যে স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যায় তিনি স্বামীর গুরু পাপ হইতে উদ্ধার করেন । নারীর পক্ষে ইহার চেয়ে সাহস ও বীরত্বের কাজ আর কিছু নাই ; এই সহমরণের ফলেই স্ত্রী স্বর্গে গিয়া পূর্ণ এক মন্বন্তর স্বামীর সঙ্গে সহবাস করিতে পারেন । স্বামীর মৃত্যুর বহু পরেও একান্ত স্বামীগতচিত্ত হইয়া স্বামীর কোনো প্রিয় বস্তুর সঙ্গে এক অগ্নিতে প্রবেশ করিয়া যে বিধবা আত্মাহুতি দিতে পারেন, তিনিও পূর্বোক্তফল প্রাপ্ত হন।
বৃহদ্ধর্মপুরাণের এই উক্তি হইতে স্পষ্টই বোঝা যায়, সতীদাহ ও সহমরণপ্রথা প্রাচীন বাঙলায়, অন্তত আদিপর্বের শেষ দিকে অজ্ঞাত ছিল না।
নারীদের যৌনশুচিতা ও সতীত্বের আদর্শ স্মৃতিকারের যথেষ্ট জোরের সঙ্গেই প্রচার করিয়াছেন, সন্দেহ নাই; সমাজের মোটামুটি আদর্শও তাহাই ছিল, এ বিষয়েও সন্দেহের অবকাশ কম। তৎসত্ত্বেও স্বীকার করিতেই হয়, বিত্তবান নাগর-সমাজে তাহার ব্যতিক্রমও কম ছিল না। আর, পল্লীসমাজের যে স্তরে ব্রাহ্মণ্য আদর্শ পুরাপুরি স্বীকৃত ছিল না, আদিম কৌমগত সামাজিক আদর্শ ছিল বলবত্তর, সে স্তরে যৌনজীবনের আদর্শই ছিল অন্য মাপের, রীতিনীতিও ছিল অন্যতর। হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য সমাজাদর্শদ্বারা তাহার বিচার চলিতে পারে না। হাড়ি, ডোম, নিষাদ, শবর, পুলিন্দ, চণ্ডাল, প্রভৃতিদের বিবাহ ও যৌনজীবনের রীতিনীতি ও আদর্শ কী ছিল, তাহ জানিতে হইলে তাহ আজিকার সাওতাল, কোল, হো, মুণ্ডা প্রভূতিদের ভিতর খুঁজিতে হইবে। ব্রাহ্মণ্য আদর্শ দ্বারা শাসিত সমাজেও অনিচ্ছায় বলপূর্বক ধর্ষিতা নারী তখনকার দিনেও সমাজে পতিত বা সমাজচ্যুত বলিয়া গণ্য হইতেন না; বিধিবদ্ধ প্রায়শ্চিত্ত অনুষ্ঠানেই তাহার শুদ্ধি হইয়া যাইত, এ সাক্ষ্য আমরা পাই ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে। হিন্দুসমাজের নিম্নতম স্তরে বিধবা-বিবাহও একেবারে অপ্রচলিত ছিল না বলিয়াই মনে হয়।
নাগর-সমাজের উচ্চকোটি স্তরের নারীরা লেখাপড়া শিখিতেন বলিয়া মনে হয় ; পবনদূত কবে নারীদের প্রেমপত্র রচনার ইঙ্গিত আছে । নানা কলাবিদায় নিপুণতাও তাহদের অর্জন করিতে হইত, বিশেষভাবে নৃত্যগীতে । নট গাঙ্গে বা গাঙ্গোকের পুত্রবধূ বিদ্যুৎপ্রভা সম্বন্ধে সেক শুভোদয়ায় যে সুন্দর গল্পটি আছে তাহাই এই উক্তির সাক্ষা। জয়দেব পত্নী পদ্মাবতীও নৃত্যগীতে সুদক্ষা ছিলেন।
বাৎস্যায়নের সাক্ষ্যে মনে হয়, প্রাচীন বাঙলার রাজান্তঃপুরের মেয়েরা স্বাধীনভাবে চলাফেরায় খুব অভ্যস্ত ছিলেন না; পর্দার আড়াল হইতে তাহারা অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কথাবার্তা বলিতেন। অন্তঃপুরে অবগুণ্ঠনময়ীর জীবনই সমাজের উচ্চকোটি স্তরে সাধারণ নিয়ম ছিল বলিয়া মনে করিবার হেতু বিদ্যমান। লক্ষ্মণসেনের মাধ্যইনগর লিপিতে রাজান্তঃপুরের সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। কেশবসেনের ইদিলপুর লিপিতে আছে, বল্লাল সেন তাহার বিজিত শত্রুর রাজলক্ষ্মীকে জয় করিয়া আনিয়াছিলেন পান্ধীতে বহন করিয়া। মনে হয়, সন্ত্রান্ত মহিলারা পথে ঘাটে যাতায়াতকালে পথযাত্রীদের দৃষ্টি হইতে নিজেদের আড়াল করিয়াই চলিতেন। কেশবসেন সুপুরুষ ছিলেন; তাহার ইদিলপুর লিপিতে দেখিতেছি, তিনি যখন রাজপথে বাহির হইতেন, পৌরসীমন্তিনীরা সৌধশিখরে উঠিয়া তাহার রূপ নিরীক্ষণ করিতেন। কিন্তু, পবনদূতে বিজয়পুরের মহিলাদের যে বর্ণনা পাইতেছি তাহাতে মনে হয়, তাহদের অবগুণ্ঠনের বালাই খুব বেশি ছিলনা। সন্ত্রান্ত স্তরে যাহাই হউক, সমাজের যে স্তরে নারীদের, হাঠে-মাঠে-ঘাটে খাটিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতে হইত, নানা কাজে কর্মে শারীরিক শ্রম করিতে হইত তাহদের মধ্যে অবগুষ্ঠিত জীবনযাপনের কোনও সুযোগই ছিলনা প্রয়োজনও ছিল না, সে আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাও ছিল না। মধ্যবিত্ত কুলমহিলারা অবগুণ্ঠন দিতেন; বস্তুত, অবগুণ্ঠন ছিল তাহদের কুলমর্যাদা জ্ঞাপনের অন্যতম অভিজ্ঞান। এই মধ্যবিত্ত কুলমহিলাদের জীবনচর্যার একটি সুন্দরছবি রাখিয়া গিয়াছেন কবি লক্ষ্মীধর।
শিরোযদবগুষ্ঠিতং সহজরূঢ়লজ্জানতং
গতং চ পরিমন্থরং চরণকোটিলগ্নে দৃশৌ৷
বচঃ পরিমিতং চ ষন্মধুরমন্দমন্দাক্ষরং
নিজং তদিয়মঙ্গনা বদতি নুনমুচ্চৈঃ কুলম্।।
অবগুষ্ঠিত শির স্বতই লজ্জানত, গমন মন্থর দৃষ্টি পায়ে নিবদ্ধ, বাক্য পরিমিত এবং মৃদুমধুর—এই সব দ্বারা এই মহিলা যেন উচ্চস্বরে নিজের কুলমর্যাদা প্রকাশ করিতেছেন।
বাঙলার কবি উমাপতিধর বাঙালী নারীর সুন্দর একটি প্রাকৃত অথচ অনন্যসাধারণ ছবি আকিয়া রাখিয়া গিয়াছেন, এবং সদুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে তাহ উদ্ধৃত হইয়াছে। এই ছবিটি উদ্ধার করিয়াই এই অধ্যায়ের আলোচনা শেষ করা যাইতে পারে। একবসন পল্লীবাসিনী বাঙালী নারী বনের মধ্যে ঢুকিয়াছেন ফুল আহরণের জন্য; একটু উচুতে নাগালের বাইরে গাছের ডালে ফুল ফুটিয়া আছে, পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়া দাঁড়াইয়া বাহু উপরের দিকে তুলিয়া সুন্দরী ফুল পাড়িতেছেন; নাভিন্ধদ বসনমুক্ত, একদিকের স্তন প্রকাশিত। সুন্দর অনবদ্য কাব্যময়তায় উমাপতিধর ছবি আঁকিয়াছেন:
দুরোদঞ্চিত বাহুমূলবিলসচ্চীন প্রকাশ স্তনা—
ভোগব্যয়ত মধ্যলম্বিবসনানির্মুক্ত নাভিহ্রদা।
আকৃষ্ট্রোজ্ঝিত-পুষ্প মঞ্জরিরজঃ পাতাবরুদ্ধেক্ষনা
চিন্বত্যাঃ কুসুমং ধিনোতি সুদৃশঃ পাদাগ্র-দুস্থা তনুঃ।।
