস্য-প্রাচুয্যের এবং সমৃদ্ধির তিনি দেবী। এই লক্ষ্মীর পূজা ঘটলক্ষ্মী বা ধান্যশীর্ষপূর্ণ চিত্রাঙ্কিত ঘটের পূজা এবং এই পূজারতের সে-সব ব্ৰতকথা এবং যে-সব পৌরাণিক কাহিনী জড়িত তাহা একত্র বিশ্লেষণ করিলে বুঝিতে দেরী হয় না যে, লক্ষ্মীর এই লৌকিক মানস-কল্পনাই ক্রমশ পৌরাণিক লক্ষ্মীতে রূপান্তরিত হইয়াছে, স্তরে স্তরে নানা স্ববিরোধী ধান ও অনুষ্ঠানের ভিতর দিয়া। কিন্তু তৎসত্ত্বেও কৌম সমাজের ঘটলক্ষ্মীর বা শস্যলক্ষ্মীর বা আদিমতম পূজা বা কল্পনা তাহা বিলুপ্ত হয় নাই। বাঙালী হিন্দুর ঘরে ঘরে নারীসমাজে সে পূজা আজও অব্যাহত। আর শারদীয়া পূর্ণিমাতে কোজাগর-লক্ষ্মীর যে পূজা অনুষ্ঠিত হয় তাহা আদিতে এই কৌম সমাজের পূজা বলিলে অন্যায় হয় না। বস্তুত, দ্বাদশ শতক পর্যন্ত শারদীয়া কোজাগর উৎসবের সঙ্গে লক্ষ্মীদেবীর পূজার কোনও সম্পর্কই ছিল না।
০২.১৫. ষষ্ঠীপূজা
ষষ্ঠীপূজা সম্বন্ধেও প্রায় একই কথা বলা চলে। ষষ্ঠীদেবীর কোনও প্রতিমা পূজার প্রচলন ব্রাহ্মণ্য ধর্মে নাই; বৌদ্ধ প্রতিমা-শাস্ত্রে এবং ধর্মানুষ্ঠানে ষষ্ঠীদেবীর মানস-কল্পনাই বোধ হয়। হারীতীদেবীর রূপ-কল্পনায় বিবর্তিত হইয়াছে। ষষ্ঠীপূজার ব্ৰতকথা, মহাবস্তু, সর্বাস্তিবাদী বিনয়পিটক, চীনা-সূত্রপিটকগ্রন্থের সংযুক্তরত্নসূত্র ও ক্ষেমেন্দ্রের বোধিসত্ত্বাবধান কল্পলতা-গ্রন্থে হারীতীর জন্মকাহিনী অনুসরণ করিলে স্পষ্টতই বুঝা যায়, ষষ্ঠী এবং হরীতীর জন্ম একই মানস-কল্পনায় এবং দুয়েরই মূলে প্রজনন শক্তিতে এবং মারীনিবারক যাদু-শক্তিতে বিশ্বাস প্রচ্ছন্ন। বৌদ্ধ ধর্মাচারে হারাতী দেবীর মূর্তিপূজা সুপ্ৰচিলত ছিল, কিন্তু ষষ্ঠীপূজায় আজও কোনও মূর্তিপূজা নাই এবং শেষোক্ত পূজা এখনও নারী-সমাজেই সীমাবদ্ধ; সন্তান-কামনায় ও সন্তানের মঙ্গল কামনায় আজ এই পূজা বিবর্তিত। যষ্ঠ-হারীতীর মারীনিবারক যাদুশক্তির পূজা এখন আশ্রয় করিয়াছে গর্দভবাহিনী শীতলা দেবীকে।
০২.১৬ প্রাক-আর্য ধ্যান-ধারণা
এখানেই যে প্রাক-আর্য বাঙালী সমাজের ধর্মকর্মানুষ্ঠানের বিবরণ শেষ হইল তাহা বলা চলে না। বরং বলা উচিত, ইহা সূচনা মাত্র। বস্তুত, এ-সম্বন্ধে আলোচনা-গবেষণা এত কম হইয়াছে যে, রেখা রচনা ছাড়া, কিছুটা ইঙ্গিত দেওয়া ছাড়া বিস্তৃত কিছু বলিবার উপায় নাই। তবু, যেটুকু আমরা জানি, এ-কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় যে, বাঙালী সমাজে নারীদের মধ্যে এবং সাধারণ আর্য ব্রাহ্মণ্য পূজাচারের মধ্যে যে সব লৌকিক স্থানীয় অনুষ্ঠানাদি প্রচলিত তাহা প্রায় সমস্তই প্রাক-আর্য কোম-সমাজের দান।
