এ-তথ্য এখন অনেকটা পরিষ্কার যে, আদিতে হোলী ছিল কৃষিসমাজের পূজা; সুশস্য উৎপাদন-কামনায় নরবলি ও যৌনলীলাময় নৃত্যগীত উৎসব ছিল তাহার প্রধান অঙ্গ। তারপরের স্তরে কোনও সময় নরবলির স্থান হইল পশুবলি এবং হোমযজ্ঞ ইহার অঙ্গীভূত হইল। কিন্তু হোলীর সঙ্গে প্রধানত যে উৎসববানুষ্ঠনের যোগ তাহা বসন্ত বা মদন বা কামোৎসবের, রাধাকৃষ্ণ-ঝুলনের এবং কোথাও কোথাও মূর্খতম এক রাজাকে লইয়া নানাপ্রকারের ছল-চাতুরী ও তামাসার।
তৃতীয়-চতুর্থ শতক হইতে আরম্ভ করিয়া ষোড়শ শতক পর্যন্ত উত্তর-ভারতের সর্বত্রই বসন্ত বা মদন বা কামোৎসব নামে একটি উৎসবের প্রচলন দেখা যায়। বাৎস্যায়নের কামসূত্র (তৃতীয়-চতুর্থ শতক), শ্রীকৃষ্ণের রত্নাবলী (সপ্তম শতক), মানতীমাধব নাটক (অষ্টম শতক), অল্-বেরুণী (একাদশ শতক), জীমূতবাহনের কালবিবেক (দ্বাদশ শতক) এবং রঘুনন্দন (ষোড়শ শতক) সকলেই এই উৎসবের কথা বলিয়াছেন অল্পবিস্তর বর্ণনায়। প্রচুর নৃত্যগীতবাদ্য, জুগুপ্সিত উক্তি, যৌন অঙ্গভঙ্গি এবং ব্যঞ্জনা প্রভৃতি ছিল এই উৎসবের অঙ্গ এবং পূজাটি হইত মদন ও রতির, চৈত্র মাসে অশোক ফুলের সুপ্রচুর বর্ষণের নীচে।
প্রাচীন বাংলাদেশে এই উৎসবের কথা জীমূতবাহনই বলিয়া গিয়াছেন। পরবর্তী সাক্ষ্য দিতেছেন রঘুনন্দন। মনে হয়, ষোড়শ শতকের পর কোনও সময়ে চৈত্রীয় বসন্ত বা মদন বা কামোৎসব ফাল্গুনী হোলী বা হোলক উৎসবের সঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া এক হইয়া যায় এবং কামমহোৎসব অপ্রচলিত হইয়া পড়ে। বস্তুত, ষোড়শ শতকের পর কামমহোৎসবের কোনও উল্লেখ বা প্রচলন কোথাও আর দেখা যায় না।
মুসলমান রাজা-ওমরাহ্রা এবং হারামের মহিলারা হোলী উৎসবের খুব বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং বোধ হয় তাঁহাদের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে হোলী ক্রমশ মদনোৎসবকে গ্রাস করিয়া ফেলে। কিন্তু হোলীর সঙ্গে রাধাকৃষ্ণের ঝুলন এবং আবীর-কুমকুম খেলার ইতিহাসের যোগ হয় আবার অন্য পথে। রামগড় গুহার এক লিপিতে (খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয়-তৃতীয় শতক) এক ঝুলন উৎসবের কথাই আমরা প্রথম শুনি। কিন্তু সে-ঝুলন কোনও দেবদেবীর নয়, বোধ হয় নেহাৎই মানুষের ঝুলন। ঝুলনায় মানুষেরা, নরনারী উভয়েই দোলা খাইত, বেশি করিয়া দোলা দিত মানবশিশুকে, তাহাকে আনন্দ দিবে জন্য। হয়তো তাহারই প্রকাশ পরবর্তী সাহিত্যে। বালকৃষ্ণ বা বালগোপালকে দোলাইতেন মাতা যশোদা। তারপরের পর্বে আর শুধু বালগোপাল নহেন, ভগবান শ্রীকৃষনের যৌবনলীলার সহচরী রাধারো আসিয়া উঠিলেন সেই ঝুলনায় এবং একাদশ শতকের আগেই কৃষ্ণরাধার ঝুলনলীলা ভারতবর্ষের অন্যতম ধর্মোৎসবে পরিগণিত হইয়া গেল।
অল্-বেরুণীর সাক্ষ্যে মনে হয়, এই উৎসব অনুষ্ঠিত হইত চৈত্রমাসে; গরুড়-পুরাণ এবং পদ্ম-পুরাণের সাক্ষ্যও তাহাই। পরবর্তী কোনও সময়ে এই উৎসব ফাল্গুনী পূর্ণিমাতে আগাইয়া আসে (পদ্ম-পুরাণ, পাতালখণ্ড এবং স্কন্দপুরাণ, উৎকলখণ্ড দ্রষ্টব্য) এবং হোলীর সঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া এক হইয়া যায়। ঝুলনায় রাধাকৃষ্ণকে দোলাইয়া তাঁহাদের উপর ফুল, কুমকুম এবং আবীরগোলা জল ছড়ানো হইত এবং তাঁহারাও সহচরীদের উপর ফুল, কুমকুম ইত্যাদি ছুঁড়িয়া মারিতেন। হোলীর সঙ্গে পিচ্কারী খেলার যোগাযোগ এইভাবেই। প্রাক্-বৈদিক আদিম কৃষিসমাজের বলি ও নৃত্যগীতোৎসব এই ভাবেই বর্তমান হোলীতে রূপান্তরিত হইয়াছে। ভারতের নানা জায়গায় এখনও হোলী বা হোলক উৎসবকে বলা হয় শূদ্রোৎসব।; হোলীর আগুন এখনও ভারতের অনেক স্থানে অস্পৃশ্যদের ঘর হইতেই আনিতে হয়।
০২.০৯ অম্বুবাচীর পারণ
ভারতবর্ষের সর্বত্রই বৰ্ষাঋতুতে নারীদের মধ্যে বিশেষভাবে বিধবা নারীদের ভিতর অম্বুবাচী নামে এক পারণ পালনের রীতি প্রচলিত। এই পারণের তিন দিন বা সাত দিন তাহারা কোনও অগ্নিপক্ক খাদ্য গ্রহণ করেন না, মাটি খুঁড়েন না, আগুন জ্বলেন না, রন্ধনাদি করেন না, এমন কিছু করেন না। যাহাতে পৃথিবীর, মাতা বসুধার অঙ্গে কোনও আঘাত লাগে। কারণ প্রচলিত বিশ্বাস এই যে এই ক’দিন মাতা বসুধার ঋতুপর্ব এবং যতদিন তিনি ঋতুমতী থাকেন। ততদিন তাহার অঙ্গে কোনও আঘাত লাগে, এমন কিছু করিতে নাই। এই বিশ্বাস এবং অম্বুবাচীর পারণ, আদিম কীেম সমাজের প্রজননশক্তির পূজা এবং তৎসম্পূক্ত ধ্যান-ধারণার সঙ্গে জড়িত।
বাঙালী হিন্দুর ধর্মকর্মানুষ্ঠানের যে-সব স্তরে ও অংশে আদিবাসী কৌম সমাজের অনার্য অব্রাহ্মণ। ধ্যান-ধারণা ও উৎসবানুষ্ঠান এখনও সক্রিয় তাহার মাত্র কয়েকটি ইঙ্গিত এ পর্যন্ত ধরিতে চেষ্টা করিলাম। আর বেশি বলিবার উপায়ও নাই, বর্তমান প্রসঙ্গে প্রয়ােজনও নাই। তবে, এই প্রসঙ্গ শেষ করিবার আগে এমন দুই চারিটি বৌদ্ধ এবং ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর কথা বলিতেই হয় যাহাদের জন্মই হইতেছে এই আদিবাসী কীেম সমাজের ধান, ধারণা এবং অভ্যাস হইতে। এ-প্রসঙ্গে ব্ৰাহ্মণ্য শিব ও শিবলিঙ্গ, দুর্গা, কালী বা করালী, অর্থাৎ মাতৃকাতন্ত্রের দেবী, নারায়ণ-শিলা, গণেশ, ভৈরব, বৌদ্ধ জম্ভিল,হারীতী, একজটা, নৈরাত্মা, ভ্রূকুটি প্রভৃতি দেবদেবীর কথা উল্লেখ করিতেছি না; কারণ, ভারতীয় মূর্তিতত্ত্বের ইতিহাসের সঙ্গে যাহারা পরিচিত তাহারাই জানেন, এই সব এবং আরও অনেক দেবদেবীর ইতিহাস অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে আদিবাসী কৌম-সমাজের বিশ্বাস ও অভ্যাসের সঙ্গে জড়িত। আমি শুধু এমন দুই চারিটি বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর কথাই এখানে উল্লেখ করিতেছি। যাহাদের পূজা বিশেষ ভাবে পূর্ব-ভারতেই প্রচলিত এবং যাঁহাদের জন্মেতিহাস সুস্পষ্ট ভাবেই এই কীেম সমাজের ধ্যান, ধারণা ও অভ্যাসগত, অথচ সে-তথ্য সুস্পষ্ট জ্ঞাত ও স্বীকৃত নয়।
০২.১০ মনসা পূজা
বাঙলা, আসাম ওড়িষ্যায় মনসাদেবীর পূজা সুপ্রচলিত। এই পূজা এখন যে-ভাবে সাধারণত অনুষ্ঠিত হয় তাহা ঠিক প্রতিমাপূজা নয়, ঘাট-মনসা বা পাট-মনসার পূজা এবং মধ্যযুগীয় বাঙলার মনসামঙ্গলের সঙ্গে এই ঘাট-মনসা ও পাট-মনসার সম্বন্ধই ঘনিষ্ঠ। ধান্যপূর্ণ মাটির ঘটের উপর সর্পধারিণী বা সর্পােলংকারা মনসার ছবি আঁকিয়া তাঁহার পূজা অথবা শোলা বা কাপড়ের পটের উপর সর্পময়ী বা সর্পধারিণী বা সর্পালংকারা মনসার কাহিনী আঁকিয়া টাঙানো পটের সম্মুখে পূজাই সাধারণ রীতি। কিন্তু একাদশ-দ্বাদশ-ত্ৰয়োদশ শতক-পূর্বে বাঙলাদেশে মনসার প্রতিমাপূজা হইত; তাহার কয়েকটি মূর্তি-প্রমাণও বিদ্যমান। মনসাদেবী যে কি করিয়া উচ্চতর সামাজিক স্তরে উন্নীত হইলেন তাহার বিস্তৃত পুরাণ-কাহিনী বাঙলাদেশে সুবিদিত। সাপ প্রজনন শক্তির প্রতীক এবং মূলত কৌম সমাজের প্রজনন শক্তির পূজা হইতেই মনসা-পূজার উদ্ভব, এ-তথ্য নিঃসন্দেহ। পৃথিবী জুড়িয়া আদিবাসী সমাজে কোনও না কোনও রূপে সর্পপূজার প্রচলন ছিলই। বাঙলাদেশে যে-সব মনসাদেবীর প্রতিমা পাওয়া গিয়াছে তাহার প্রায় প্রত্যেকটিতেই মনসাদেবীর সঙ্গে একাধিক সর্পের, ক্রোড়াসীন একটি মানবশিশুর, একটি ফলের এবং কোথাও কোথাও একটি পূর্ণঘাটের প্রতিকৃতি বিদ্যমান। ইহাদের প্রত্যেকটিই প্ৰজনন শক্তির প্রতীক। একটি মূর্তির পাদপীঠে “ভট্টিনী মট্টুবা” লিপি উৎকীর্ণ। এই লিপির অর্থ কি রাজমহিষী মট্টুবা না আর কিছু বলা কঠিন। মট্টুবা কি তদ্ভব, না দেশজ অস্ট্রিক বা দ্রাবিড় ভাষার শব্দ, তাহাও নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। তবে, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে এ-তথ্য নিঃসংশয় যে, পাল-আমলের প্রথম পর্বেই মনসাদেবী ব্ৰাহ্মণ্যধর্মে পূজিতা ও স্বীকৃত হইতে আরম্ভ করিয়াছেন। মহাভারত ও ব্রহ্মবৈবর্ত-পুরাণের কাহিনী হইতেই প্রমাণ হয়, মনসাদেবীর প্রাচীন বৈদিক বা পৌরাণিক কোনও ঐতিহাই ছিল না; ব্রাহ্মণ্য ধর্মে স্বীকৃত হওয়ার পরও বহুদিন পর্যন্ত তাঁহার রূপ সুনির্দিষ্ট হয় নাই। কোনও কোনও ধ্যানে তাঁহার বাহন হইতেছেন হংস এবং তিনি পুস্তক ও অমৃতকুম্ভধারিণী। বলা বাহুল্য, এই সব উপকরণ সরস্বতীর এবং আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ব্ৰহ্মবৈবর্ত-পুরাণের একটি ধ্যানে মনসাকে সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্ন বলিয়া কল্পনা করা হইয়াছে। তেলেগু ও কানাড়ী-ভাষাভাষী লোকদের মধ্যে “মঞ্চাম্মা’ নামে এক সর্পদেবীর পূজা আজও প্রচলিত এবং আমাদের দেশে মধ্যযুগে মনসাদেবীর যে ধরনের কাহিনী প্রচারিত হইয়াছে, সেখানেও অম্বাবরু নামীয় এক সর্পদেবী সম্বন্ধে অনুরূপ কাহিনী সুপ্রচলিত। অসম্ভব নয় যে, দক্ষিণী মঞ্চাম্মাই আমাদের মনসা এবং অম্বাবারুর কাহিনীই আমাদের মনসাকে আশ্রয় করিয়াছে। ঐতিহাসিক প্রমাণের উপর নির্ভর করিলে বলিতে হয়, বাঙলাদেশে মনসা-পূজার বহুল প্রচলন হয়। দক্ষিণী সেনা-বর্মণ রাজাদের আমলেই।
০২.১১ জাঙ্গুলী
মনসার সঙ্গেই নাম করিতে হয় জঙ্গলবাসী, শবরকুমারীরূপিণী বৌদ্ধ জাঙ্গুলীদেবীর। এই দেবী বীণাবাদয়িত্রী এবং মনসার মতো তিনিও সর্ববিষমোচয়িত্রী। স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, সরস্বতীও অন্যতম রূপে সৰ্ববিষমােচয়িত্রী এবং সেক্ষেত্রে তিনি শবর-কন্যা। এই গুণসাম্যের উপর নির্ভর করিয়াই পরবর্তীকালে, মনসাকে যেমন তেমনই, জাঙ্গুলীকেও কোথাও কোথাও বৈদিক সরস্বতীর সঙ্গে অভিন্ন বলিয়া কল্পনা করা হইয়াছে এবং ব্রাহ্মণ্য মনসা এবং বৌদ্ধ জাঙ্গুলী যে একই দেবী তাহাও বলা হইয়াছে। মনসাদেবীর প্রসারের প্রমাণ কালবিবেক গ্রন্থে সুস্পষ্ট।
০২.১২. পর্ণশবরী
প্রাক্-আর্যব্রাহ্মণ্য শবরদের সঙ্গে আর একটি বজ্রযানী বৌদ্ধ দেবীর সম্বন্ধ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ; ইঁহার নাম পৰ্ণশবরী। ইনি ব্যাঘ্রচর্ম ও বৃক্ষপত্র পরিহিতা, যৌবনরূপিণী, বজ্রকুণ্ডলধারিণী এবং পদতলে তিনি অগণিত রোগ ও মারী মাড়াইয়া চলেন। ধ্যানেই বর্ণনা করা হইয়াছে যে, তিনি ডাকিনী, পিশাচী এবং মারীসংহারিকা। সন্দেহ নাই যে, আদিতে তিনি শবরদেরই আরাধ্যা দেবী ছিলেন; পরে কালক্রমে যখন আর্যধর্মে স্বীকৃতি লাভ করেন তখন তাহার পরিচয় হইল “সৰ্ব্বশবরনাম ভগবতী”, সকল শবরের ভগবতী বা দূৰ্গা। বজ্রযানী বৌদ্ধসাধনায় শবরদের যে একটা বিশেষ স্থান ছিল চর্যাগীতির একাধিক গানই তাহার প্রমাণ। একটি মাত্র গান উদ্ধার করিতেছি; পর্ণশবরীর ধ্যান এবং এই গানটির রূপ-কল্পনার মধ্যে পার্থক্য বিশেষ কিছু নাই।
