তুর্কীবিজয়ের পরও বাঙলাদেশে এই ধরনের শীর্ণ রক্তধারার স্পর্শ কিছু কিছু লাগিয়াছে। ভারতবর্ষের বাহির হইতে যেটুকু আসিয়াছে, তাহার দৃষ্টান্ত দুই-চারিটি দেওয়া যায়। কিছু কিছু আরবী মুসলমান পরিবার বাণিজ্যব্যপদেশে বাঙলাদেশে আসিয়া বসবাস করিয়াছে; নোয়াখালি-চট্টগ্রাম অঞ্চলে এবং বাঙলার অন্যান্য জেলায়ও স্বল্পসংখ্যায় ইহাদের দর্শন মেলে। শতাব্দীর পর শতাব্দীর আবর্তে ইহারা বাঙালী মুসলমানদের সঙ্গে এক হইয়া গিয়াছে। নেগ্রিটো-রক্তসম্পৃক্ত হাবসীদের কথাও বলা যায়; বাঙলাদেশে প্রায় পাঁচ-ছয়জন হাবসী সুলতান বহুদিন ধরিয়া রাজত্ব করিয়াছেন। তাহা ছাড়া দিল্লী-আগ্রার অনুকরণে এ দেশেও হাবসী প্রহরী রাখার চলন কিছু কিছু ছিল। ইহারাও বাঙালীর রক্তেই নিজেদের রক্ত মিশাইয়াছে; তাহার কচিৎ নিদর্শন হঠাৎ চোখে পড়িয়া যায় বাঙালী হিন্দু-মুসলমানের উচ্চস্তরেও। কৃষ্ণবর্ণ, প্রশস্ত নাসা, উর্ণাবৎ রুক্ষ কেশ, পুরু উলটানো ঠোঁট দেখিয়া হঠাৎ চমক লাগিয়া যায়। আরাকানী মগ প্রভাবও উল্লেখ করা যায়। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুর উৎপাতে বাঙলার সমুদ্র উপকূলশালী জেলাগুলি পর্যুদস্ত হইয়াছিল; ইহারা চুরি-ডাকাতি করিয়া মেয়ে ধরিয়া লইয়া আসিত আরাকান প্রভৃতি অঞ্চল হইতে এবং এ দেশ হইতে বাহিরে লইয়া যাইত। এইসব মেয়ে বিক্রয় করাই ছিল ইহাদের ব্যাবসা। বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালি প্রভৃতি স্থান ছিল এই ব্যাবসার কেন্দ্র। এইভাবে কিছু কিছু মগরক্তও বাঙালীর রক্তপ্রবাহে সঞ্চারিত হইয়াছে। ভরার মেয়ে র যে গীত ও প্রবাদ-কাহিনী আমাদের দেশে প্রচলিত তাহা বোধহয় নিরর্থক স্বপ্নকল্পনা মাত্র নয়। এইভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া বাঙলাদেশে জাতি-সমন্বয় চলিয়াছে, চলিতেছে এবং সমগ্র জীবনপ্রবাহকে সমন্বিত গতি ও রূপ দান করিতেছে।
৫. জন ও ভাষাতত্ত্ব
দ্বিতীয় অধ্যায় । ইতিহাসের গোড়ার কথা
পঞ্চম পরিচ্ছেদ – জন ও ভাষাতত্ত্ব
জন ও ভাষাতত্ত্ব
এ পর্যন্ত বাঙালীর জনতত্ত্ব বিশ্লেষণ করিয়া যাহা পাওয়া গেল ভাষাতত্ত্বের বিশ্লেষণের মধ্যে তাহার সমর্থন কতটুকু পাওয়া যায়, তাহা এখন দেখা যাইতে পারে। এ চেষ্টা আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় একাধিকবার সার্থকভাবেই করিয়াছেন; তবু মনে হয়, জনতত্ত্ববিশ্লেষণ লব্ধ তথ্যের দিকে দৃষ্টি আর-একটু সজাগ রাখিয়া বাঙলাদেশের জন ও ভাষাপ্রবাহের আলোচনা এবং পরস্পর সম্বন্ধ-নির্ণয়ের অবকাশ এখনও যথেষ্ট আছে। বস্তুত, পশিলুস্কি, ব্লক, লেভি, বাগচী ও চট্টোপাধ্যায় মহাশয় যেদিকে গবেষণার সূত্রপাত করিয়াছেন, সেদিকে সমস্ত সম্ভাবনা এখনও নিঃশেষিত হয় নাই। বাঙলাদেশের ভৌগোলিক সংস্থান ও গ্রাম্য জীবনের সমস্ত খুঁটিনাটির জ্ঞান লইয়া প্রবোধবাবু ও সুনীতিবাবুর ইঙ্গিতগুলি ফুটাইয়া তোলার যথেষ্ট প্রয়োজন আছে এবং আমার বিশ্বাস সেই ফলাফলগুলি জনতত্ত্ব গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে যোগ করিলে বাঙালীর সমাজ ও সংস্কৃতির অনেক রহস্য উদঘাটিত হইবে।
ভারতবর্ষ ও পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও দ্বীপপুঞ্জগুলির বিচিত্র ভাষার সুদীর্ঘ ও সুবিস্তৃত গবেষণার ফলে আজ এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, আনাম, মালয়, তালৈঙ, খাসিয়া, কোল (অথবা মুণ্ডা), সাঁওতাল, নিকোবর, মালাক্কা প্রভৃতি ভূমির বিচিত্র বিভিন্ন অধিবাসীরা যে সব ভাষায় কথা বলে, তালৈ ও খুমের গোষ্ঠীর প্রাচীন সাহিত্য যে সব ভাষায় রচিত সেই ভাষাগুলি একই পরিবারভুক্ত। এই সুবৃহৎ ও সুবিস্তৃত ভাষা-পরিবারের পুরাতন নাম অস্ট্রো-এশীয়, আধুনিক নামকরণ অস্ট্রিক একটু মনঃসংযোগ করিলেই ধরা পড়িবে, এইসব অধিবাসীরা সকলই জন হিসাবে একই গোষ্ঠীর নয়; আনাম বা মালয়-মালাক্কা অঞ্চলে অষ্ট্রেলয়েড রক্তের সঙ্গে মোঙ্গোলীয় রক্তের বহুল সংমিশ্রণ হইয়াছে, অথচ কোল অথবা সাঁওতালদের মধ্যে মোঙ্গোলীয় প্রবাহ নাই, কিন্তু আদি-অষ্ট্রেলয়েড রক্তে অন্য জাতির রক্তপ্রবাহ কমবেশি সঞ্চারিত হইয়াছে। খাসিয়াদের তো মোটামুটি মোঙ্গোলীয় রক্তবহুলই বলা চলে। ইহা হইতে স্বতঃই অনুমান হয় ঐ সব ভূখণ্ডে সন্ধান-সম্ভাব্য আদিমতম স্তরে সর্বত্রই অস্ট্রিক ভাষার প্রচলন ছিল এবং যাহাদের মধ্যে ছিল তাহাদের পরিচয় যতটা পাওয়া যায়, তাহা হইতে দেখা যাইবে, ইহারা প্রায় সকলেই আদি-অষ্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত, যেমন মুণ্ডা, কোল ও সাঁওতালেরা, ভূমিজ ও শবরেরা, মালয় ও আনাম অঞ্চলের অধিবাসীরা, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের লোকেরা। পরবর্তী কালে ইহাদের মধ্যে কমবেশি অন্য জনের রক্তসংমিশ্রণ হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই হইয়াছে, এমনকি অনেক জায়গায় নূতন কোনও জন তাহাদের একেবারে আত্মসাৎ হয়তো করিয়া ফেলিয়াছে, যেমন করিয়াছে মালয়ে, আনামে, নিম্ন ব্রহ্মে যেখানে তালৈ ভাষাভাষী লোকের বাস, প্রভৃতি জায়গায়; কিন্তু পুরাতন জনের ভাষা তাহারা গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়াছে এবং নানা জন বিবর্তনের ভিতর দিয়াও সেই ভাষাপ্রবাহ আজ পর্যন্ত চলিয়া আসিয়াছে। উপরোক্ত তথ্য হইতে আর একটি তথ্য ধরা পড়ে যে, এই অস্ট্রিক ভাষা এক সময় মধ্য ভারত হইতে আরম্ভ করিয়া সাঁওতাল-ভূমি, আসাম, নিম্ন ব্রহ্ম, মালয়, আনাম,নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি সমস্ত ভূখণ্ডে বিস্তৃত ছিল। লক্ষণীয় ইহাই যে, এই সমস্ত ভূখণ্ডই এক সময়ে আদি-অষ্ট্রেলীয়দের বাসভূমির অন্তর্ভুক্ত ছিল। বলিয়াছি, উপরোক্ত ভাষাগুলি সবই অস্ট্রিক পরিবারের; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই এ কথাও বলা উচিত ছিল যে, এক পরিবারভুক্ত হইলেও ইহাদের মধ্যে আত্মীয়তার তারতম্য আছে; যেমন, তালৈঙ, মন-খমরের সঙ্গে কোলগোষ্ঠীর আত্মীয়তা বেশি, খাসিয়াদের সঙ্গে নিকোবরীর। কোল-মুণ্ডা খুব সম্পন্ন গোষ্ঠী; সাঁওতাল, মুণ্ডার, ভূমিজ, হো, কোড়ো, অসুরী, খাড়িয়া, জুয়াং, শবর, গদব প্রভৃতি সকল বুলিই এই গোষ্ঠীর এবং মধ্য-ভারতের পূর্বভাগ জুড়িয়া এইসব বুলিভাষী লোকদের বাস। আশ্চর্যের বিষয়, ইহারা সকলেই আদি-অষ্ট্রেলীয়। এই কারণেই অনুমান হয়, আদি-অষ্ট্রেলীয়দের ভাষাই হয়তো ছিল যাহাকে আমরা এখন বলিতেছি অস্ট্রিক যাহা হউক, এই ভূখণ্ডের দক্ষিণেই দ্রাবিড়ভাষী জনপদ এবং তাহার ফলে বলবত্তর দ্রাবিড়ভাষা কোলভাষার ভূখণ্ডে কোথাও কোথাও ঢুকিয়া পড়িয়াছে। অথচ, এ কথা আজকাল সর্বজনস্বীকৃত যে, দ্রাবিড় ভাষার সঙ্গে মুণ্ডার কোনওসম্বন্ধই নাই। আবার অন্যদিকে, উত্তরে, হিমালয়ের সানুদেশে এমন কতগুলি বুলি আজও প্রচলিত যেগুলি ভোট-বর্মী গোষ্ঠীর ভাষা হইলেও তাঁহাদের এমন কতগুলি লক্ষণ আছে যাহা মুণ্ডা ভাষারই বিশিষ্ট লক্ষণ। এই লক্ষণগুলি যে সেইসব দেশে এক সময়ে বহুল প্রচারিত মুণ্ডা বা অস্ট্রিক গোষ্ঠীর ভাষার লুপ্তাবশেষ, তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। শতদ্রু উপত্যকর কনবার বুলি হইতে আরম্ভ করিয়া নেপালের কনায়ী, বুনান, রংকস, দারমিয়া, চৌদাংসী বিয়াংসী, ধীমাশ প্রভৃতি বুলি পর্যন্ত প্রত্যেকটিতেই এই লুপ্তাবশেষ ধরা যায়। তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, অস্ট্রিক ভাষার বিস্তৃতি শুধু পূর্বোক্ত দেশগুলিতেই নয়, এক সময় উত্তর-ভারতের অনেক স্থলেই ছিল। পরবর্তী যুগে দ্রাবিড় ও আর্যভাষা পশ্চিম দিকে এবং ভোট-বর্মী ভাষা পূর্বদিকে এই ভাষাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করিয়া অধিকাংশ স্থলেই ইহকে গ্রাস করিয়া একেবারে হজম করিয়া ফেলিয়াছে; যে সব ক্ষেত্রে তাহা পারে নাই, বা নানা প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক কারণে তাহা সম্ভব হয় নাই, সেই সব স্থানেই কোনও মতে দ্বীপের মতন আশ্রয়ের মধ্যে স্বল্পসংখ্যক লোকের বুলিতে আবদ্ধ হইয়া নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখিয়াছে।
