(প্রথম) মহীপালের বাণগড় শাসনে বলা হয়েছে, তার পিতৃরাজ্য বিলুপ্ত হয়েছিল অনধিকারীদের (কম্বোজ।=কোচদের?) হাতে; তিনি তার পুনরুদ্ধার করেছিলেন। এই বিলুপ্তি ঘটেছিল (দ্বিতীয়) বিগ্রহপালের রাজত্ব কালে। সেই বিগ্রহপাল তার ১৯ রােজ্যাঙ্ক বৎসরে নিজেকে পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ বলে বর্ণনা করেছেন, এমন করা একটু অস্বাভাবিক। তঁর রাজত্বকালে পাল-রাজ্যে বড় দুর্যোগ; সেই দুর্যোগের মধ্যে তিনি বেশিদিন রাজত্ব করতে পেরেছিলেন মনে হয় না। অন্যদিকে, যদি ধরা যায়, নালন্দা মৃৎফলক-লিপি এবং তিনটি কুর্কিহার প্রতিমালিপি, সব ক’টিই (তৃতীয়) বিগ্রহপালের তাহলে এই রাজার রাজ-জীবনে একটি সঙ্গতি ও ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। প্রথম কুর্কিতার প্রতিমালিপিটিতে রােজ্যাঙ্ক তারিখ ৩ (বা ২); এই লিপিতে বিগ্রহপালের পরিচয় শুধু ‘শ্ৰীমন’ বলে; ৮ রােজ্যাঙ্কের নালন্দা মৃৎফলক লিপিটিতে সে-পরিচয় বিবর্তিত হয়েছে ‘শ্ৰীমন মহারাজ’এ এবং ১৯ রােজ্যাঙ্কের কুর্কিহার প্রতিমালিপি-দুটিতে একেবারে ‘শ্ৰীমন বিগ্রহপালদেব রাজাধিরাজ পরমভট্টারক’ রূপে। (দ্বিতীয়) বিগ্রহপালের দুর্যোগময় রাজত্বকালে এ ধরনের ক্রমবিবর্তন অনুমান করা কঠিন, বিশেষ করে যখন তারই রাজত্বকালে রাজ্যের বৃহৎ একটি অংশ ছেড়ে দিতে হয়েছিল শত্রুর হাতে। কিন্তু, (তৃতীয়) বিগ্রহপোলই দীর্ঘতর। কাল, অর্থাৎ, অস্তুত ২৬ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন, এ-অনুমানের বড় কারণ কুর্কিহারের মুকুট-শোভিত বুদ্ধদেবের প্রতিমা তিনটির শিল্পশৈলী ও প্রতিমালক্ষণ। এ-তথ্য সুবিদিত যে, মুকুট-পরিহিত বুদ্ধের প্রতিমালক্ষণ প্রতিষ্ঠিত হ’য়েছিল গন্ধারে, তবে খ্ৰীষ্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকের আগে নয়। গন্ধার থেকে এই বিশিষ্ট প্রতিমা শৈলীটি কাশ্মীরে প্রসারিত হয়েছিল, মনে হয়, ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে। তারপরে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কুর্কিহারের এই মূর্তি তিনটিতে। আর, পাওয়া যাচ্ছে বর্মাদেশে, পগানের আনন্দমন্দিরে ও অন্যত্র, যেখানে প্রতিমাটির পরিচয় জম্বুপতি নামে। পাগান-প্রতিমাগুলির সুস্থির তারিখ মোটামুটি একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ (১০৫০-১১০০)। এই প্রতিমাগুলির সঙ্গে কুর্কিহারের প্রতিমাগুলির শিল্পশৈলী ও প্রতিমালক্ষণ-সাদৃশ্য এত ঘনিষ্ঠ যে, কুর্কিহারের প্রতিমাগুলি একাদশ শতকের প্রথমার্ধের আগে কিছুতেই হতে পারে না। সুতরাং এই প্রতিমালিপি তিনটির বিগ্রহপাল (তৃতীয়) বিগ্রহপাল হওয়াই বেশি সঙ্গত।
(দ্বিতীয়) বিগ্রহপাল কতকাল রাজত্ব করেছিলেন তার ইঙ্গিত কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা। মনে হয়, দশম শতাব্দীর দুর্যোগময়ী সন্ধ্যায় বেশিদিন তার রাজত্ব করা সম্ভব হয়নি।
(দ্বিতীয়) বিগ্রহপালের মৃত্যুর পর রাজা হয়েছিলেন (প্রথম) মহীপাল; তিনি অন্তত ৪৮ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। তঁর রাজত্বকালের মধ্যে একটি স্থিরনির্দিষ্ট তারিখকে স্থান দিতেই হয়। সারনাথে প্রাপ্ত একটি প্রতিমালিপিতে বলা হয়েছে, (প্রথম) মহীপালের আদেশে সেখানে কিছু কিছু নূতন মন্দিরাদি নির্মাণ ও কিছু পুরাতন মন্দিরাদির সংস্কার-ক্রিয়ার ভার দেওয়া হয়েছিল তার দুই ভাই স্থিরপাল ও বসন্তপালের উপর। লিপিটির তারিখ ১০৮৩ বিক্ৰমান্দ-খ্ৰীষ্টােব্দ ১০২৬। সুতরাং এই তারিখটি বহু অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি স্থিরনিশ্চিত চিহ্ন। মহীপালের পর পাল-সিংহাসন আরোহণ করেন রাজা নয়পাল, নয়পাল অন্তত ১৫ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। তার রাজত্বকালেরও মোটামুটি একটি স্থিরবিন্দু আছে: কলচুরী-রাজ কর্ণের সঙ্গে তার একটি সংঘর্ষ হয়েছিল। কৰ্ণ খ্ৰীষ্টীয় ১০৪১-এ সিংহাসন আরোহণ করেছিলেন; সুতরাং এই তারিখটিকে নয়পালের ১৫ বছর রাজত্বকালের মধ্যে স্থান দিতে হয়।
নয়পালের উত্তরাধিকারী (তৃতীয়) বিগ্রহপাল অন্তত ২৬ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন, সে-কথা আগেই বলা হয়েছে।
(তৃতীয়) বিগ্রহপালের পরে পর পর রাজা হয়েছিলেন (দ্বিতীয়) মহীপাল ও (দ্বিতীয়) শূরপাল। এদের রাজত্বকাল সম্বন্ধে আমাদের কিছুই জানা নেই; তবে দু-জনের কেউই বোধ হয় খুব সংক্ষিপ্তকালের বেশি রাজত্ব করতে পারেন নি।
(দ্বিতীয়) শূরপালের উত্তরাধিকারী রামপাল অন্তত ৫৩ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। দিল্লীর ন্যাশনাল মুজিয়ুমে বৌদ্ধ পঞ্চরক্ষা-গ্রন্থের একটি পাণ্ডুলিপি আছে; পাণ্ডুলিপিটি লেখা শেষ হয়েছিল রামপালের রােজ্যাঙ্ক ৫৩ বৎসরে। রামপালের পরে পর পর রাজা হয়েছিলেন কুমারপাল এবং (তৃতীয়) গোপাল। কুমারপালের রাজত্বের কাল সম্বন্ধে কিছুই জানা যায়না; অনুমান করা চলে মাত্র। (তৃতীয়) গোপাল অন্তত ১৪ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন।
(তৃতীয়) গোপালের পর রাজা হয়েছিলেন মদনপাল। তিনি অন্তত ১৮ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন। তার রাজত্বকালের দুটি স্থির নির্দিষ্ট তারিখ জানা যায়। বলগুন্দর প্রতিমালিপিটিতে “তার রাজ্যাঙ্ক তারিখ দেওয়া আছে ১৮, আর বৎসরটি উল্লেখ করা হয়েছে শকাব্দ ১০৮৩ বলে, অর্থাৎ মদনপালের ১৮ তম রাজ্যাঙ্ক হচ্ছে খ্ৰীষ্টােব্দ ১১৪৩। এই রাজারই নানগড় প্রতিমালিপিটির তারিখ হচ্ছে বিক্ৰমাব্দ-এর ১২:০১, অর্থাৎ খ্ৰীষ্টােব্দ ১১৪২-৪৩। সুতরাং মদনপালের রাজত্বকাল খ্ৰীষ্টােব্দ ১১৪৮-এ অবসিত হয়েছিল, এমন অনুমানে বাধা নেই। মদনপালের পর গোবিন্দপাল রাজা হয়েছিলেন। এই রাজার গয়া-শিলালেখতে তারিখ দেওয়া আছে বিক্রমাব্দ ১২:৩২ —শ্ৰীষ্টােব্দ ১১৭৪ ৷৷ গোবিন্দপাল অন্তত এই তারিখটি পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, সন্দেহ নেই।
