ডোম, নিষাদ প্রভৃতিরা গ্রামের বাহিরে উঁচু জায়গায় বাস করিতেন; ব্রাহ্মণ প্রভৃতি উচ্চবর্ণের লোকেরা ইঁহাদের ছুঁইতেন না। নৌকায় ছিল ইঁহাদের যাওয়া আসা; বাঁশের তাঁত, চাঙাড়ি ইত্যাদি তৈরি ও বিক্রয় ছিল ইঁহাদের বৃত্তি। নলের তৈরি পেটিক ছাড়িয়া লোকেরা বাঁশের এই সব জিনিস কিনিত। একাধিক চর্যাগীতে এই সব উক্তির সাক্ষ্য বিদ্যমান। বাঙলাদেশের নানা জায়গায় এই ধরনের নিম্নজাতীয় যাযাবর নরনারী আজও দেখা যায়; নৌকাই ইহাদের বাড়িঘর, এবং আজও বাঁশের নানা জিনিস তৈরি করিয়া গ্রামে গ্রামে বিক্রয় করা ইহাদের ব্যবসা। মৎস্যজীবী, তন্তুবায়, ধুনুরী, সূত্রধর প্রভৃতি বৃত্তির টুকরোটাকরা ছবিও দৃষ্টিগোচর হয়। অন্যত্র নানাপ্রসঙ্গে সে সব উল্লেখ করিয়াছি। একটি গীতে সূত্রধর বা ছুতোর সম্বন্ধে বলা হইয়াছে—“জো তরু ছেব ভেবউ ন জানই”, যে গাছ ছেদন ও ভেদনের কৌশল জানেনা। স্পষ্টতই বোঝা যাইতেছে, এই দুই কর্মেরই একটা বিশেষ কৌশল ছিল যাহা সকলের আয়ত্ত ছিল না।
অন্ত্যজ বর্ণের যাযাবর ডোম-শবর-পুলিন্দ-নিষাদ-বেদে প্রভৃতিদেরই অন্যতম বৃত্তি ছিল সাপ-খেলানো, যাদুবিদ্যার নানা খেলা দেখানো ইত্যাদি। সাপের উপদ্রব খুবই ছিল; মনসা-পূজাই তাহার অন্যতম সাক্ষ্য। রাজসভায় জাঙ্গলিক বা বিষবৈদ্য অন্যতম রাজপুরুষ ছিলেন; জাঙ্গুলি সাপেরই অন্য নাম। সাপের কামড়ে অনেককেই প্রাণ দিতে হইত; সেই জন্য ওবা বা বিষবৈদ্যদের সমাজে একটা স্থান ছিল; ইঁহারাই ছিলেন সাপুড়ে। উমাপতিধরের একটি শ্লোকে এই সাপ খেলানোর সুন্দর বর্ণনা আছে।
ক্ষুদ্রাস্তে ভূজগাঃ শিরাংসি নময়ত্যাদায় যেষামিদং
ভ্রাতর্জাঙ্গলিক ত্বদাননমিলন্মস্থানুবিন্ধং রজঃ।
জীর্ণস্তেষফণীন যস্য কিমপি ত্বাদৃগগুণীন্দ্ৰব্ৰজা-
কীর্ণক্ষ্মাতলধাবনাদপি ভজতানম্রভাবং শিরঃ।।
ভাই জাঙ্গলিক (সাপুড়ে), তোমার এই সাপগুলি ছোট ছোট; তোমার মুখের মন্ত্রপড়া ধূলি ইহাদের মাথা নমিত করিয়া দিতেছে। এই ফণাধারী সাপটি বোধ হয় জীর্ণ (অর্থাৎ প্রবীণ বা অভিজ্ঞ), কেননা তোমার মতো গুণী দ্বারা পূর্ণ মাটিতে ধাবন করিয়াও ইহার মাথা নম্রভাব হইতেছে না (অর্থাৎ নমিত হইতেছে না)।
গোবর্ধন আচার্যের একটি শ্লোকে আছে:
কিং পরজীবৈর্দীব্যসি বিস্ময়মধুরাক্ষি গচ্ছ সখি দূরম্।
অহিমধিচত্বরগগ্রাহী খেলয়তু নির্বিঘ্ন।।
হে সখি, সাপ খেলা দেখিতে দেখিতে তোমার চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হইয়া মধুরতর দেখাইতেছে। অতএব, কেন তুমি পরের জীবনকে বিপদাপন্ন করিতেছ? তুমি দূরে সরিয়া যাও, সাপুড়ে প্রাঙ্গণে নির্বিঘ্নে সাপ খেলা দেখাক।
সর্বানন্দ বলিতেছেন, বেদিয়ারা সাপখেলা দেখাইয়া ভিক্ষা করিয়া বেড়াইত।
০৫. নারী সমাজ
একাদশ অধ্যায় । দৈনন্দিন জীবন
পঞ্চম পরিচ্ছেদ । নারী সমাজ
বাৎস্যায়ন তাঁহার কামসূত্রে গৌড়ের নারীদের মৃদুভাষিণী, অনুরাগবতী, এবং কোমলাঙ্গী বলিয়া (মৃদুভাষিণ্যোহনুরাগবতো মুদ্বঙ্গ্যশ্চগৌড়াঃ) তৃতীয়-চতুর্থ শতকে যে উক্তি করিয়া গিয়াছেন তাহ আজও মোটামুটি সত্য বলিলে ইতিহাসের অপলাপ করা হয় না। কিন্তু বাৎস্যায়নের উক্তির ভিতর প্রাচীন বাঙালী নারীর সমগ্র ছবিটি পাইতেছিনা; সে চিত্র ফুটাইয়া তুলিবার উপাদানও অত্যন্ত স্বল্প। এই অধ্যায়ে এবং অন্যত্র প্রাচীন বাঙালী নারীর কোনো কোনো দিক সম্বন্ধে ইতিপূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে। তাহাদের প্রসাধন, অলংকার বিলাস-বাসন সম্বন্ধে স্বল্প যাহা জানা যায়, তাহা বলিয়াছি; সভানন্দিনী-বাররামা-দেবদাসীদের সম্বন্ধে বলিয়াছি; শবরী-ডোম্বীদের জীবনযাত্রার কিছু কিছু চিত্র ধরিতে চেষ্টা করিয়াছি। সম্পন্ন, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত নারীদের কথাও যেটুকু পাওয়া যায় বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যে, ততটুকু বলিয়াছি। তবু, আরও যাহা বলিবার বাকি রহিয়া গেল তাহা না বলিলে ঐতিহাসিকের কর্তব্য করা হইবেনা; এই প্রসঙ্গে সে কর্তব্য পালন করা যাইতে পারে।
গোড়াতেই বলা চলে, বৃহত্তর হিন্দুসমাজের গভীরে, (শিক্ষিত নাগর-সমাজের কথা বলিতেক্তি না) আজও যে সব আদর্শ, আচার ও অনুষ্ঠান সক্রিয় প্রাচীন বাঙালী সমাজেও তাঁহাই ছিল; যে সব সামাজিক রীতি ও অনুষ্ঠান পল্লী ও নগরবাসী সাধারণ নারীরা দৈনন্দিন জীবনে আজও পালন করিয়া থাকেন, যে সব সামাজিক বাসনা ও আদর্শ পোষণ করেন, প্রাচীন বাঙালী নারীদের মধ্যেও মোটামুটি তাহাই ছিল সক্রিয়। বাঙলার লিপিমালা ও সমসাময়িক সাহিত্যই তাহার প্রমাণ। যে অসবর্ণ বিবাহ আজও বৃহত্তর হিন্দুসমাজে প্রচলিত অথচ সুআদৃত নয়, মাঝে মাঝে তেমন ঘটিয়াও থাকে, এবং সমাজ ক্রমে সেই বিবাহ স্বীকার করিয়াও লয়, প্রাচীন বাঙলায়ও অবস্থাটা ঠিক তাহাই ছিল। দশম-একাদশ-দ্বাদশ শতকের বাঙালী রচিত স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে অসবর্ণ বিবাহের কোনও বিধান নাই, সবর্ণে বিবাহই ছিল সাধারণ নিয়ম, কিন্তু অসবর্ণ বিবাহ যে প্রাচীন বাঙলায় একেবারে অপ্রচলিত ছিল না তাহার প্রমাণ সমতট-রাজ লোকনাথের মাতামহ পারশব কেশব কেশবের পিতা ছিলেন ব্রাহ্মণ কিন্তু মাতা বোধহয় ছিলেন শূদ্রকনা; কেশবের পারশব পরিচয়ের ইহাই কারণ। কিন্তু তাহাতে কেশবকে সমাজে কিছু হীনতা স্বীকার করিতে হয় নাই, তাহার কন্যা গোত্রদেবী বা দৌহিত্র লোকনাথকেও নয়। কিন্তু কেবল সপ্তম শতকেই বোধ হয় নয়, পরেও এই ধরনের অসবর্ণ বিবাহ কিছু কিছু সংঘটিত হইত; নহিলে পঞ্চদশ শতকের গোড়ায় সুলতান জলাল-উদ-দীন বা যদুর সভাপণ্ডিত ও মন্ত্রী বাঙালী বৃহস্পতি মিশ্র যে স্মৃতিগ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন, তাহাতে ব্রাহ্মণের পক্ষে অন্য নিম্নতর বর্ণ হইতে স্ত্রী গ্রহণে কোনো বাধা নাই, এ বিধান দিবার কোনো প্রয়োজন হইত না।
