বাঙলার পাল ও সেন আমলের লিপিগুলি পড়িলে মনে হয় লক্ষ্মীর মতো কল্যাণী, বসুধার মতো সৰ্বংসহা, স্বামীব্রতনিরতা নারীত্বই ছিল প্রাচীন বাঙালী নারীর চিত্তাদর্শ, বিশ্বস্তা, সহৃদয়া, বন্ধুসমা এবং স্থৈৰ্য, শান্তি ও আনন্দের উৎসস্বরূপ স্ত্রী হওয়াই ছিল তাহদের একান্ত কামনা। স্বামীর ইচ্ছাস্বরূপিনী হওয়াই তাহদের বাসনা; এবং শামুক যেমন প্রসব করে মুক্তা তেমনই মুক্তাস্বরূপ বীর ও গুণী পুত্রের প্রসবিনী হওয়াই সকল বাসনার চরম বাসনা। বন্ধ্যা নারীর জীবন কেহই কামনা করিতেন না। লিপির পর লিপিতে এই সব কামনা, বাসনা ও আদর্শ নানা প্রসঙ্গে বারবার ব্যক্ত হইয়াছে। উচ্চকোটি শিক্ষিত সমাজে মাতা ও পত্নীর সন্মান ও মর্যাদা এই জন্যই বেশ উচ্চই ছিল, সন্দেহ নাই। লিপিগুলিতে উভয়েরই সম্বন্ধ ও সসম্মান উল্লেখ তাহার সাক্ষ্য; কোনো কোনো রাজকার্যে রাজ্ঞীর অনুমোদন গ্রহণও তাহার অন্যতম সাক্ষ্য।
সমসাময়িক নারীজীবনের আদর্শ ও কামনা লিপিমালায় আরও সুস্পষ্ট ব্যক্ত হইয়াছে, রামায়ণ, মহাভারত ও পৌরাণিক বিচিত্র নারীচরিত্রের সঙ্গে সমসাময়িক নারীদের তুলনায় এবং প্রাসঙ্গিক উল্লেখের ভিতর দিয়া। ধর্মপালের মাতা দদাদেবীর তুলনা করা হইয়াছে চন্দ্রদেবতার পত্নী রোহিণী, অগ্নিপত্নী স্বাহা, শিবপত্নী সর্বাণী, কুবেরপত্নী ভদ্রা, ইন্দ্ৰপত্নী পেলোমী এবং বিষ্ণুপত্নী লক্ষ্মীর সঙ্গে। শ্রীচন্দ্রের পত্নী শ্রীকাঞ্চনার তুলনা করা হইয়াছে শচী, গৌরী এবং শ্রীর সঙ্গে। ধবলঘোষের পত্নী সদ্ভাব্য তুলিত হইয়াছেন ভবানী, সীতা এবং বিষ্ণুজায়া পদ্মা, এবং বিজয়সেন মহিষী বিলাসদেবী লক্ষ্মী এবং গৌরীর সঙ্গে। সমসাময়িক কামরূপ শাসনাবলীতেও এই ধরনের তুলনাগত উল্লেখ সুপ্রচুর।
মাতার কামনা ছিল শুভ্র নিষ্কলঙ্ক সুদর্শন সস্তানের জননী হওয়া; প্রসবাবস্থায় কামনানুরূপ সন্তান জন্মলাভ করে, এই বিশ্বাসও জননীর মধ্যে সক্রিয় ছিল। শ্রীচন্দ্রের রামপাল লিপিতে সুবর্ণচন্দ্রের নামকরণ সম্বন্ধে একটি সুন্দর ইঙ্গিত আছে। প্রসূতির স্বাভাবিক প্রবণতানুযায়ী সুবর্ণচন্দ্রের মাতার ইচ্ছা হইয়াছিল শুক্লপক্ষে নবেদিত চন্দ্রের পূর্ণ ব্যাসরেখা দেখিবার, তাহার সে ইচ্ছা পূরণ হওয়ায় তিনি সোনার মতো উজ্জ্বল অর্থাৎ সুবর্ণময় একটি চন্দ্র (অর্থাৎ সুবর্ণচন্দ্ররূপ পুত্র) দ্বারা পুরস্কৃত হইয়াছিলেন। বাঙলাদেশে সাধারণ লোকদের মধ্যে এ বিশ্বাস আজও সক্রিয় যে শুক্লপক্ষের গোড়ার দিকে নবোদিত চন্দ্রের পূর্ণ গোলকরেখা প্রত্যক্ষ করিলে প্রসূতি চন্দ্রের মতো স্নিগ্ধ সুন্দর সন্তান প্রসব করেন।
সংক্রান্তি ও একাদশী তিথিতে এবং সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণে তীর্থস্নান, উপবাস এবং দানে অনেক নারীই অভ্যস্ত ছিলেন; রাজাস্তঃপুরিকারাও ছিলেন। স্বামী ও স্ত্রী একই সঙ্গে দান-ধ্যান করিতেন, এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়; স্ত্রী ও মাতারা একক অনেক মূর্তি ও মন্দির ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করিতেছেন, দান-ধ্যান করিতেছেন এ রকম সাক্ষ্যও সুপ্রচুর। রামায়ণ-মহাভারতের কথা প্রাচীন বাঙলায় সুপরিচিত ও সুপ্রচলিত ছিল,এমন কি নারীদের মধ্যেও। মদনপালের মহিষী চিত্রমতিকা দেবী বেদব্যাস-প্রোক্ত মহাভারত আনুপূর্বিক পাঠ ও ব্যাখ্যা করাইয়া শুনিয়াছিলেন, এবং নীতিপাঠক ব্রাহ্মণকে দক্ষিণস্বরূপ মদনপাল কিছু ভূমিদানও করিয়াছিলেন।
নারীরা বোধ হয় কখনও কখনও সম্পন্ন অভিজাত গৃহে শিশুধাত্রীর কাজও করিতেন ! তৃতীয় গোপালদেব শৈশবে ধাত্রীর ক্রোড়ে শুইয়া খেলিয়া মানুষ হইয়াছিলেন, মদনপালের মনহলি লিপিতে এই রকম একটু ইঙ্গিত আছে। জীমূতবাহনের দায়ভাগ গ্রন্থের সাক্ষ্য প্রামাণিক হইলে স্বীকার করিতে হয়, নারীরা প্রয়োজন হইলে সূতা কাটিয়া, তাত বুনিয়া অথবা অন্য কোনো শিল্পকর্ম করিয়া স্বামীদের উপাজনে সাহায্য করিতেন, কখনো কখনো অর্থলোভে প্ররোচিতা হইয়া স্ত্রীরা স্বামীদের শ্রমিকের কাজ করিতে পাঠাইতেন। এ ব্যাপারে স্ত্রী-রা নিয়োগকর্তাদের নিকট হইতে উৎকোচ গ্রহণে দ্বিপাবোধ করিতেন না!
একটি মাত্র স্ত্রী গ্রহণই ছিল সমাজের সাধারণ নিয়ম; সাধারণ লোকেরা তাহাই করিতেন। তবে, রাজরাজড়া, সামন্ত-মহাসামন্তদের মধ্যে, অভিজাত সমাজে, সম্পন্ন ব্রাহ্মণদের মধ্যে বহুবিবাহ একেবারে অপ্রচলিত ছিল না, এবং সপত্নী বিদ্বেষও অজ্ঞাত ছিল না। দেবপালের মুঙ্গের লিপিতে, মহীপালের বাণগড় লিপিতে সপত্নী বিদ্বেষের ইঙ্গিত আছে; আবার কোনো কোনো লিপিতে স্বামী সমভাবে সকল স্ত্রীকেই ভালবাসিতেছেন, সে-ইঙ্গিতও আছে (ঘোষরাবা লিপি)। প্রাচীন বাঙলার লিপিমালায় বহুবিহাএর দৃষ্টান্ত সুপ্রচুর; তবে একপত্মীত্মই যে সুখী পরিবারের আদর্শ তাহা স্পষ্টই স্বীকৃত হইয়াছে তৃতীয় বিগ্রহপালের আমগাছি লিপিতে।
প্রাচীন বাঙলায়ও বৈধব্যজীবন নারীজীবনের চরম অভিশাপ বলিয়া বিবেচিত হইত। প্রথমই ঘুচিয়া যাইত সীমস্তের সিঁদুর, এবং সঙ্গে সঙ্গে তাহার সমস্ত প্রসাধন-অলংকার সমস্ত সুখসম্ভোগ পড়িত খসিয়া। সাধারণভাবে প্রাচীন ভারতবর্ষের অন্যত্র যেমন, প্রাচীন বাঙলায়ও কন্যা বা স্ত্রী হিসাবে ছাড়া নারীদের ধনসম্পত্তিতে কোনো বিধি বিধানগত ব্যক্তিগত অধিকার বা সামাজিক অধিকার স্বীকৃত ছিল না। কিন্তু স্মৃতিকার জীমূতবাহন বিধান দিতেছেন, স্বামীর অবর্তমানে অপুত্ৰক বিধবা স্ত্রী স্বামীর সমস্ত সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকারের দাবি করিতে পারেন। এই প্রসঙ্গে জীমূতবাহন অন্যান্য স্মৃতিকারদের বিরুদ্ধ মতামত সব লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, এবং র্যাহারা বিধান দিতেছেন যে, বিধবা স্ত্রী শুধু খোরাকপোশাকের দাবি ছাড়া আর কিছু করিতে পারেন না, কিংবা মৃত স্বামীর ভ্রাতা এবং নিকট আত্মীয়বর্গের দাবি বিধবা-স্ত্রী-র দাবি অপেক্ষা অধিকতর বিধিসঙ্গত, তাহাদের বিধান সজোরে খণ্ডন করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি অবশ্য একথা বলিয়াছেন, সম্পত্তি বিক্রয়, বন্ধক বা দানে বিধবার কোনো অধিকার নাই, এবং তিনি যদি যথার্থ বৈধব্য জীবন যাপন করেন তবেই স্বামীর সম্পত্তিতে তাহার অধিকার প্রতিষ্ঠিত থাকিবে। বিধবাকে মৃত্যু পর্যন্ত স্বামীগৃহে স্বামীর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বাস করিতে হইবে, প্রসাধন-অলংকার-বিলাসবিহীন সংযত জীবন যাপন করিতে হইবে, এবং স্বামীর পঞ্জলোকগত আত্মার কল্যাণার্থে যে সব ক্রিয়াকর্মানুষ্ঠানের বিধান আছে তাহা পালন করিতে হইবে। স্বামীগৃহে যদি কোনো পুরুষ আত্মীয় না থাকেন তাহা হইলে মৃত্যু পর্যন্ত তাহাকে পিতৃগৃহে আসিয়া বাস করিতে হইবে। প্রায়শ্চিত্ত প্রকরণ গ্রন্থ মতে বিধবাদের মৎস্য, মাংস প্রভৃতি যে কোনো রূপ উত্তেজক পদার্থভক্ষণ নিষিদ্ধ ছিল; বৃহদ্ধর্মপুরাণের বিধানও তাহাই। বিবাহ প্রভৃতি অনুষ্ঠানে বিধবাদের উপস্থিতি অমঙ্গলসূচক বলিয়া তখনও পরিগণিত হইত, এবং তাহারা সাধারণত উৎসব ও অন্যান্য মঙ্গলানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করিতে পরিতেন না। স্বামীর চিতায় সহমরণে যাইরার জন্য তখনও ব্রাহ্মণ্যসমাজ বিধবাদের উৎসাহিত করিতেন। বৃহদ্ধর্মপুরাণে বলা হইয়াছে:
