ব্রাহ্মণাদর্শ
অথচ, অন্যদিকে সমসাময়িক ব্রাহ্মণ স্মৃতি গ্রন্থাদি পড়িলে মনে হয়, সমাজের নৈতিকাদশ উচ্চে তুলিয়া ধরিবার জন্য চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। ব্রাহ্মণ্য লেখকেরা এবং সমাজের নেতারা সকল প্রকার দুর্নীতি এবং সংযমশাসনবিহীন বল্লাহীন কাম-বাসনার বিরুদ্ধে নিজেদের কষ্ঠ ও লেখনী নিয়োগ করিয়াছিলেন। সমসাময়িক লিপিমালা পাঠ করিলে স্বতই মনে হয়, তাঁহারা জনসাধারণের সন্মুখে যে সব নৈতিকাদশ তুলিয়া ধরিতে চাহিয়াছিলেন তাহ চিরাচরিত ঔপনিষদিক, পৌরাণিক এবং রামায়ণ-মহাভারতীয় ব্রাহ্মণ্য নৈতিকাদশেরই সমষ্টি; সে আদর্শ পাতিব্ৰত্যের, শুভ্ৰ শুচিতার, স্থৈর্য ও সংযমের, শ্রী, শ্লীলতা ও ঔদার্যের, দয়া, দান ও ক্ষমার। প্রায়শ্চিত্তপ্রকরণ গ্রন্থে সর্বপ্রকারের দুনীতি, কামাতুরতা, মদ্যাসক্তি, চৌর্য এবং পরনারী ও পরপুরুষগমনের নিন্দ করা হইয়াছে, এবং এই সব অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দণ্ডের এবং প্রায়শ্চিত্তের বিধান দেওয়া হইয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে অনুশীলন করিতে বলা হইয়াছে, সত্য, দান, শুচিতা, দয়া এবং সংযম প্রভৃতি গুণের।
পল্লীর জীবনাদর্শ
আংশিকত এই ধরনের আদর্শপ্রচারের ফলে, আংশিকত বৃহত্তর পল্লীসমাজের ধনোৎপাদন ব্যবস্থা ও সামাজিক জীবন-বিন্যাসের ফলে সাধারণ ভাবে প্রাচীন বাঙালী জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হইতে পারে নাই। যে সব বিলাস-ব্যসন ও অসংযত কামনাবাসনার কথা একটু আগে বলিয়াছি, তাহা সাধারণত নাগর-সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; পল্লীবাসীরা এই সব নাগরাচার পছন্দ করিতেন না, এবং ইহাদের বিরুদ্ধে পল্লীপতিদের দৃষ্টি সদ্যজাগ্রত ছিল। গোবর্ধনাচার্যের একটি শ্লোকে তাহার আভাস আগেই আমরা পাইয়াছি। বৃহত্তর পল্লীসমাজে জীবনের একটি সরল শান্ত
সহজ আদর্শ ছিল সক্রিয়, এবং সমসাময়িক কালের এই আদর্শকে ব্যক্ত করিয়াছেন কবি শুভাঙ্ক।
বিষয়পতিরলুব্ধ ধেনুভিধাম পূতং
কতিচিদভিমতায়াং সীমি সীরা বহন্তি
শিথিলয়তি চ ভাৰ্যা নাতিথেয়ী সপর্য্যাম
ইতি সুকৃতিমনেন ব্যঞ্জিতং নঃ ফলেন৷।
বিষয়পতি (অর্থাৎ, স্থানীয় শাসনকর্তা) লোভহীন, ধেনুদ্বারা গৃহ পবিত্র, নিজ নিজ ক্ষেত্রে উপযুক্ত চাষ হয়, অতিথি পরিচর্যায় গৃহিণী কখনও ক্লান্ত হন না,–এই সব ফল দ্বারা ইঁহার পুণ্য (বা সুকৃতি) আমাদের নিকট ব্যঞ্জিত হইয়াছে।
ইহাই ছিল পল্লীবাসী কৃষিনির্ভর প্রাচীন বাঙালী সমাজের মধ্যবিত্ত লোকদের জীবনাদর্শ। এই সমাজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আদর্শের ইঙ্গিত প্রাকৃতপৈঙ্গলের দুই একটি পদেও পাওয়া যায়।
পুত্ত পবিত্ত বহুত্ত ধণা ভক্তি কুটুম্বিণি সুদ্ধমণা।
হাক তরাসই ভিক্ষগণা কো কর বববর সগগমণা৷
পুত্র পবিত্রমনা, প্রচুর ধন, স্ত্রী ও কুটুম্বিনীরা শুদ্ধচিত্তা, হাঁকে ত্রস্ত হয় ভৃত্যগণ–এই সব ছাড়িয়া কোন বর্বর স্বর্গে যাইতে চায়!
অন্য একটি পদে আছে:
সের এক্ক জই পাঅই ঘিত্তা
মণ্ডা বীস পকাইল ণিত্তা৷
টঙ্ক এক্ক জই সিন্ধব পাআ ।
জো হউরঙ্ক সো হউ রাআ৷
এক সের,ঘি যদি পাই তবে নিত্য বিশটা মণ্ডা পাকাই; যদি এক টাকার সৈন্ধব পাওয়া যায় তবে হোক সে নিঃস্ব, তবু সে রাজা!
দরিদ্র নিম্নবিত্ত সমাজে বাঙালীর সনাতন দুঃখ কষ্ট লাগিয়াই ছিল; “হাড়িতে ভাত নাই, নিতাই উপবাস, অথচ ব্যাঙের সংসার বাড়িয়াই চলিয়াছে’,ক্ষুধায় শিশুদের চোখ ও পেট বসিয়া গিয়াছে, তাহদের দেহ শবের মত শীর্ণ, ভাঙা কলসীতে এক ফোটা মাত্র জল ধরে’, ‘পরিধানে জীর্ণ ছিন্ন বস্ত্র, সেলাই করিবার মত সূচও নাই ঘরে’, ‘ভাঙা কুঁড়েঘরের খুঁটি নড়িতেছে, চাল উড়িতেছে, মাটির দেয়াল গলিয়া পড়িতেছে —এই সব ছবি সমসাময়িক সাহিত্যে দুর্লভ নয়। নানা প্রসঙ্গে এই ধরনের কিছু কিছু দৃষ্টান্ত উদ্ধার করিয়াছি; এখানে আর তাহার পুনরুল্লেখ করিয়া লাভ নাই।
দারিদ্র্যাভিশাপক্লিষ্ট নিরানন্দ জীবনের একমাত্র আনন্দ বোধ হয় ছিল গ্রামের সম্পন্ন গৃহস্থ বাড়ির পার্বণ ব্রত, সম্পন্নতর গৃহের পূজা-উৎসব, এবং দরিদ্রতর স্তরের নানা আদিম কৌমগত যৌথ নৃত্য, গীত ও পূজা। এই সব আশ্রয় করিয়াই মাঝে মাঝে গ্রামের সাধারণ লোকেরা তাহদের দৈনন্দিন দারিদ্র্য-দুঃখ মুহুর্তের জন্য ভুলিয়া থাকিতে চেষ্টা করিতেন।
দশম-একাদশ শতকের বাঙালীর নানা টুকরোটাকরা জীবনচিত্র কল্পনায় আঁকিয়া তোলা যায় বাঙালী কবিকুলরচিত সদুক্তিকর্ণামৃত নানা প্রকীর্ণ শ্লোকগুলি হইতে। বর্ষার গ্রাম কৃষকযুবকের সুখস্বপ্ন আকিয়াছেন কবি যোগেশ্বর; হেমন্তে বাঙলার গ্রামাঞ্চলের শোভা ও সূর্যোদয়, মধ্যাহ্ন ও সন্ধ্যা, বাঙলার ভাষা, বাঙলার ধর্মকর্ম—বিশেষভাবে শিব ও গৌরী কল্পনা—, সাধারণ মানুষের প্রেম, সুখ-দুঃখ, দারিদ্র্য, ঋতুচর্যা, যুদ্ধ, শৌর্য, কীর্তি প্রভৃতি সম্বন্ধে নানা শ্লোক সদুক্তিকর্ণামৃতে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। কিছু কিছু বর্তমান গ্রন্থে নানাপ্রসঙ্গে নানা অধ্যায়ে উদ্ধার করিয়াছি; সব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। বাঙলার জনসাধারণের যে সব চিত্র এই শ্লোকগুলিতে ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহা যে শুধু সুন্দর, বস্তুময় এবং কাব্যময় তাহাই নয়, অন্যত্র, অন্য উপাদান, অন্য সাক্ষ্যপ্রমাণে তাহা দুর্লভ। কিন্তু, বাঙালী ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি আজও এই সব সমসাময়িক জীবন-সাক্ষ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয় নাই!
