উত্তর ও পূর্ব ভারতের সর্বত্র (কাশ্মীরে, গুজরাতে, মহারাষ্ট্রে, কর্ণাটে, বিহারে, উড়িষ্যায়, বাঙলায়, আসামে, হিন্দুস্থানে, রাজপুতনায়, পঞ্জাবে, সীমান্তপ্রদেশে, বিশেষভাবে গাঙ্গেয় উপত্যকায় সর্বত্র) আর্যভাষার প্রবল প্রতাপ। এই আর্যভাষাই আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির বাহন। এই আর্যভাষার প্রধান রূপ সংস্কৃত, যাহা প্রাকৃতজনের মধ্যে প্রাকৃত। এই প্রাকৃত-সংস্কৃতের অপভ্রংশ হইতে বর্তমান উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম ভারতের প্রাদেশিক ভাষাগুলির উৎপত্তি।। বাঙলাভাষা তাহার মধ্যে অন্যতম। এখন, যদি এ কথা প্রমাণ করা যায় যে, এই প্রাকৃত-সংস্কৃতের ভিতর অস্ট্রিক ভাষার শব্দ ও পদরচনারীতির প্রভাব আছে (হয় তাহা নিছক অস্ট্রিকরূপে, অথবা সংস্কৃতকরণের ছদ্মবেশে) তাহা হইলে বুঝিতে হইবে আর্যভাষাভাষী লোকদের আদিমতর স্তরে অস্ট্রিকভাষাভাষী লোকের বাস ছিল এবং এ তথ্যও ধরা পড়িবে যে, অস্ট্রিকভাষী লোকের যে বিস্তৃতি আমরা আগে দেখিয়াছি তাহাপেক্ষাও তাঁহাদের বিস্তৃতি আরও ব্যাপক আরও গভীর ছিল। ঠিক এই তথ্যটাই সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে প্রয়াস করিয়াছেন, পশিলুস্কি-ব্লক-লেভী বাগচী-স্টেন কোনো-চট্টোপাধ্যায় প্রভৃতি পণ্ডিতেরা। তাঁহাদের সুবিস্তৃত ও সুগভীর গবেষণার সকল কথা বলিবার প্রয়োজন নাই; অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাহ দেখিয়া লইতে পরিবেন। আপাতত এ কথা বলিলেই ইতিহাসের প্রয়োজন মিটিতে পারে-যে, প্রাকৃতে-সংস্কৃতে হয় অস্ট্রিকরূপে না-হয় সংস্কৃত-প্রাকৃতের ছদ্মবেশে, বিশুদ্ধ প্রাকৃত-সংস্কৃত ভাষায় ও প্রাদেশিক ভাষাগুলিতে এমন অসংখ্য শব্দ ঋগ্বেদ হইতে আরম্ভ করিয়া আজ পর্যন্ত প্রচলিত আছে, এমন ব্যাকরণ ও পদরচনারীতি আছে যাহা মূলে অস্ট্রিক ভাষা হইতে গৃহীত, এবং এই গ্রহণ সুপ্রাচীন কাল হইতে আরম্ভ করিয়া অপেক্ষাকৃত আধুনিক কাল পর্যন্ত চলিয়া আসিয়াছে, বাঙালীর ইতিহাসে এমন কতগুলি শব্দ ও রীতির উদ্ধার করা যাইতে পারে, যাহা একান্তভাবে না হউক অন্তত বহুলভাবে বাঙলাদেশে এবং বাঙলার সংলগ্ন দেশগুলিতেই প্রচলিত। সব নির্ধারিত শব্দ উদ্ধার করা সম্ভব নয়, তাহার তালিকা উল্লিখিত পণ্ডিতদের রচনায় পাওয়া যাইবে; আমি শুধু সেইসব শব্দই উদ্ধার করিতেছি যেগুলির সঙ্গে বাঙালীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ ও প্রায় অবিচ্ছেদ্য।
আসামে ও বাঙলাদেশে এক কুড়ি, দুই কুড়ি, তিন কুড়ি, চার কুড়িতে (বিশ বা বিংশ নয়) এক পণ, অর্থাৎ ৮০টায় এক পণ গণনার রীতি প্রচলিত আছে। হাটে বাজারে পান, সুপারি, কলা, বাঁশ, কড়ি এমনকি ছোট মাছ ইত্যাদি দ্রব্যও এখনও এইভাবেই গণনা করিয়া ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। এই কুড়ি শব্দটি এবং এই গণনারীতিটি— দুইই অস্ট্রিক। সাঁওতালী ভাষায় উপুণ বা পুণ বা পণ কথাটির অর্থ ৮০ এবং সঙ্গে সঙ্গে ৪-ও। মূল অর্থ চার। অস্ট্রিকভাষাভাষী লোকদের ভিতর কুড়ি শব্দ মানবদেহের কুড়ি অঙ্গুলির সঙ্গে সম্পৃক্ত; কুড়িই তাঁহাদের সংখ্যাগণনার শেষ অঙ্ক এবং কুড়ি লইয়া এক মান। কাজেই এক কুড়ি, দুই কুড়ি, তিন কুড়ি, চার কুড়িতে (৪x২০=৮০) এক গুণ। এই অর্থে আশিও পণ, চারও পণ। এই পণও তাহা হইলে অস্ট্রিক শব্দ। আবার কুড়ি গোণ্ড বা গণ্ডতে এক পণ (=৮০), এ-ও অস্ট্রিক ভাষারই গণনা। অর্থাৎ এক গোণ্ড বা গণ্ডতে চার সংখ্যা; প্রত্যেক কুড়িতে (৪x৫) পাঁচটি গোণ্ড। এই গোণ্ড বা গণ্ডই বাঙলায় গণ্ডা যাহা চার সংখ্যার সমান। চার কুড়িতে এক গণ্ডা। এই গণ্ড হইতেই খ্ৰীষ্টপূর্ব প্রথম-দ্বিতীয় শতকের প্রাকৃত মহাস্থান শিলালিপির গণ্ডকমুদ্রা। ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত এই গণ্ডকমুদ্রার প্রচলন বাঙলাদেশে ছিল। গণ্ডক শব্দের অভিধানগত অর্থই হইতেছে; ভাগ, একপ্রকার গণনানীতি, চার সংখ্যার এক মান ধরিয়া গণনার রীতি, চার কুড়ি মূল্যের একপ্রকার মুদ্রা। দেখা গেল, এই সমস্ত গণনা পদ্ধতিটাই অস্ট্রিকভাষাভাষী লোকদের। আর কুড়ি মুদ্রা যেখানে গণনাক্রমে এতটা স্থান অধিকার করিয়া আছে, সেখানে ইহা তো সহজেই অনুমেয় যে, এই গণনাপদ্ধতি আদিম ভারত ও বৃহত্তর ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যসমৃদ্ধ সভ্যতার সৃষ্টি। বাঙলা গুড়ি বা গুড়া ও গুটি, এই শব্দগুলিও গেণ্ড বা গণ্ডা শব্দ হইতে উদ্ভূত।
বাঙলা খাঁ খাঁ (করে ওঠা), খাঁখার (দেওয়া), বাঁখারি (বাখারি বা চেড়া বাঁশ), বাদুর, কানি (ছেঁড়া কাপড়ের টুকরা), জাং (জঙ্ঘা), ঠেঙ্গ (গোড়ালি হইতে হাঁটু পর্যন্ত পায়ের অংশ), ঠোঁট, পাগল, বাসি, ছাঁচ, ছাঁচতলা, ছোচ্ঞা, কলি (চুন), ছোট, পেট, খোস (পুরাতন বাঙলায় কচ্ছু), ঝোড় বা ঝাড়, ঝোপ, পুরাতন বাঙলায় চিখিল (কাদা), ডোম (প্রাচীন বাঙলার ডোম্ব-ডোম্বী), চোঙ্, চোঙ্গা, মেড়া (=ভেড়া), বোয়াল (মাছ), করাত, দা’ বা দাও, বাইগণ (বেগুন=সংস্কৃত বাতিঙ্গন, বাতিগণ), পগার (জলময় গর্ত বা প্রণালী), গড়, বরজ (পানের), লাউ, লেবু-লেম্বু, কলা, কামরাঙ্গা, ডুমুর প্রভৃতি সমস্ত শব্দই মূলত অস্ট্রিকগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে আবদ্ধ। বাঙলার প্রাচীন জনপদবিভাগের মধ্যে পুণ্ড-পৌণ্ড, তামলিত্তি-তাম্রলিপ্তি-দামলিপ্তি এবং বোধ হয় গঙ্গা (নদী) ও বঙ্গ—এই দুটি নামও এই একই অস্ট্রিকগোষ্ঠীর ভাষার দান। কপোতাক্ষ ও দামোদর, অন্তত এই দুটি নদীর নামও কোল কব-দাক্ এবং দাম-দাক্ হইতে গৃহীত। কোল দা বা দাক্-জল এবং দা বা দাক্ হইতেই সংস্কৃত উদক। অস্ট্রিকভাষাভাষী লোকেরা নিজেদের ভাষার কথা দিয়াই দেশের পাহাড় পর্বত নদনদী গ্রাম জনপদ ইত্যাদির নামকরণ করিয়াছিল, এই অনুমানই তো যুক্তি ও ইতিহাস সম্মত। তাহার কিছু কিছু চিহ্ন এখনও বাঙলা বুলিতে লাগিয়া আছে, যেমন শিয়ালদহ বা শিয়াল-দা, ঝিনাইদহ বা ঝিনাই-দা, বাঁশদহ বা বাঁশ দা (দহ=জলভরা গর্ত, নদীগর্ভের গর্ত); মুণ্ডা ঢেঙ্কি=বাঙলা টেকি, মুণ্ডা মোটো-বাঙলা মোটা। লেভি সাহেব তো বলেন, পুলিন্দ-কুলিন্দ, মেকল-উৎকল, উণ্ড্র-পুণ্ড্র-মুন্ডর, কোসল-তোসল, অঙ্গ-বঙ্গ, কলিঙ্গ-তিলিঙ্গ এবং সম্ভবত তক্কোল-কক্কোল, অচ্ছ-বচ্ছ, এই ধরনের জাতিবাচক যমজ নামকরণ পদ্ধতিটাই অস্ট্রিক। তাহার বচনটি উদ্ধৃতির যোগ্য—
