যাই হোক, কেউ কেউ মনে করেন, আনাউরহথার আরাকান বিজয়ের পর আরাকান-চন্দ্ৰবংশের অস্তিত্ব আর সেখানে ছিল না; সেই রাজবংশ আরাকান পরিত্যাগ করে চলে এসেছিলেন প্রতিবেশী পট্রিকের রাজ্যে এবং সেখানে নূতন এক চন্দ্ৰবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই কংশেই দক্ষিণপূর্ব বাংলার, বঙ্গ-বঙ্গালের চন্দ্ৰবংশ। এই অনুমানের যুক্তি ও সাক্ষ্যসম্মত কোনও কারণ এখনও কিছু দেখতে পাচ্ছিনে। আনাউরহথার আরাকান-বিজয় ১০৪৪ খ্ৰীষ্টাব্দের আগে হতে পারে না। শ্ৰীচন্দ্রের রাজবংশ তার আগেই সমতট মণ্ডলে, অর্থাৎ দক্ষিণপূর্ব বাংলায় (পট্টিকের যার অন্তর্ভুক্ত) সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে দুই চন্দ্রবংশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা ও যোগাযোগ ছিল, এমন অসম্ভব নয়।
[পাঠ-পঞ্জি : Sirkar. D. C. Epigraphic Discoveries in East Pakistan, op. cit, pp. 19-59, Khan, A. F. and Dani, A H, “Excavations on Manamati Hills near Comilla,” in further Excavations in East Pakistan-Mainarnati, 1956, pp. 20 ff; Dani, A. H. Pakistan Archaeology, Karachi, no. 3, 1956 pp. 2255; Majumdar, R. C., History of Ancient Bengal, First reprint edn, 1974, Calcutta, pp. 167-169, 199-206 and 278-80; Sircar. D. C. “Chandra Kings of Arakan’ in Ep. ind. XXXII, pp. 103-09.
নয়পাল (আ. ১০২৭- ১০৪৩ খ্ৰীষ্টাব্দ)
কিছুদিন আগে, ১৯৭১ খ্ৰীষ্টাব্দের শেষদিকে, বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের অনতিদূরে সিয়ান গ্রামের শাহজাহানপুর পাড়ার মখদুম শাহ জালানের জীর্ণ একটি দরগায় দুটি শিলা ফলক পাওয়া যায়। ফলক দুটি বস্তুত একটি বৃহৎ ফলকের দুই ভগ্ন অংশ। দুটি ফলকই ক্ষত-বিক্ষত, জীর্ণ, অস্পষ্ট, প্রথমটি অপেক্ষাকৃত কম, দ্বিতীয়টি বেশি। সুতরাং উভয় ফলকেরই সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার অসম্ভব। বহু পরিশ্রমে, বহু অধ্যবসায়ে দীনেশচন্দ্র সরকার মশায় যতটা সম্ভব বিভিন্ন অংশের কিছু কিছু পাঠোদ্ধার করেছেন; কিন্তু যতটুকু করেছেন তার ফলে পালবংশের কোনও কোনও রাজা সম্বন্ধে, বিশেষ করে (প্রথম) মহীপালপুত্র রাজা নয়পাল সম্বন্ধে নূতন আলোকপাত ঘটেছে। শিলালেখটি কে উৎকীর্ণ করিয়েছিলেন তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু রাজা নয়পালের রাজত্বকালেই যে তা করানো হয়েছিল, এবং যে নরপতির কীৰ্তিকলাপ এই লেখতে কীর্তিত হয়েছে তিনি যে রাজা নয়পাল ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না, এ-অনুমান সহজেই করা যায়। প্রশস্তি-লেখটির সূচনায়, দীনেশচন্দ্র বলছেন,
‘পালবংশের ধর্মপাল, তৎপুত্র দেবপাল, বিগ্রহপাল (দ্বিতীয়), এবং নয়পালের নাম উদ্ধার করা গিয়াছে। কিন্তু ইহাতে ধর্মপালের পিতা গোপাল এবং নয়পালের পিতা এবং দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র প্রথম মহীপালেরও নামোল্লেখ ছিল বলিয়া অনুমান করিবার কারণ আছে। নয়পালের পরবর্তী কোন পাল-রাজার নাম উদ্ধার করা সম্ভব হয় নাই। প্রশস্তিটিতে যাহার ধর্মকীর্তির বিষয় উল্লিখিত হইয়াছে তাহাকে অনেক সময় নরপতি রূপে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই রাজা যে নয়পাল ব্যতীত অপর কেহ তাহার কোন প্রমাণ প্রশস্তিতে পাওয়া যায় না।‘
এই প্রশস্তিটির ১৬নং শ্লোকে বলা হয়েছে যে, নরপতি (নয়পাল) চেন্দিরাজ কর্ণের কোটি কোটি সৈন্য ধ্বংস করে। প্ৰজাগণের আনন্দবিধান করেছিলেন। কিন্তু তিব্বতী সাক্ষ্য থেকে মনে হয়, চেদিরাজের সঙ্গে যুদ্ধ কোনও পক্ষেরই জয়পরাজয়ে মীমাংসিত হয়নি। মূলগ্রন্থে সে কথা বলা হয়েছে, এখানে আর পুনরুক্তি করে লাভ নেই।
সিয়ান গ্রামের এই প্রশস্তিটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যেন নরপতি নয়পালের কীর্তিকলাপ বর্ণনা, এবং সে-সব কীর্তি প্রায় সমস্তই ধৰ্মকৰ্ম সংক্রাপ্ত। অনেক এই ধরনের কীর্তির মধ্যে কয়েকটি তালিকাগত করা যেতে পারে; পুরারি বা শিবের একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং শৈব সাধুদের বাসের জন্য একটি দ্বিতল মঠ; একাদশ রুদ্রমূর্তি প্রতিষ্ঠা; জগন্মাতার জন্য স্বৰ্ণকলসশোভিত শিলাবলভী (পাথরের চূড়া) নির্মাণ; পাথরের তৈরী মন্দিরে নয়টি চণ্ডিকামূর্তি প্রতিষ্ঠা; দেবীকোটে হেতুকেশ শিবের মন্দির প্রতিষ্ঠা; ক্ষেমেশ্বর শিবের পাথরের মন্দির, মঠ ও সরোবর প্রতিষ্ঠা; উচ্চদেব-সংজ্ঞক বিষ্ণুমন্দির, তৎসংলগ্ন আরোগ্যশালা ও বৈদ্যাবাস প্রতিষ্ঠা ঘন্টী বা শিব ও তার চারদিকে চৌষট্টি মাতৃকামূর্তি প্রতিষ্ঠা; চম্পা নগরীতে বটেশ্বরের শিলামন্দির প্রতিষ্ঠা; (প্ৰতীহাররাজ) মহেন্দ্ৰপাল-প্রতিষ্ঠিত চর্চা বা জগদম্বার শৈলমন্দিরে শিলাদ্বারা চূড়া ও সোপান নির্মাণ, ধর্মারণ্যে মাতঙ্গব্যাপীর সংস্কার, মাতঙ্গেশ্বর শিবের মন্দির নির্মাণ এবং সেই মন্দিরে শিবের কন্যা শ্ৰী বা লক্ষ্মীর প্রতিষ্ঠা; সূর্যমন্দির প্রতিষ্ঠা; বৈদ্যনাথ শিকের স্বর্ণখোল নির্মাণ এবং মন্দির-শিখরে স্বর্ণকলস স্থাপন, অট্টহাসে জগন্মাতার মন্দিরে স্বৰ্ণকলস স্থাপন; গঙ্গাসাগরে স্বর্ণত্রিশূল, রৌপ্যের সদাশিব প্রতিমা, স্বর্ণের চণ্ডিকা ও গণেশ প্রতিমা এবং এই প্রতিমা দুটির স্বৰ্ণপীঠ নির্মাণ; চন্দ্র প্রতিমা, রৌপ্যের সূর্য প্রতিমা, শিবের স্বর্ণপ্রতিমা এবং নবগ্রহের জন্য স্বর্ণপদ্ম নির্মাণ, শৈবসাধুদের জন্য মঠ প্রতিষ্ঠা, একটি মঠ নির্মাণ ও তন্মধ্যে বৈকুণ্ঠ বিষ্ণু প্রতিমা প্রতিষ্ঠা; এবং পিঙ্গালার্য নামী জগন্মাতার মন্দিরে চুড়া এবং সরোবর নির্মাণ।
