কাশ্মীরে গৌড়ীয় বিদ্যার্থী
পূর্বের এক অধ্যায়ে দেশ-পরিচয় প্রসঙ্গে আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকপ্রকৃতির কথা বলিয়াছি। এখানে আর তাহার পুনরুক্তি করিব না। শুধু কাশ্মীরী কবি ক্ষেমেন্দ্র তাঁহার দশোপদেশ-গ্রন্থে কাশ্মীর-প্রবাসী গৌড়ীয় বিদ্যার্থীদের যে বর্ণনা দিয়াছেন তাহার পুনরুল্লেখ করিতেছি একটু সবিস্তারে। দশম-একাদশ শতকে প্রচুর গৌড়ীয় বিদ্যার্থী কাশ্মীরে যাইতেন বিদ্যালাভের জন্য। ক্ষেমেন্দ্র বলিতেছেন, ইঁহাদের প্রকৃতি ও ব্যবহার ছিল রূঢ় এবং অমার্জিত। ইঁহারা ছিল অত্যন্ত ছুঁৎমার্গী; ইহাদের দেহ ক্ষীণ, কঙ্কালমাত্র সার, এবং একটু ধাক্কা লাগিলেই ভাঙিয়া পড়িবেন, এই আশঙ্কায় সকলেই ইঁহাদের নিকট হইতে দূরে দূরে থাকিতেন। কিন্তু কিছুদিন প্রবাসযাপনের পরই কাশ্মীরী জল-হাওয়ায় ইঁহারা বেশ মেদ ও শক্তিসম্পন্ন হইয়া উঠিতেন। ‘ওঙ্কার’ ও ‘স্বস্তি’ উচ্চারণ যদিও ছিল ইঁহাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন কর্ম, তবু পাতঞ্জলভাষ্য, তর্ক, মীমাংসা সমস্ত শাস্ত্রই তাঁহাদের পড়া চাই (বোধ হয়, কাশ্মীরী মানদণ্ডে বাঙালীর সংস্কৃতি উচ্চারণ যথেষ্ঠ শুদ্ধ ও মার্জিত ছিল না; ইহারি সম্ভবত ক্ষেমেন্দ্রের বক্রোক্তির কারণ)। ক্ষেমেন্দ্র আরও বলিতেছেন, গৌড়ীয় বিদ্যার্থীরা ধীরে ধীরে পথ চলেন এবং থাকিয়া থাকিয়া তাঁহাদের দর্পিত মাথাটি এদিক্ সেদিক্ দোলান! হাঁটিবার সময় তাঁহাদের ময়ূরপঙ্খী জুতায় মচ্মচ্ শব্দ হয়। মাঝে মাঝে তিনি তাঁহার সুবেশ সুবিন্যস্ত চেহারাটার দিকে তাকাইয়া দেখেন। তাঁহার ক্ষীণ কটিতে লাল কটিবন্ধ। তাঁহার নিকট হইতে অর্থ আদায় করিবার জন্য ভিক্ষু এবং অন্যান্য পরাশ্রয়ী লোকেরা তাঁহার তোষামোদ করিয়া গান গায় ও ছড়া বাঁধে। কৃষ্ণ বর্ণ ও শ্বেতদন্তপংক্তিতে তাঁহাকে দেখায় যেন বানরটি। তাঁহার দুই কর্ণলতিকায় তিন তিনটি করিয়া স্বর্ণ কর্ণভূষণ, হাতে ষষ্ঠি; দেখিয়া মনে হয় যেন সাক্ষাৎ কুবের। স্বল্পমাত্র অজুহাতেই তিনি রোষে ক্ষিপ্ত হইয়া উঠেন; সাধারণ একটি কলহেই ক্ষিপ্ত হইয়া ছুরিকাঘাতে নিজের সহআবাসিকের পেট চিরিয়া দিতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেন না। গর্ব করিয়া তিনি নিজের পরিচয় দেন ঠক্কুর বা ঠাকুর বলিয়া এবং কম দাম দিয়া বেশি জিনিস দাবি করিয়া দোকানদারদের উত্যক্ত করেন।
বিদেশে বাঙালী বিদ্যার্থীর বসনভূষণ সম্বন্ধে আংশিক পরিচয় এই কাহিনীর মধ্যে পাওয়া যায়; কিন্তু তাহার বিস্তৃত পরিচয় লইতে হইলে বাঙলাদেশের সমসাময়িক সাহিত্যগ্রন্থের এবং প্রত্নবস্তুর মধ্যে অনুসন্ধান করিতে হইবে। এই সব সাক্ষ্য হইতে বসনভূষণের মোটামুটি একটা ছবি দাঁড় করানো কঠিন নয়।
বসন ও পরিধানভঙ্গি
গ্রন্থারম্ভে এক অধ্যায়ে বলিয়াছি, পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে সেলাই করা বস্ত্র পরিধানের রীতি আদিমকালে ছিল না; সেলাইবিহীন একবস্ত্র পরাটাই ছিল পুরারীতি। সেলাই করা জামা বা গাত্রাবরণ মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম ভারত হইতে পরবর্তী কালে আমদানী করা হইয়াছিল; কিন্তু অধোবাসের ক্ষেত্রে বাঙালী অথবা তামিল অথবা গুজ্রাতী-মারাঠীরা ধুতি পরিত্যাগ করিয়া ঢিলা বা চুড়িদার পাজামা গ্রহণ করেন নাই। পুরুষের অধোবাসে যেমন ধুতি, মেয়েদের তেমনই শাড়ি। ধুতি ও শাড়িই ছিল প্রাচীন বাঙালীর সাধারণ পরিধেয়, তবে একটু সঙ্গতিসম্পন্ন লোকদের ভিতর ভদ্র বেশ ছিল উত্তরবাসরূপে আর এক খণ্ড সেলাইবিহীন বস্ত্রের ব্যবহার, যাহা ছিল পুরুষদের ক্ষেত্রে উত্তরীয়, নারীদের ক্ষেত্রে ওড়না। ওড়নাই প্রয়োজন মতো অবগুণ্ঠনের কাজ করিত। দরিদ্র ও সাধারণ ভদ্র গ্রহস্থ নারীদের এক বস্ত্র পরাটাই ছিল রীতি, সেই বস্ত্রাঞ্চল টানিয়াই হইত অবগুণ্ঠন।
আজকাল আমরা যেমন পায়ের কুণ্ঠা পর্যন্ত ঝুলাইয়া কোঁচা দিয়া কাপড় পরি, প্রাচীন কালের বাঙালী তাহা করিতেন না। তখনকার ধুতি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে অনেক ছোট ছিল; হাঁটুর নিচে নামাইয়া কাপড় পরা ছিল সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম; সাধারণত হাঁটুর উপর পর্যন্তই ছিল কাপড়ের প্রস্থ। ধুরির মাঝখানটা কোমরে জড়াইয়া দুই প্রান্ত টানিয়া পশ্চাদ্দিকে কচ্ছ বা কাছা। ঠিক নাভির নিচেই দুই তিন প্যাঁচের একটি কটিবন্ধের সাহায্যে কাপড়টি কোমরে আটকানো; কটিবন্ধের গাঁটটি ঠিক নাভির নিচেই দুল্যমান। কেহ কেহ ধুতির একটি প্রান্ত পেছনের দিকে টানিয়া কাছা দিতেন, অন্য প্রান্তটি ভাঁজ করিয়া সম্মুখ দিকে কোঁচার মত ঝুলাইয়া দিতেন। নারীদের শাড়ি পরিবার ধরনও প্রায় একই রকম, তবে শাড়ি ধুতির মতো এত খাটো নয়, পায়ের কব্জি পর্যন্ত ঝুলানো, এবং বসনপ্রান্ত পশ্চাদ্দিকে টানিয়া কচ্ছে রূপান্তরিতও নয়। আজিকার দিনের বাঙালী নারীরা যেভাবে কোমরে এক বা একাধিক প্যাঁচ দিয়া অধোবাস রচনা করেন, প্রাচীন পদ্ধতিও তদনুরূপ, তবে আজিকার মতন প্রাচীন বাঙালী নারী শাড়ির সাহায্যে উত্তরবাস রচনা করিয়া দেহ আবৃত করিতেন না; তাঁহাদের উত্তর-দেহাংশ অনাবৃত রাখাই ছিল সাধারণ নিয়ম। তবে কোন ক্ষেত্রে, বোধ হয় সঙ্গতিসম্পন্ন উচ্চকোটি স্তরে এবং নগরে — হয়তো কতকটা মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় আদর্শ ও সংস্কৃতির প্রেরণায় — কেহ কেহ উত্তরী বা ওড়নার সাহায্যে উত্তরার্ধের কিছু অংশ ঢাকিয়া রাখিতেন, বা স্তনযুগলকে রক্ষা করিতেন চোলি বা স্তনপট্টের সাহায্যে। কেহ কেহ আবার উত্তরবাস রূপে সেলাই করা ‘বডিস্’ জাতীয় এক প্রকার জামার সাহায্যে স্তননিম্ন ও বাহু-ঊর্ধ্ব পর্যন্ত দেহাংশ ঢাকিয়া রাখিতেন। সন্দেহ নাই, এই জাতীয় উত্তরাবাসের ব্যবহার নগর ও উচ্চকোটি স্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল। নারীর সদ্যোক্ত উত্তরবাস ও তাহার শাড়ি এবং পুরুষের ধুতি প্রভৃতি কোনও কোনও ক্ষেত্রে — সমসাময়িক পাণ্ডুলিপি চিত্রের সাক্ষ্যে এ-তথ্য সুস্পষ্ট — নানাপ্রকার লতাপাতা, ফুল, এবং জ্যামিতিক নক্শাদ্বারা মুদ্রিত হইত। এই ধরনের নক্শা-মুদ্রিত বস্ত্রের সঙ্গে ভারতবর্ষের পরিচয় আরম্ভ হয় খ্রীষ্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতক হইতে, এবং সিন্ধু, সৌরাষ্ট্র ও গুজরাত্ ছিল গোড়ার দিকে এই বস্ত্র-ব্যবসায়ের প্রধান কেন্দ্র। পরে ভারতবর্ষের অন্যত্রও ক্রমশ তাহা ছড়াইয়া পড়ে। এই নক্শা-মুদ্রিত বস্ত্রের ইতিহাসের মধ্যে ভারত-ইরাণ-মধ্য-এশিয়ার ঘনিষ্ঠ শিল্প ও অলংকরণগত সম্বন্ধের ইতিহাস লুক্কায়িত। কিন্তু সে কথা এ-ক্ষেত্রে অবান্তর। যাহাই হউক, নারীদের দেহের সমগ্র প্রাচীন আদি অষ্ট্রেলিয়-পলেনেশিয়-মেলানেশিয় নরগোষ্ঠীর মধ্যে ইহাই ছিল প্রচলিত নিয়ম। বলিদ্বীপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্যান্য কয়েকটি দ্বীপে সেই অভ্যাস ও ঐতিহ্যের অবশেষ এখনও বিদ্যমান।
সভা সমিতি এবং বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে বিশেষ বিশেষ পোষাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা ছিল। জীমূতবাহন দায়ভাগ-গ্রন্থে সভা সমিতির জন্য পৃথক পোষাকের কথা বলিয়াছেন। নর্তকী নারীরা পরিতেন পায়ের কণ্ঠা পর্যন্ত বিলম্বিত আঁটিসাঁট পাজামা; দেহের উত্তরার্ধে কাঁধের উপর দিয়া ঝুলাইয়া দিতেন একটি দীর্ঘ ওড়না; নৃত্যের গতিতে ওড়নার প্রান্ত উড়িত লীলায়িত ভঙ্গিতে। সন্নাসী-তপস্বীরা এবং একান্ত দরিদ্র সমাজ-শ্রমিকেরা পরিতেন ন্যাঙ্গোটি। সৈনিক ও মল্লবীরেরা পরিতেন ঊরু পর্যন্ত লম্বিত খাটো আঁট পাজামা; সাধারণ মজুররাও বোধ হয় কখনো কখনো এই ধরণের পোষাক পরিতেন; অন্তত পাহাড়পুরের ফলকচিত্রের সাক্ষ্য তাহাই। শিশুদের পরিধেয় ছিল হাঁটু পর্যন্ত লম্বিত ধুতি না হয় আঁট পাজামা, আর কটিতলে জড়ানো ধটি; তাহাদের কণ্ঠে দুল্যমান এক বা একাধিক পাটা বা পদক-সম্বলিত সুত্রহার।
