রাজশেখরও বলিতেছেন,
“তত্র পৌরস্ত্যনাং (প্রাচ্যবাসীদের) শ্যামো বর্ণঃ দাক্ষিণাত্যানাং কৃষঃ, পাশ্চাত্যানাং পাণ্ডুঃ, উদীচ্যানং গৌরঃ, মধ্যেদেশ্যানং কৃষ্ণঃ শ্যামো গৌরশ্চ।”
গৌরাঙ্গনাদের দেহও যে শ্যামবর্ণ, রাজশেখরের এই উক্তি আগেই উল্লেখ করিয়াছি; অন্যত্র তিনি বলিতেছেন,
শ্যবেষ্বঙ্গেষু গৌড়ীনাং সূত্রহারৈহারিষু।
চক্রীকৃত ধনুঃ পৌস্পমনঙ্গো বল্গু বল্গতি।।
এই সব উক্তি হইতে স্পষ্টই বুঝা যায়, গৌড়বাসীদের, তথা প্রাচ্যবাসীদের দেহবর্ণ সাধারণত ছিল শ্যাম, তবে রাজপরিবার এবং অন্যান্য অভিজাত পরিবারের নরনারীদের দেহবর্ণ যে অনেক সময় হইত গোর বা পাণ্ডুবর্ণ, তাহাও রাজশেখর বলিয়াছেন, “বিশেষস্তু পূর্বদেশে রাজপুত্রাদীনাং গৌরঃ পাণ্ডুর্বা বর্ণঃ।”
০৪. জীবনচিত্র – বাসনা ও ব্যসন
একাদশ অধ্যায় – দৈনন্দিন জীবন
প্রথম পরিচ্ছেদ । জীবনচিত্র – বাসনা ও ব্যসন
নাগরাদর্শ
প্রাচীন বাঙালী সমাজের নানা কামবাসনা ও ব্যসনের কথা প্রসঙ্গে বর্তমান ও অন্যান্য অধ্যায়ে বলা হইয়াছে। এখানে সমস্ত সাক্ষ্য একত্র করিয়া সার সংকলন করা অনুচিত হইবে না। খ্ৰীষ্টীয় তৃতীয়-চতুর্থ শতক হইতেই বাঙলাদেশ, স্বল্পাংশে হইলেও, উত্তর ভারতীয় সদাগরী ধনতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিল এবং উত্তর ভারতের নাগর-সভ্যতার স্পর্শও তাহার অঙ্গে লাগিয়াছিল; বাৎস্যায়নীয় নাগরাদর্শ বাঙলার নাগর-সমাজেরও আদর্শ হইয়া উঠিয়াছিল। গৌড়ের যুবক-যুবতীদের কামলীলার কথা, তাহদের বাসনা ও ব্যসনের কথা এবং গৌড়-বঙ্গের রাজান্তঃপুরের মহিলারা যে নির্লজ্জভাবে ব্রাহ্মণ, রাজকর্মচারী ও দাস-ভৃত্যদের সঙ্গে কাম-ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইতেন তাহার বিবরণ বাৎস্যায়নই রাখিয়া গিয়াছেন। সে বিবরণ পড়িলে মনে হয়, ভিন-প্রদেশীরা গৌড়-বঙ্গের যুবক-যুবতীদের এই ধরনের কামবাসনা ও ব্যসনকে খুব সুনজরে দেখিতেন না। স্মৃতিকার বৃহস্পতির কয়েকটি শ্লোক দেবলভট্টের স্মৃতিচন্দ্রিক গ্রন্থে ও ভট্ট নীলকণ্ঠের ব্যবহার-ময়ূখ গ্রন্থে উদ্ধত হইয়াছে; তাহা হইতে জানা যায়, বৃহস্পতি দুই কারণে বাঙালী দ্বিজবর্ণের লোকদের নিন্দা করিয়াছেন: প্রথম কারণ, তাহদের মৎস্য ভক্ষণ; দ্বিতীয় কারণ, তাহদের সমাজের নারীরা দুনীতিপরায়ণা! শুধু বাৎস্যায়নের কালেই নয়, তাহার পরও প্রাচীন বাঙালী বোধ হয় কামবাসনায় সংযম অভ্যাসে অভ্যস্ত হয় নাই। ধোয়ীর পবনদূতেও দেখিতেছি, কামচরিতার্থতার অবাধলীলা কবি সোৎসাহে এবং সাড়ম্বরে বিবৃত করিয়াছেন। পবনদূত এবং রামচরিত উভয় কাব্যেই, যে ভাবে সভানন্দিনীদের উচ্ছসিত স্তুতিগান এবং তাহাদের বিলাসলীলা বর্ণনা করা হইয়াছে, তাহাতে মনে হয়, নাগর-সমাজের সমৃদ্ধ উচ্চস্তরে ইহাদের আকর্ষণ ও প্রভাব স্বল্প ছিল না, এবং ইহারা নাগর-সমাজের বিশেষ অঙ্গ বলিয়া বিবেচিত হইতেন।
কেশবসেনের ইদিলপুর লিপি ও বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষদ লিপিতে আছে, প্রতি সন্ধ্যায় এইসব সভানন্দিনীদের নপুর-বাংকারে সভা ও আমোদগ্রহগুলি পরিপূরিত হইত। সন্দেহ নাই, রাজসভায় এবং বিত্তবান সমাজে এই নন্দিনীদের বিশেষ একটা স্থান ছিল। তাহা ছাড়া নগরে ও গ্রামে বিত্তবানদের ঘরে দাসী রাখার প্রথা যে প্রায় সর্বব্যাপী ছিল, তাহা তো জীমূতবাহনই দায়ভাগ গ্রন্থে বলিয়াছেন। টীকাকার মহেশ্বর বলিতেছেন, দাসী রাখা হইত শুধু কামচরিতার্থতার জন্য! এই ধরনের দাসী রাখার প্রথা বাঙলাদেশের বহুদিন প্রচলিত। বাৎস্যায়নও ইহাদের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। এই দাসীরা অস্থাবর সম্পত্তির মতো যথেচ্ছ ক্রীত ও বিক্রীত হইতেন; দায়ভাগ গ্রন্থে বলা হইয়াছে, উত্তরাধিকার সূত্রে একাধিক ব্যক্তি যদি একটি মাত্র দাসীর অধিকারী হন, তাহা হইলে সেই দাসী প্রত্যেকের অংশানুযায়ী পর পর প্রত্যেকের অধিকারে থাকিবেন।
এর উপর ছিল আবার দেবদাসী প্রথা। বাঙলাদেশে এই প্রথার প্রথম উল্লেখ অষ্টম শতকে, এবং তাহা কলহনের রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থে, নর্তকী কমলা প্রসঙ্গে। কমলা ছিলেন পুণ্ডবর্ধনের কোনও মন্দিরের প্রধান দেবদাসী, নৃত্যগীতবাদ্যে সুনিপুণা, বিবিধ কলায় কলাবতী। দেবদাসীরা সাধারণত প্রায় সকলেই নানা কলানিপুণা হইতেন, কমলা আবার তাহাদের মধ্যে ছিলেন আরও উচ্চস্তরের। কিন্তু তাহা হইলেও দেবদাসীরা বিত্তবান ও প্রভাবশালী সমাজের কামবাসনা পরিপূরণের সঙ্গিনী হইতেন, সন্দেহ নাই, এবং এই হিসাবে বাররামাদের সঙ্গে তাহদের পার্থক্য বিশেষ কিছু ছিল না। রামচরিতকাব্যে তো ইহাদের স্পষ্টত দেব-বারবনিতাই বলা হইয়াছে; পবনদূতে বলা হইয়াছে বাররামা। কলহনের সুদীর্ঘ কমলা-কাহিনী প্রসঙ্গে সমসাময়িক বাঙলার দেবদাসীদের জীবনযাত্রা এবং সমাজের উচ্চকোটির লোকদের নৈতিক আদর্শ, বাসনা ও ব্যসনের মোটামুটি একটু পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু পাল আমলে এই প্রথা খুব বিস্তৃত ছিল না; পরে দক্ষিণী প্রভাব ও সংস্পর্শের ফলে ক্রমশ দেবদাসী প্রথা দেশে বিস্তার লাভ করে এবং সেন-বর্মণ আমলে দেবদাসীরা সমাজে উচ্চস্তরের মন ও কল্পনা, কামনা ও বাসনাকে একান্ত ভাবে অধিকার করিয়া বসেন। বিজয়সেনের দেওপাড়া-প্রশস্তি এবং ভট্টভবদেবের লিপিতে যে ভাবে ইহাদের বিলাসলাস্য ও সৌন্দর্যলীলা বর্ণনা করা হইয়াছে এবং প্রশস্তিকারেরা যে ভাবে ইহাদের উপর কবিকল্পনার সুনির্বাচিত রূপকালংকার বর্ষণ করিয়াছেন তাহতে এসম্বন্ধে সংশয়ের অবকাশ আর কিছু নাই। ধোয়ী কবি ইহাদের আখ্যা দিতেছেন বাররামা, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বলিতেছেন, ইহাদের দেখিলে মনে হয়; লক্ষ্মী যেন স্বয়ং সুহ্মদেশে অবতীর্ণ হইয়াছেন তাহার পতি মুরারীর পাশে। তিনিই ইঙ্গিত করিতেছেন, সেন বংশীয় রাজাদের পাশে সর্বদা স্বভাবসুন্দরী বারনারীরা অবস্থান করিতেন, মনে হইত যেন মুরারীর পাশে লক্ষ্মী। আর, ভবদেব-ভট্ট বলিতেছেন, বিষ্ণুমন্দিরে উৎসর্গকৃত শত দেবদাসীরা যেন কামদেবতাকে পুনরুজ্জীবিত করিয়াছেন, তাহারা যেন কামাতুর জনের কারাগুহ, যেন সঙ্গীত, লাস্য এবং সৌন্দর্যের সভামন্দির!
