এ-প্রসঙ্গে দীনেশচন্দ্ৰ যে মন্তব্য করেছেন তা সৰ্ব্বথা যথার্থ। তিনি বলছেন,
‘…সিয়ান-প্রশস্তিতে যে-নরপতির ধর্মকীর্তি লিপিবদ্ধ হইয়াছে, তাঁহার ভক্তি সর্বাপেক্ষা অধিক ছিল শিবের প্রতি এবং তঁহার কাছে শিবের পরই ছিল জগন্মাতার স্থান। কিন্তু তিনি বিষ্ণু, সূর্য, গণেশ, লক্ষ্মী প্রভৃতি দেবতার প্রতিও একেবারে ভক্তিহীন ছিলেন না।
পালবংশীয় রাজা নয়পালকে পূর্বে বৌদ্ধ মনে করা হইত। বাণগড় শিলা-প্রশস্তির আবিষ্কারের ফলে দেখা গিয়াছে যে, তিনি শৈব্যাচার্য সর্বশিবের নিকট শিবমন্ত্রে দীক্ষিত হইয়াছিলেন। সুতরাং তিনি শিব এবং শক্তির উপাসক ছিলেন বলা যায়; কিন্তু পৌরাণিক বা স্মার্ত মতাবলম্বী হিন্দুর ন্যায় অন্যান্য দেবদেবীকেও তিনি অবজ্ঞা করিতেন না। লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে, সিয়ান-প্রশস্তিতে রাজার কীর্তিকলাপের মধ্যে বৌদ্ধবিহার নির্মাণ এবং বুদ্ধমূর্তি প্রতিষ্ঠার কোন স্পষ্ট উল্লেখ নাই।‘
কালটি একাদশ শতকের প্রথমার্ধ। সুতরাং ধর্মের এই দিক পরিবর্তনে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
(এই সংযোজনাংশের সমস্ত তথ্যই আহৃত হয়েছে; দীনেশচন্দ্র সরকার, “সিয়ান গ্রামের শিলালেখ”, সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, ৮৩ বর্ষ, ৩-৪ সংখ্যা, মাঘ-চৈত্র, ১৩৮৩, ১-২২ পৃ প্ৰবন্ধটি থেকে।)
পাল-রাজাদের তারিখ
পাল-বংশীয় রাজাদের ব্লাজত্বের আরম্ভ ও অবসানের তারিখ ইত্যাদি নিয়ে তর্কবিতর্কের শেষ নেই; একজন পণ্ডিতের নির্ধারণের সঙ্গে আর একজনের মতামতের ঐক্য আর কিছুতেই হচ্ছে না। বোধ হয় হ’বার কথাও নয়। এখনও মাঝে মাঝে রাজাদের নাম ও রাজ্যাঙ্কের উল্লেখ-সম্বলিত নূতন শিলা বা তাম্রলেখ, প্রতিমালিপি, পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছে। তার ফলে কারও কারও রাজত্বকাল বেড়ে যাচ্ছে, যেমন রামপালের। নূতন রাজার নামও পাওয়া যাচ্ছে, যেমন শুরপালের। যে-কোনও রাজার রােজ্যাঙ্কের শেষ-জ্ঞাত তারিখটিই সাধারণত ধরা হয় তার রাজত্বের অবসানের তারিখ বলে; এই তারিখটি যখন নূতন কোনও সাক্ষ্যে এগিয়ে যায় দু’চার পাঁচ-সাত বছর কি তারও বেশি তখন জানা তারিখ সাজিয়ে যে সৌধটি খাড়া করা হয়েছিল তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। সুতরাং, নূতন করে আবার তখন আর একটা কাঠামো দাড় করাতে হয়, কারণ মোটামুটি একটা কাঠামো ছাড়া ইতিহাসকে দাড় করানো যায়না। সেজন্য মনে রাখা ভালো যে, কোনও রাজত্বের আরম্ভ বা অবসানের তারিখ একান্ত সুনিশ্চিত নয়, আনুমানিক মাত্র এবং তা-ও নূতন সাক্ষ্যে নূতনতর বিলম্বিত তারিখ পাওয়া গেলে পরিবর্তনীয়।
যাই হোক, এ-গ্ৰন্থ রচনার পর এ-প্রসঙ্গে, নূতন আবিষ্কার ও নূতন আলোচনা-গবেষণার ফলে যে-সব নূতন তথ্য জানা গেছে তার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করা প্রয়োজন, যেহেতু গ্রন্থমধ্যে তারিখগুলি তদনুযায়ী সংশোধন করা হয়েছে।
(প্রথম) গোপালদেব কবে প্রকৃতিপুঞ্জের ‘নির্বাচনে পাল-সিংহাসনে বসেছিলেন তা সুনির্ধারিতভাবে আমাদের জানা নেই। সকল দিক বিবেচনা করে মোটামুটি ধরে নেওয়া হয়েছে। খ্ৰীষ্টােব্দ ৭৫০-এ। তার পুত্র ধর্মপাল অন্তত ৩২ বৎসর এবং ধর্মপালের পুত্র দেবপাল অন্তত ৩৫ বা ৩৯ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। সমগ্র তালিকাটির চালাচালির সুবিধার জন্য বিলম্বিত ৩৯ বৎসরটি ধরে গণনা করাই যুক্তিযুক্ত।
দেবপাল-পুত্র শূরপাল সম্বন্ধে সংবাদটি নূতন। তার মীর্জাপুর তাম্রশাসন থেকেই আমরা প্রথম জানতে পারলাম যে, দেবপালের মৃত্যুর পর শূরপালই পাল-সিংহাসন আরোহণ করেছিলেন। রাজীেনা-প্রতিমালিপি অনুসারে তিনি অন্তত ৫ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। আগেই জানা ছিল, তার উত্তরাধিকারী (প্রথম) বিগ্রহপাল অন্তত ৩ বৎসর এবং তৎপুত্ৰ নারায়ণপাল অন্তত ৫৪ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন।
নারায়ণপালের পুত্র রাজ্যপালের রাজত্বের কাল সম্বন্ধে একটি নূতন তথ্য জানা গেছে। লণ্ডনের ভিকটোরিয়া ও অ্যালবার্ট মু’জিয়ুমে বলরামের একটি প্রতিমা আছে; সেই প্রতিমাটির পাদপীঠে একটি লিপি উৎকীর্ণ। রাজ্যপালের রাজত্বের পূর্বজ্ঞাত শেষ তারিখ ছিল ৩২ বৎসর; এখন এই নূতন সাক্ষ্যে জানা যাচ্ছে, তিনি অন্তত ৩৭ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। তার উত্তরাধিকারী (দ্বিতীয়) গোপাল রাজত্ব করেছিলেন অন্তত ১৭ বৎসর। এই তারিখটি জানা যাচ্ছে মৈত্ৰেয়-ব্যাকরণের একটি তালপাতার পুঁথি থেকে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তারিখটি পড়েছিলেন। ৫৭, রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় ১৭, এবং দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর, ১১। আমি ১৭ পাঠটিই গ্রহণ করেছি, কারণ ৫৭ বৎসরের সুদীর্ঘ রাজত্ব পাল-কাঠামোতে গুছিয়ে তোলা কঠিন যেহেতু এতটা সময়ের জায়গা পাওয়া কঠিন; এবং ১১ বড় বেশি কম।
(দ্বিতীয়) গোপালের পর রাজা হন (দ্বিতীয়) বিগ্রহপাল। বিগ্ৰহপাল নামাঙ্কিত একটি মৃৎফলক-লিপি বহুদিন জ্ঞাত; এই ফলকের রােজ্যাঙ্ক তারিখ ৮। একই নামাঙ্কিত তিনটি প্রতিমালিপিও আছে; তিনটিই বিহারের কুর্কিহার থেকে। তিনটি প্রতিমাই মুকুট-পরিহিত বুদ্ধের, তিনটিই সর্বতোভাবে একই শৈলীর একই প্রতিমালক্ষণ যুক্ত। একটির রােজ্যাঙ্ক-তারিখ ৩ বা ২, আর দুইটির ১৯। তিনটি প্রতিমাই যে একই রাজার আমলের এ-সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও কারণ নেই। তা ছাড়া, ব্রিটিশ মুজিয়ুমে রক্ষিত বৌদ্ধ পঞ্চরক্ষার একটি পাণ্ডুলিপির ভণিতায় এক পরমেশ্বর পরমভট্টারক পরামসৌগত মহারাজাধিরাজ শ্ৰীমদ বিগ্রহপালদেবের উল্লেখ আছে; এই পাণ্ডুলিপিটি লেখা শেষ হয়েছিল তার রাজত্বের ২৬তম বৎসরে। কেউ কেউ বলেছেন, এই রাজ্যাঙ্ক-তারিখগুলি (দ্বিতীয়) বিগ্রহপালের হতে পারে, (তৃতীয়) বিগ্রহপালের হতেও কোনও বাধা নেই। এবং এ-দুজনের একজন অন্তত ২৬ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এই ২৬ বৎসরের রাজত্বকাল (তৃতীয়) বিগ্রহপালের, (দ্বিতীয়) বিগ্রহপালের নয়। কেন, তা বলছি।
