সে-সব দরিদ্র শ্রোত্রিয়দিকের ঝটিকাহত কুটিরের প্রাঙ্গণ কার্পাস বীজের দ্বারা আকীর্ণ ছিল, (হে মহারাজ), এখন তোমার কৃপায় সেখানকার সৌধাবলীর বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে যুবতীদের ক্রীড়াযুদ্ধে ছিন্নহারের মুক্তাসমূহ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ে।
অলংকরণ
সমসাময়িক সাহিত্য ও প্রত্নবস্তুর সাক্ষ্য হইতে প্রমাণিত হয়, প্রাচীন বাঙালী নারী ও পুরুষ এমন কতকগুলি অলংকার ব্যবহার করিতেন যাহা উভয় ক্ষেত্রেই এক। কর্ণকুণ্ডল ও কর্ণাঙ্গুরী, অঙ্গুরীয়ক, কণ্ঠহার, বলয়, কয়ূর, মেখলা ইত্যাদি নরনারী নির্বিশেষে ব্যবহৃত হইত। নারীরা, সম্ভবত বিবাহিত নারীরা, বিশেষভাবে ব্যবহার করিতেন শঙ্খবলয়। মুক্তাখচিত হারের কথা, মহানীলরক্তাক্ষমালার কথা, বিজয়সেনের নৈহাটি-লিপিতে পাইতেছি এবং দেওপাড়া-প্রশস্তিতেই শুনিতেছি, রাজবাড়ির ভৃত্যের স্ত্রীরাও নাকি হার, কর্ণাঙ্গুরী, মালা, মল এবং সূবর্ণবলয় ইত্যাদি পরিতেন, মূল্যবান পাথরের তৈরী ফুল ইত্যাদিও ব্যবহার করিতেন। মুক্তাখচিত হার পরিতেন, রাজপরিবারের মেয়েরা (নৈহাটি-লিপি)। রামচরিতে পড়া যায়, হীরকখচিত নানা সুন্দর অলংকার এবং রত্নখচিত ঘুঙুরের কথা, মুক্তা, মরকত, নীলকান্তমণি, চূণী, প্রভৃতি রত্নাদি ব্যবহারের কথা। আর, সোনা ও রূপার গহনা তো ছিল। বলা বাহুল্য, এই সব অলংকরণ-বিলাস ছিল সাধারণ মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র গ্রহস্থদের নাগালের বাহিরে; বড় জোর শঙ্খবলয়, কচি তালপাতার কর্ণাভরণ, এবং ফুলের মালাতেই তাঁহাদের সন্তুষ্ট থাকিতে হইত। দেওপাড়া-প্রশস্তিতে কবি উমাপতিধর বলিতেছেন, পল্লীবাসী নির্ধন ব্রাহ্ম রমণীরা রাজার কৃপায় নগরে আসিয়া বহুবিভবশালিনী হইলেও তাঁহারা মুক্তা ও কার্পাসবীজে, মরকত ও শাকপাতায়, রূপা ও লাউফুলের, রত্ন ও পাকা ডালিমের বীজে, সোনা ও কুমড়া ফুলের পার্থক্য যে কি তাহা জানিতেন না!
উচ্চকোটিস্তরে বিবাহোপলক্ষে কন্যাকে কী ভাবে সজ্জিত ও অলংকৃত করা হইতে তাহার কিছু বর্ণনা আছে নৈষধচরিতে। প্রসঙ্গত উৎসব-সজ্জায় কিছু বিবরণও পাওয়া যায়। প্রথমেই কুলাচার অনুসারে সধবা ও পুত্রবতী গৃহিণীরা মঙ্গলগীত গাহিতে গাহিতে কন্যাকে স্নান করাইতেন এবং পরে শুভ্র পট্টবস্ত্র পরাইতেন। তারপর সখীরা দয়মন্তীকে কপালে পরাইলেন মনঃশিলার তিলক, সোনার টীপ্, কাজল আঁকিয়া দিলেন চোখে, কর্ণযুগলে পরাইলেন দুইটি মণিকুণ্ডল, ঠোঁটে-আলতা, কণ্ঠে সাতলহর মুক্তার মালা, দুই হাতে শঙ্খ ও স্বর্ণবলয়, চরণে আলতা। বিবাহের মাঙ্গলিকানুষ্ঠানে অভ্যস্তা অন্তঃপুরিকারা স্ত্রী-আচারগুলি পালন করিতেন, আর পুরুষেরা ও ব্রাহ্মণেরা বেদোক্ত স্মৃত্যুক্ত কার্যগুলি সম্পাদন করিতেন। বিবাহ-স্থানে আলপনা আঁকা হইত এবং কাজটি করিতেন মেয়েরা। শিল্পীরা নানাপ্রকার রঞ্জিত কাপড় দিয়া তৈরী ফুলে নগরের পথঘাট সাজাইতেন, বাড়ির দেয়ালে নানা ছবি আঁকিতেন। নানা প্রকার বাদ্যের মধ্যে বাঁশি, বীণা, করতাল, মৃদঙ্গ ছিল প্রধান। বরযাত্রাকালে নগরীর নারীরা বরকে দেখিবার জন্য রাজপথের পাশে আসিয়া দাঁড়াইতেন। মঙ্গলানুষ্ঠান উপলক্ষে গৃহতোরণের দুইপাশে কদলীস্তম্ভ রোপণ করা হইত; বাসর ঘরে (কৌতুকগৃহে), আজিকার মতন তখনও চুরি করিয়া চুপি দেওয়া এবং আড়িপাতা হইত (সকৌতুকাগারমগাত্ পুরন্ধ্রিভিঃ সহস্র রন্ধ্রোকৃত্মীক্ষিতুংতঃ। অধাত্ সহস্রাক্ষতনুত্রমিত্রতাং অধিষ্ঠিতং যত্ খলু জিষ্ণুনামুনা।।); বরকন্যার গাঁটছড়াও বাধা হইত। বরযাত্রীদের পরিচর্যা এবং ভোজনে পরিবেশন করিতেন পুরনারীরা এবং তাঁহাদের লইয়া বরযাত্রীরা নানা প্রকার ঠাট্টা-রসিকতা করিতেও ছাড়িতেন না; সেসব ঠাট্টা ও রসিকতা আজিকার দিনে খুব মার্জিত বলিয়া মনে হইবার কারণ নাই। পুরনারীরাও নানাপ্রকারে বরযাত্রীদের ঠকাইতে চেষ্টা করিতেন, আজও যেমন করা হয়। নল-দয়মন্তীর বিবাহ বর্ণনা-সাক্ষ্যে মনে হয়, বিবাহের পরও বর ও বরযাত্রীরা বিবাহবাড়িতে ৪/৫ দিন বাস করিতেন! সেই কয়েকদিনও বরযাত্রীরা বারসুন্দরী বা বাররামাদের সঙ্গলাভ করিতে কুণ্ঠা বোধ করিতেন না! বস্তুত, শৌখিন উচ্চস্তরে যুবকদের মধ্যে বাররামাসঙ্গ বোধ হয় খুব দোষের বলিয়া গণ্য হইত না।
বসন-ভুষণ-প্রসাধন-অলংকার প্রভৃতি সম্বন্ধে নানা টুকরা টাকরা খবর নানাদিক হইতে পাওয়া যায়। ভরতমুনি তাঁহার নাট্যশাস্ত্রে (আনুমানিক তৃতীয় শতক) বলিতেছেন, “গৌড়ীনামলকপ্রায়ং সশিখাপাশবেণিকম” — অর্থাৎ গৌড়ীয় নারীদের মাথায় কুঞ্চিত কেশ, এবং তাঁহাদের চুলের বেণীর শেষাংশ থাকিত শিখার মতো মুক্ত। রাজশেখর (নবম-দশম-শতক) তাঁহার কাব্যমীমাংসাগ্রন্থে অঙ্গ-বঙ্গ-সুহ্ম-ব্রহ্ম-পুণ্ড্র প্রভৃতি প্রাচ্যবাসীদের বেশ (বেষ) বর্ণনা উপলক্ষে গৌড়-নারীর বেশের (বেষের) যে বর্ণনা দিয়াছেন তাহা একটু আগেই উল্লেখ করিয়াছি।
প্রাচীন বাঙালীর দেহবর্ণ কিরূপ ছিল কিছুটা আভাস পাওয়া যায় ভরতনাট্যশাস্ত্রের নিম্নোদ্ধৃত শ্লোকটি হইতে।
শকাশ্চ যবনাশ্চৈব পহ্লবা বহ্লিকাদয়ঃ
প্রায়েণ গৌরাঃ কর্তব্যা উত্তরাং যে শ্রিতাদিশম।
পাঞ্চালাঃ শূরসেনাশ্চ তথা চৈবোড্রমাগধাঃ
অঙ্গবঙ্গকলিঙ্গাস্তু শ্যামা কার্যাস্তু বর্ণতঃ।।
(নাটকের) শক-যবন পহ্লব-বাহ্লিক প্রভৃতি যে সব (পাত্রপাত্রী) উত্তর দেশবাসী তাহাদের দেহের বর্ণ করিতে হইবে সাধারণত গৌর; পঞ্চাল, শূরসেন, উড্র, মগধ এবং অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গবাসীদের বর্ণ করিতে হইবে শ্যাম।
