চর্যাগীতিতে গার্হস্থ্য জীবনের চিত্র
চর্যাগীতির অনেকগুলি গীতেও বাঙালীর সমসাময়িক গার্হস্থ্য-জীবনের চিত্র দৃষ্টিগোচর। দেশে চোর-ডাকাতের উপদ্রব বোধ হয় বেশ ছিল, সমর্থ প্রহরীর প্রয়োজন হইত, দরজায় তালা লাগাইতে হইত। কাহ্নপাদ বলিতেছেন:
সুনবাহ তথতা পহারী
মোহ ভাণ্ডার লই সআলা অহারী॥
শূন্য গৃহে তথতা প্রহরী; মোহভাণ্ডার সকলই কাড়িয়া লইয়া গিয়াছে।
আর, সরহপাদের দোহায় আছে, “জই পবন-গমন-দুআরে দিঢ় তালা বি দিজ্জই”। ঘরে তালা লাগাইবার ইঙ্গিত চর্যাপদেও আছে (৯নং)। আয়না ব্যবহারের কথাও আছে (৪৯নং)। চুরি-ডাকাতি যে হইত, সন্দেহ কি? একটি গীতে কুকরীপাদ বলিতেছেন:
আঙ্গণ ঘরপণ সুন বিআতী।
কানেট চোরে নিল অধরাতী।।
সুসুরা নিদ গেল বহুরী জাগঅ
কানেট চোরে নিল কা গই মাগঅ॥
অঙ্গন ঘরের কোণেই হে অবধূতি, শোনো, কানেট অর্ধরাত্রে চোরে লইয়া গেল, শ্বশুর পড়িল ঘুমাইয়া, বহুড়ি আছে জাগিয়া, কানেট নিল চোরে, কোথায় গিয়া আবার তাহা মাগিবে ! (কানের গহনা কানে পরিয়াই ঘরের বৌ পড়িয়াছিল ঘুমাইয়া, মাঝরাত্রে চোর আসিয়া গহনাটি চুরি করিয়া লইয়া গেল। শ্বশুর তখনও ঘুমে; কিন্তু ভয়ে ভয়ে জাগিয়া বসিয়া আছে বৌ। মনে বড় ভয় ও ভাবনা; চোরের ভয় একদিকে, অন্যদিকে গহনাটি চুরি গিয়াছে— লজ্জা ও অর্থদণ্ড দুইই। কার কাছে চাহিলেই বা গহনা আর পাওয়া যাইবে!)
এই গীতটির মধ্যে ঘরের বৌ-এর একটু চঞ্চল চরিত্রের ইঙ্গিতও যে নাই, এমন নয়। ভয় ও লজ্জা কতকটা সেই জন্যও; শ্বশুর কী বলিবেন, এই ভাবনা! এই গীতে একটু পরেই আছে, বৌটির এতই ভয় যে, দিনের বেলা কাকের ভয়েই চিৎকার করিয়া ওঠে, অথচ রাত্রি হইলেই কোথায় যে চলিয়া যায় সে !
দিবসই বহুড়ি কাগ ডরে ভাঅ।
রাতি ভইলে কামরু জাঅ॥
এই পদটিতে অসতী কুলবধূ সম্বন্ধে সর্বভারত প্রচলিত একটি উক্তির প্রতিধ্বনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
তখনকার দিনেও গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর একত্র বসিয়া খাওয়া নিন্দনীয় ছিল, দেশাচারে অসিদ্ধ ছিল। দোহাকোষে আছে:
ঘরবই খজ্জই ঘরিণীএহি জঁহি দেসহি অবিসার।
বিবাহে বরপক্ষ কর্তৃক যৌতুক-গ্রহণের কথা আগেই বলিয়াছি। যৌতুকের লোভে অনেকেই নিম্ন জাতের ভিতর হইতে কন্যাগ্রহণেও আপত্তি করিতেন না।
দোহাকোষে একটি অর্থবহ দোহা আছে। পরনারীতে আসক্ত পুরুষদের দোহাকার উপদেশ দিতেছেন:
নিঅ ঘরে ঘরিণী জাব ণ মজ্জই।
তাব কি পঞ্চবণ্ণ বিহারিজ্জই॥
নিজের ঘরে আপন গৃহিণী যে পর্যন্ত না মজেন সে পর্যন্ত কি পঞ্চবর্ণে বিহার করা যায়?
বঙ্গাল দেশের সঙ্গে বোধ হয় তখনও পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গের বিবাহাদি সম্পর্ক প্রচলিত ছিল না। তাহা ছাড়া, পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গবাসীরা বোধ হয় বঙ্গালবাসীদের খুব প্রীতির চক্ষেও দেখিতেন না। সরহপাদের একটি দোহায় আছে: “বঙ্গে জায়া নিলেসি পরে ভাগেল তোহর বিণাণা”, অর্থাৎ, বঙ্গে (পূর্ববঙ্গ হইতে) লইয়াছিস স্ত্রী, পরে (তাহার ফলে) ভাগিল তোর বিজ্ঞান (তোর বুদ্ধি গেল খোয়া) । ভুসুকুপাদের একটি গানে আছে, ভুসুকু যেদিন চণ্ডালীকে নিজের গৃহিণী করিলেন সেদিন তিনি যথার্থ ‘বঙ্গালী’ হইলেন । অর্থ বোধ হয় এই যে, আগে শুধু জন্মে ‘বঙ্গালী’ ছিলেন, চণ্ডালীকে যোগসঙ্গিনী করায় যথার্থ ‘বঙ্গালী’ হইলেন ।
শবর-শবরী এবং অন্যান্য অন্ত্যজ বর্ণের জীবনযাত্রা
শবরদের সম্বন্ধে নানা অধ্যায়ে নানা প্রসঙ্গে নানা কথা বলা হইয়াছে। চর্যাগীতির একাধিক গীতে ইহাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা যায়। ইহারা বাস করিতেন বড় বড় পাহাড়ের সুউচ্চ শিখরচুড়ায় (বরগিরিসিহর উত্ত্বঙ্গ মুণি সবরে জহি কিঅ বাস– কাহ্নপাদ)। ধর্মকর্ম অধ্যায়ে পর্ণশবরীর ধ্যান-প্রসঙ্গে শবরপাদের একটি গীত উদ্ধার করিয়াছি, এই গীতটিতে শবর-শবরীদের পাহাড়ী জীবনযাত্রার সুন্দর বর্ণনা-আছে। জনবসতি হইতে দূরে উঁচু পাহাড়ে শবর-শবরীদের বাস; শবরী গুঞ্জার মালা পরেন গলায়, কটিতে জড়ান ময়ূরের পাখ, কানে পরেন কুণ্ডল। উন্মত্ত শবর নেশার ঝোকে শবরীকে যান ভুলিয়া; তখন শবরী তাহাকে ডাকিয়া আনিয়া আবার ঘর সামলান। কুঁড়ে ঘরে খাটিয়ার উপর তাহাদের সুখশয়ন; সেই খাটিয়ায় নিবিড় তাহাদের মিলন। তাম্বুল (পান) আর কপূর তাহদের পূর্বরাগের উপাদান। শরধনু লইয়া শিকার তাহাদের জীবিকা। এক একদিন শবর রাগ করিয়া অনেকদূরে পাহাড়ের গুহায় চলিয়া যান; শবরী তখন একা একা তাহাকে খুঁজিয়া বেড়ান। এই শবরপাদেরই (ইনি কি নিজেই শবর ছিলেন?) আর একটি গীত আছে শবরদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে; এ চিত্রটিও সুন্দর ও বস্তুময়।
গঅণত গঅণত তইলা বাড়ী হিয়েঁ কুরাড়ী।
কণ্ঠে নৈরামণি বালি জাগন্তে উপাড়ী৷
… …
হেরি সে মোর তইলা বাড়ী খসম সমতুলা।
সুকড় এ সেরে কপাসু ফুটিলা।
… …
কঙ্গুচিনা পাকেলা রে শবর-শবরী মাতেলা।
অনুদিন শবরো কিম্পিন চেবই মহাসুহোঁ ভোলা৷
চারিপাসেঁ ছাইলারে দিয়া চঞ্চালী।
তহিঁ তোলি শবরে ডাহ কএলা কান্দই সগুণ শিআলী॥
পাহাড়ের উপর প্রায় আকাশের গায়ে শবর-শবরীর বাড়ি; বাড়ির চারধারে কার্পাস গাছে ফুল ফুটিয়া আছে। চিনা ধান (কাগনী ধান) পাকিয়াছে, আর শবর-শবরীদের জীবনে উৎসব লাগিয়াছে। চারিদিকে শকুন আর শেয়ালের বড় উপদ্রব; ইহারা ক্ষেতে পড়িয়া পক্ক শস্য নষ্ট করে; বাঁশের চাঁচারীর বেড়া দিয়া সেই জন্য চিনা ধানের ক্ষেত রক্ষা করিতে হয়। ইঁদুরের উপদ্রবও ছিল; একটি চর্যাগীতে তাহারও ইঙ্গিত আছে।
