সহরপাদের একটা গীতে আছে :
কাঅ ণাবড়ি খাণ্টি মণ কেডুআল ।
সদ্গুরু-বঅণে ধর পতিবাল ॥
চীঅ থির করি ধরহুরে নাই ।
আন উপায়ে পার ন জাই ॥
নৌবাহী নৌকা টানঅ গুণে ।
মেলি মেল সহজে জাউ ণ আণেঁ ॥
বাটত ভঅ খাণ্ট বি বলআ ।
ভব উলোলেঁ সর বি বোলিআ ॥
কুল লৈ খর সে উজাঅঁ ।
সরহ ভণৈ গঅণেঁ সমাঅ ॥
কায় (হইতেছে) নৌকা, খাঁটি মন (হইল তাহার) দাঁড়; সদগুরু বচনে হাল ধর। চিত্ত স্থির করিয়া নৌকা ধর; অন্য উপায়ে পারে যাওয়া যায় না। নৌবাহী নৌকা টানে গুনে; সহজে গিয়া মিলিত হও, অন্য (পথে) যাইও না। পথে (আছে) ভয়, বলবান দস্যু; ভব উল্লোলে (তরঙ্গে) সবই টলমল। কূল ধরিয়া খরস্রোতে উজাইয়া যায়; সরহ বলে, গগনে গিয়া প্রবেশ করে।
অন্যত্র কম্বলপাদ বলিতেছেন :
খুঁটি উপাড়ী মেলিলি কাচ্ছি ।
বাহতু কামলি সদ্গুরু পুচ্ছি ॥
মাঙ্গত চড্হিলে চৌদিস চাহঅ ।
কেডুআল নাহি কেঁকি বহবকে পারঅ ॥
খুঁটি (গাঁজ) উপড়াইয়া কাছি খুলিয়া দাও; হে কামলি (পূর্ব-বাঙলায় মাঝি প্রভৃতি দিন-মজুরদের আজও কাম্লা বা কামুলা) সদ্গুরুকে জিজ্ঞাসা করিয়া নৌকা বাহিয়া চল। পথ চড়িয়া (মাঝনদীতে আসিয়া) চারদিকে দেখিয়া দেখ, দাঁড় না থাকিলে কে বাহিতে পারে।
নদ-নদী-খাল-বিলের বাঙলাদেশে নৌকা ও নদীকে কেন্দ্র করিয়া আধ্যাত্ম-জীবনের রূপ-রূপক গড়িয়া উঠিবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়।
ভবনই গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী।
দুআন্তে চিখিল মাঝেঁ ন থাহী।।
ভবনদী গভীর, গম্ভীর বেগে বহিয়া চলে। দুই তীরে কাদা, মাঝে ঠাঁই নাই।
এ-ছবি তো একান্তই বাঙলার নদনদীগুলির : দুই তীর পলিমাটি কাদায় ভরা। আর, নদীর গভীর গম্ভীর বেগ, সেও তো গঙ্গা-পদ্মা-মেঘনা-লৌহিত্যেরই। সরহপাদের একটি গীতে আছে,
বাম দহিন জো খাল-বিখলা।
সরহ ভণই বাপা উজুবাট ভইলা।।
(পথে) বামে দক্ষিণে অনেক খাল-বিখাল; সরহ বলেন, সোজা পথ ধরিয়া চল (অর্থাৎ, খাল-বিখালের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িও না, সোজা চলিয়া যাও)।
এই ছবিও তো একান্তই বাঙলাদেশের। এত খাল-বিখালই বা আর কোথায়! শান্তিপাদের একটি গীতে আছে :
কূলে কূলে মা হোইরে মূঢ়া উজুবাট সংসারা ।
বাল ভিণ একুবাকু ণ ভুলহ রাজপথ কন্ধারা ॥
মাআ মোহ সমুদারে অন্ত ন বুঝসি থাহা ।
আগে নাব ন ভেলা দীসৈ ভন্তি ন পুচ্ছসি নাহা ॥
সুনাপান্তর উহ ন দীসই ভান্তি ন বাসসি জান্তে ।
এস আট মহাসিদ্ধি সিঝৈ উজুবাট জাঅন্তে ॥
বামদাহিণ দো বাটা চ্ছাড়ী শান্তি বুলথেউ সংকেলিউ ।
ঘাট ণ গুমা খড়তড়ি ণ হোই আখি বুঝিব বাট জাইউ ॥
হে মূঢ় কূলে কূলে ঘুরিয়া ফিরিও না; সংসারের (মাঝখানে রহিয়াছে) সহজ পথ। সম্মুখে পড়িয়া আছে যে সমুদ্র, তাহার অন্ত যদি না বুঝা যায়, থই যদি না পাওয়া যায়, সম্মুখে যদি কোনও নৌকা বা ভেলা দেখা না যায়, তবে অভিজ্ঞ পথিক যাঁহারা তাঁহাদের নিকট হইতে পথের দিশা জানিয়া লও। শূন্যে প্রান্তরে যদি পথের ঠিকানা না মেলে, তবু ভ্রান্তির পথে আগাইয়া যাওয়া উচিত নয়। সোজা সহজ পথ ধরিয়া গেলেই মিলিবে অষ্টমহাসিদ্ধি। খেলা করিতে করিতে বাম ও দক্ষিণ পথ ছাড়িয়া (মাঝপথে) চলিতে হইবে। এই সহজপথে ঘাট ঝোপ কিছু নাই, বাধাবিঘ্ন কিছু নাই; চোখ বুঝিয়া এই পথে চলা যায়।
গো-যান । হস্তী ও অশ্বযান
স্থলপথে গ্রাম হইতে দূরে গ্রামান্তরে বা নগরে যাইবার লোকায়ত যান ছিল গো-রথ বা গরুর গাড়ি। মহিষের গাড়ির উল্লেখ দেখিতেছি না; কিন্তু নৈষধচরিতের সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয় তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, বাঙালী প্রাচীন কালে মহিষের দধি ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। গ্রীক ঐতিহাসিকদের বিবরণীতে দেখিতেছি, প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্রের রাজাদের চতুরশ্ববাহিত রথ ছিল। অশ্ববাহিত যান উচ্চকোটির লোকেরা ব্যবহার করিতেন, সন্দেহ করিবার কারণ নাই। গ্রীক ঐতিহাসিকেরা বলিতেছেন, যুদ্ধে গঙ্গারাষ্ট্রের সৈন্যবলের মধ্যে প্রধান বলই ছিল হস্তীবল। অসংখ্য লিপিতেও হস্তীসৈন্যর উল্লেখ সুপ্রচুর। সুপ্রাচীন কাল হইতেই পূর্বভারতের হস্তী অন্যতম প্রধান বাহন বলিয়াও গণ্য হইত। এই পূর্ব-ভারতেই, বিশেষভাবে বাঙলাদেশে ও কামরূপে, হাতি ধরা ও হাতির চিকিৎসা ইত্যাদি সম্বন্ধে একটি বিশেষ শাস্ত্রই গড়িয়া উঠিয়াছিল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় তো বলেন, হস্তী-আয়ুর্বেদ বাঙলার অন্যতম প্রধান গৌরব। রাজ-রাজড়া, সামন্ত-মহাসামন্তরা, বড় বড় ভূম্যধিকারীরা হাতিতে চড়িয়াও যাতায়াত করিতে সন্দেহ নাই। চর্যাগীতি ও দোহাকোষে হাতির রূপক আশ্রয়ে অনেকগুলি গীত স্থান পাইয়াছে, এবং রূপকগুলি এমন, মনে হয়, এই প্রাণীটির সঙ্গে বাঙালীর প্রাণের গভীর পরিচয় ছিল। খেদা পাতিয়া আজিকার দিনে যেমন করিয়া হাতি ধরা হয় তখনও তেমন করিয়াই হাতি এবং হাতিশিশু (করভ) ধরা হইত। বন্য হাতী সুদৃঢ় করিয়া বাঁধিয়া রাখা হইত। চর্যাগীতিতে কাহ্নপাদের একটি গীত আছে :
এবং কার দৃঢ় বাখোড় মোড়িউ ।
বিবিহ বিআপক বাহ্মণ তোড়িউ ॥
কাহ্নু বিলসঅ আসব মাতা ।
সহজ নলিনীবন পৈসি নিবিতা ॥
কিন্তু বন্যহাতি কোনো বাধা বন্ধনই মানিত না, সমস্ত শিকল ছিঁড়িয়া খুঁটি ভাঙিয়া পদ্মবনে গিয়া প্রবেশ করিত।
পাগলা হাতির বর্ণনা মহীধরপাদের একটি গানেও আছে।
মাতেল চীঅ গএন্দা ধারই ।
নিরনতর গঅণন্ত তুসেঁ ঘোলই ॥
পাপ পুণ্ণ বেণি তোড়িঅ সিকল মোড়িঅ খম্ভাঠানা ।
গঅন টকলি লাগিয়ে চিত্ত পৈতি নিবানা ॥
