আমার মত্ত চিত্তগজেন্দ্র ধাবিত হইতেছে; নিরন্তর গগনে সকল কিছু ঘোলাইয়া যাইতেছে। পাপ ও পুণ্য উভয়ই শিকল ছিঁড়িয়া এবং সকল খাম্ভা মাড়াইয়া গগন-শিখরে গিয়া পৌঁছিয়া একেবারে শান্ত হইয়াছে।
উত্তর ও পূর্ব বাঙলার পার্বত্য নদীর তীরে হাতিরা ঘুরিয়া বেড়াইত যথেচ্ছভাবে। সরহপাদ বলিতেছেন :
মুক্কই চিত্তগজেন্দ করু এত্থ বিঅপ্প ণু পুচ্ছ ।
গঅন গিরী ণৈজল পিএউ তিহুঁ তড় বসউ সইচ্ছ ॥
চিত্ত গজেন্দ্রকে মুক্ত কর; এ বিষয়ে আর কোনও বিকল্প জিজ্ঞাসা করিও না। গগন গিরির নদী জল সে পান করুক, তাহার তটে স্বেচ্ছায় সে বাস করুক।
হাতি ধরিবার আগে সারিগান গাহিয়া হাতির মনকে বশ করিতে হইত। বীণাপাদের একটি গান আছে :
আলি কালি বেণি সারি মুণিয়া।
গঅরব সমরস সান্ধি গুণি আ।।
গরুর গাড়ির চেহারা এখনও যেরূপ প্রাচীনকালেও তাহাই ছিল; বাঙলা ও ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন প্রস্তর ও মৃৎফলকই তাহার প্রমাণ। বরযাত্রায়ও গরুর গাড়ি ব্যবহার করা হইত, চর্যাগীতির একটি গীতে এইরূপ ইঙ্গিত আছে। পাহাড়পুরের একট মৃৎফলকে সুসজ্জিত অশ্বের একটি চিত্র আছে; এই ধরনের সজ্জিত অশ্বে চড়িয়াই সঙ্গতিসম্পন্ন লোকেরা যাতায়াত করিতেন।
পাল্কীর ব্যবহারও ছিল বলিয়াই মনে হয়। কেশবসেনের ইদিলপুর-লিপিতে দেখিতেছি, একটু প্রচ্ছন্নভাবে হস্তীদন্তনির্মিত বাহদণ্ডযুক্ত পাল্কীর উল্লেখ। বল্লালসেন নাকি তাঁহার শত্রুদের রাজলক্ষ্মীদিগকে বন্দী করিয়া লইয়া আসিয়াছিলেন, এই ধরনের পাল্কী চড়াইয়া।
রামচরিত ও পবনদূতে রামাবতী ও বিজয়পুরের বর্ণনা এবং বাণগড়, রামপাল, মহাস্থান, দেওপাড়া প্রভৃতি স্থানের ধ্বংসাবশেষ হইতে মনে হয়, সমৃদ্ধ নগরবাসীরা ইটকাঠের তৈরী খুদ্র বৃহৎ হর্মে বাস করিতেন; রাজপ্রাসাদও তৈরী হইত ইটকাঠেই। কিন্তু এই সব ভবনের আকৃতি প্রকৃতি কিরূপ ছিল তাহা জানিবার উপায় নাই। গ্রামের ইটকাঠের বাড়ি বড় একটা ছিল বলিয়া মনে হয় না; কোনো গ্রামবর্ণনাতেই সেরূপ কোনো উল্লেখ দেখিতেছি না। দরিদ্র নিম্নকোটির লোকেরা ত বটেই, এমন কি সম্পন্ন মহত্তর-কুটুম্ব-গৃহস্থরাও সাধারণত মাটি, খড়, বাঁশ, কাঠ ইত্যাদির তৈরী বাড়িতে বাস করিতেন; মৃৎফলকের সাক্ষ্যে মনে হয়, চাল হইত খড়ের, বাঁশের চাঁচারী বুনিয়া তৈরী হইত বেড়া, আর খুঁটি হইত বাঁশের বা কাঠের। চর্যাগীতিতে বাঁশের চাঁচারী দিয়া বেড়া বাঁধিবার কথা আছে (চারিপাশে ছাইলারে দিয়া চঞ্চালী)। মাটির দেয়ালও ছিল; রাঢ়াঞ্চলে ও উত্তরবঙ্গে মাটির দেয়াল, পূর্বাঞ্চলে চাঁচারীর বেড়া। প্রস্তর ও মৃৎফলকের চিত্র এবং পাণ্ডুলিপি-চিত্র হইতে মনে হয়, আজিকার মতন তখনও বাঁশের বা কাঠের খুঁটির উপর ধনুকাকৃতি বা দুই তিন স্তরে পিরামিডাকৃতির চাল বা ছাউনি তৈরি হইত। একান্ত গরীব গৃহস্থ ও সমাজ-শ্রমিকেরা কুঁড়েঘরে বাস করিতেন। সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থের একটি শ্লোকে এই ধরনের কুঁড়েঘরের একটি বাস্তব বর্ণনা আছে। ‘প্রচুর পয়সি’ প্রাচ্য দেশে এবং বৃষ্টিবহুল বাঙলাদেশে দরিদ্র গৃহস্থের জীর্ণগৃহের দুর্দশার এমন বস্তুনির্ভর অথচ কাব্যময় বর্ণনা বিরল। কবি বার ছবি আঁকিয়াছেন:
চলৎ কাষ্ঠং গলৎকুড্যমুত্তানতৃণ সঞ্চয়ম।
গণ্ডুপদার্থিমণ্ডুকাকীর্ণং জীর্ণং গৃহং মম।।
কাঠের খুঁটি নড়িতেছে, মাটির দেয়াল গলিয়া পড়িতেছে, চালের খড় উড়িয়া যাইতেছে; কেঁচোর সন্ধানে ব্যাঙের দ্বারা আমার জীর্ণ গৃহ আকীর্ণ।
নদ-নদী-খাল-বিখালের বাঙলাদেশে এ-পাড় হইতে ও-পাড় যাইতে আজিকার মতো তখনও সাঁকোর প্রয়োজন ছিলই; এই কারণেই বাঁশ কিংবা কাঠের সাঁকোর সঙ্গে বাঙালীর পরিচয়ও ছিল প্রাচীন কাল হইতেই। চর্যাগীতির একটি গীতে বলা হইয়াছে, পারগামী লোক যাহাতে নির্ভয়ে পারাপার করিতে পারে সেজন্য চাটিলপাদ বেশ একটি দৃঢ় সাঁকো প্রস্তুত করিয়া দিয়াছিলেন। বড় গাছ চিরিয়া সাঁকোর পাট জোড়া দেওয়া হইত এবং টাঙ্গিদ্বারা ইহা শক্ত করা হইত।
ধামার্থে চাটিল সাঙ্কম গঢ়ই।
পারগামী লোঅ নীভর তরই।।
ফাড়িঅ মোহতরু পাটী জোড়িঅ।
অদঅদিঢ়ি টাঙ্গি নিবাণে কোডিঅ।।
তৈজসপত্র
গৃহের আসবাবপত্রের মধ্যে নানা জিনিসের উল্লেখ চর্যাগীতি, রামচরিত, পবনদূত প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে, এবং তাহাদের প্রতিকৃতি প্রস্তর ও মৃতফলকে দেখিতেছি। সমৃদ্ধ, বিত্তবান লোকেরা সোনা ও রূপার তৈরী থালা-বাসন ব্যবহার করিতেন। কিন্তু গ্রামবাসী সাধারণ গৃহস্থেরা কাঁসার এবং দরিদ্র লোকেরা সাধারণত মাটির ভোজন ও পানপাত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। বাঙলার নানা প্রত্নস্থানের ধ্বংসাবশেষ হইতে অসংখ্য মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরা প্রচুর পাওয়া গিয়াছে। পাহাড়পুর ও ময়নামতীর মৃতফলক এবং নানা প্রস্তরফলকে মাটির খেলনা, ফুলদানী, খাট, নানা আকৃতির কলস, বাটি, পান ও ভোজনপাত্র, মাটির জালা, লোটা, দোয়াত, দীপাধার, ঘড়া, জলচৌকী, পুস্তকাধার প্রভৃতির প্রতিকৃতি দেখিতে পাওয়া যায়। এ-সব তৈজসপত্রের বহুল প্রচলন ছিল, সন্দেহ নাই। নানা সুদৃশ্য মণ্ডনালংকারযুক্ত এবং স্বর্ণনির্মিত বিচিত্র আসবাবপত্রের কথা রামচরিতে উল্লেখিত আছে। এ-সব তৈজসপত্র সমৃদ্ধ লোকেদের আয়ত্ত ছিল, সন্দেহ নাই! তবকাত্-ই-নাসীরী-গ্রন্থে আছে, লক্ষণসেনের রাজপ্রাসাদে সোনা ও রূপার ভোজনপাত্র ব্যবহৃত হইত। কেশবসেনের ইদিলপুর লিপিতে লোহার জলপাত্রের উল্লেখ আছে।
০৩. বসন ভূষণ বিলাস-ব্যসন
একাদশ অধ্যায় । দৈনন্দিন জীবন
তৃতীয় পরিচ্ছেদ – বসন ভূষণ বিলাস-ব্যসন
