রাজশেখর তাঁহার কাব্যমীমাংসা-গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ে প্রাচ্যজনপদবাসীদের প্রসাধরনের বর্ণনা দিতে গিয়া শুধু গৌড় রমণীর বেশ-প্রসাধনের বর্ণনাই করিয়াছেন; বোধ হয় ইহাই ছিল মানদণ্ড।
আদ্রার্দ্রচন্দন কুচার্পিত সূত্রহারঃ
সীমন্তচূম্বিসিচয়ঃ স্ফুটবাহুমূলঃ।
দূর্বাগ্রকাণ্ড রুচিরাস্বগুরূপভোগাদ্
গৌড়াঙ্গনাসু চিরমেষ চকাস্তু রেষঃ।।
বক্ষে আর্দ্রচন্দন, গলায় সূতার হার, সীমন্ত পর্যন্ত আনত শিরোবসন, অনাবৃত বাহুমূল, অঙ্গে অগুরু-প্রসাধন, অঙ্গবর্ণ যেন ‘দূর্বাগ্রকাণ্ড রুচির’, অর্থাৎ দুর্বাদলের মতো শ্যাম — ইহাই হইতেছে গৌড়ঙ্গনাদের বেশ।
নগর ও পল্লীবাসিনী
একদিকে এই নগরবাসিনীদের চিত্র, অন্যদিকে সরল, স্বভাবসুন্দর পল্লীবাসিনী নারীর চিত্রও আছে। পল্লী অঞ্চলের লোকেরা নগরবাসিনী বিলাসিনীদের বেশভূষা চালচলন পছন্দ করিতেন না। কবি গোবর্ধনাচার্য বলিতেছেন :
ঋজুনা নিধেহি চরণৌ পরিহর সখি নিখিলনাগরাচারম।
ইহ ডাকিনীতি পল্লীপতিঃ কটাক্ষেহপি, দণ্ডয়তি।।
সখি, সোজা পা ফেলিয়া চল, নাগরাচার সব ছাড়। একটু কটাক্ষপাত করিলেও এখানে পল্লীপতি (গ্রামপতি) ডাকিনী বলিয়া দণ্ড দেন।
পল্লী-সুন্দরীদের প্রসাধন-অলংকরণের কথা বলিয়াছেন কবি চন্দ্রচন্দ্র :
ভালে কজ্জ্বলবিন্দুরিন্দুকিরণস্পর্ধী মৃণালাঙ্কুরো
দোর্বল্লীষু শলাটুফেনিলফলোত্তংসশ্চ কর্ণাতিথিঃ
ধম্মিল্লস্তিলপল্লবাভিষবণস্নিগ্ধ স্বভাবাদয়ং
পন্থান্ মন্থরয়ত্যানাগরবধুবর্গস্য বেশগ্রহঃ।।
কপালে কাজলের টিপ, হাতে ইন্দুকিরণস্পর্ধী শাদা পদ্মমৃণালের বালা, কানে কচি রীঠাফুলের কর্ণাভরণ, স্নিগ্ধকেশ কবরীতে তিলপল্লব — অনাগর (অর্থাৎ, পল্লীবাসী) বধূদের এই বেশ স্বভাবতই পথিকদের গতি মন্থর করিয়া আনে।
সাধারণ পল্লী ও নগরবাসী দরিদ্র গ্রহস্থ মেয়েরা গৃহকর্মাদি তো করিতেনই, মাঠে-ঘাটেও তাঁহাদের খাটিতে হইত সংসারজীবন নির্বাহের জন্য, হাটবাজারেও যাইতে হইত, সওদা কেনাবেচা করিতে হইত, আবার স্বামীপুত্রকন্যাপরিজনদের পরিচর্যাও করিতে হইত। এইরূপ কর্মব্যস্ত মেয়েদের একটি সুন্দর বস্তুময়, কাব্যময় চিত্র আঁকিয়াছেন কবি শরণ। তাঁহারা যে একবস্ত্র পরিহিতা সে-কথাও শরণের এই শ্লোকটিতে জানা যায়। অন্যত্র অন্য প্রসঙ্গে এই শ্লোকটি উদ্ধার করিয়াছি; এখানে শুধু একটি মর্মানুবাদ রাখিলাম।
এই যে হাটের কাজ শেষ করিয়া ধাইয়া ছুটিয়া চলিয়াছে পৌরাঙ্গনারা, তাহাদের দৃষ্টি সন্ধ্যাসূর্যের মতো (অরুণবর্ণ)। দ্রুত ধাইয়া চলিবার জন্য তাহাদের স্কন্ধ হইতে বস্ত্রাঞ্চল স্খলিত হইয়া পড়িতেছে বারবার, আর তাহাই বারবার তাহারা তুলিয়া দিতে চাহিতেছে। ঘরের চাষী সেই সকালবেলা মাঠে কাজে বাহির হইয়া গিয়াছে, এখন তাহার ঘরে ফিরিয়া আসিবার সময় — এই কথা ভাবিয়া মেয়েরা লাফাইয়া লাফাইয়া ছুটিয়া পথ সংক্ষেপ করিয়া আনিতেছে, আর ব্যস্ত হইয়া হাটে কেনাবেচার দাম আঙুলে গুণিতেছে।
বিজয়সেনের দেওপাড়া-প্রশস্তিতে নানা প্রকার ক্ষৌমবস্ত্রের একটু ইঙ্গিত আছে। তৃতীয় বিগ্রহপালের আমগাছি-লিপিতে পড়িতেছি, রত্নদ্যুতিখচিত অংশুক বস্ত্রের কথা। সূক্ষ্ম কার্পাস ও রেশম বস্ত্রের কথা তো নানাসূত্রেই পাওয়া যাইতেছে। ইহা কিছু আশ্চর্যও নয়। বাঙলাদেশ যে নানাপ্রকার সূক্ষ্ম বস্ত্রের জন্য ভারতবর্ষ ও ভারতবর্ষের বাহিরে সুবিখ্যাত ছিল, এ-কথা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও গ্রীক পেরিগ্লাস-গ্রন্থ হইতে আরম্ভ করিয়া আরব বণিক সুলেমান (নবম শতক), ভিনিসিয় মার্কো পোলো (ত্রয়োদশ শতক), চীন পরিব্রাজক মা-হুয়ান (পঞ্চদশ শতক) পর্যন্ত সকলেই বলিয়া গিয়াছেন। বস্তুত, অষ্টাদশশতক পর্যন্ত এই খ্যাতি অক্ষুণ্ণ ছিল। চতুর্দশ শতকে তীরভুক্তি বা তিরুহুতবাসী কবি শেখরাচার্য জ্যোতিরীশ্বর নানাপ্রকারের পট্টাম্বরের মধ্যে বাঙলাদেশের মেঘ-উদুম্বর, গঙ্গাসাগর, গাঙ্গোর, লক্ষ্মীবিলাস, দ্বারবাসিনী এবং শীল্হটী পট্টাম্বরের উল্লেখ করিয়াছেন। এগুলি বোধ হয় সমস্ত অলংকৃত পট্টবস্ত্র; কারণ ইহার পরই জ্যোতিরীশ্বর বলিতেছেন নির্ভূষণ বঙ্গাল বস্ত্রের কথা। কিন্তু ‘ক্ষৌম’ বা ‘কৌষেয়’, ‘দুকুল’ বা ‘পত্রোর্ণ’ বস্ত্র, অলংকৃত পট্টবস্ত্র বা কার্পাস বস্ত্র যাহাই হউক, সাধারণ দরিদ্র লোকদের এ-সব বস্ত্র পরিবার সুযোগ ও সংগতি কিছুই ছিল না; তাহাদের ভাগ্যে জুটিত মোটা নির্ভূষণ কার্পাস বস্ত্র মাত্র, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাহা ছিন্ন ও জীর্ণ। অন্তত কবি বার বং আরও একজন অজ্ঞাতনামা কবি বাঙালী দারিদ্রের যে ছবি আমাদের জন্য রাখিয়া গিয়াছেন, তাহার অন্যতম প্রধান উপকরণ ‘স্ফূটিত’ জীর্ণ বস্ত্র। এই দুইটি শ্লোকই সদুক্তিকর্ণামৃত হইতে একই গ্রন্থেরই অন্যত্র অন্য প্রসঙ্গে উদ্ধার করিয়াছি; বাহুল্যভয়ে এখানে শুধু তাহার উল্লেখ রাখিয়া যাইতেছি মাত্র। সূক্ষ্ম কার্পাস বস্ত্র শুধু মেয়েরাই বোধ হয় পরিতেন; অনেকে নিজেরাই যে সে কাপড়ের সূতা কাটিয়া পাকাইয়া লইতেন, বিশেষভাবে বির্ধন ব্রাহ্মণগৃহের নারীরা, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় কবি শুভাঙ্কের নিম্নোদ্ধৃত রাজপ্রশস্তি শ্লোকটিতে।
কার্পাসান্থি প্রচয়নিচিতা নির্ধনশ্রোত্রিয়াণাং
যেষাং বাত্যা প্রবিততকুটীপ্রাঙ্গণান্তা বভূবুঃ।
তৎসৌধানাংপরিসরভূবি ত্বৎপ্রাসাদাদিদানীং
ক্রীড়াযুদ্ধচ্ছিদুরযুবতীহারমুক্তাঃ পতন্তি।।
