কল্যাণচন্দ্রের পুত্র ছিলেন পরামসৌগত পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ লড়হচন্দ্ৰ (নামটি যে দেশজ, সন্দেহ নেই)। বস্তুত শ্ৰীচন্দ্রের কাল থেকেই চন্দ্ৰবংশীয় প্রত্যেকটি রাজার এই একই ঔপধিক-পরিচয়। লড়হচন্দ্ৰ বোধ হয় একাধিকবার বারাণসী এবং প্রয়াগে গিয়াছিলেন। ধর্মাচরণোদ্দেশ্যে। তিনি পট্রিকেরকে একটি বিষ্ণুমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেই মন্দির স্বনামের সঙ্গে যুক্ত করে লড়হমাধব-ভট্টারক নামে এক বিষ্ণুমূর্তি স্থাপন করেছিলেন।
লড়হচন্দ্রের (আ. ১০০০—-১৫ খ্ৰীষ্টাব্দে) পর তঁর পুত্ৰ গোবিন্দচন্দ্র (আ. ১০১৫-৪৫ খ্ৰীষ্টাব্দ) রাজসিংহাসন অধিকার করেন। তিনি শিব-ভট্টারকের নাম করে নটেশ্বর-ভট্টারকের (নৃত্যপর শিবের) উদ্দেশ্যে পেরনাটন-বিষয়ে (পৌণ্ডবর্ধনভূক্তির সমতটমণ্ডলে) সাহরতলাক গ্রামে দুই পাটক ভূমি দান করেছিলেন। এই গোবিন্দচন্দ্ৰই বোধ হয়। চন্দ্রবংশের শেষ রাজা, এবং ইনিই বোধ হয়। বঙ্গালদেশের সেই গোবিন্দচন্দ্র যিনি চোল-সম্রাট রাজেন্দ্ৰ চোলের কাছে পরাজিত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। বোধহয় ইনিই মধ্যযুগীয় ময়নামতীর গানের রাজা গোবিন্দচন্দ্র। কিন্তু চন্দ্ৰবংশের পতন বোধ হয় রাজেন্দ্ৰ চোলের বঙ্গালদেশ বিজয়ের জন্য নয়, কারণ রাজেন্দ্ৰচোল পূর্বভারতে রাজত্ব বিস্তার করতে আসেননি; তঁর অভিযান সাময়িক দিগ্বিজয়াভিযান ছিল মাত্র। মনে হয়, চন্দ্রবংশের পতন হয়েছিল কলচুরীরাজ কর্ণের বঙ্গবিজয়াভিযানের ফলে। কৰ্ণ দাবি করেছেন, তিনি পূর্বদেশের রাজাকে এক বিষম যুদ্ধে পরাজিত ও পর্যুদস্ত করেছিলেন। এই রাজা গোবিন্দচন্দ্র হওয়াই সম্ভব। যাই হোক, এর পর চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের কথা আর শোনা যাচ্ছে না।
আত্মপরিচয় বর্ণনায় এই রাজ্যবংশের সকলেই, বোধ হয়। সুবর্ণচন্দ্রের সময় থেকেই অন্তত শ্ৰীচন্দ্রের সময় থেকেই তো-বটেই, পরামসৌগত অর্থাৎ বৌদ্ধধর্মানুগত। পট্টোলীগুলি সমস্তই বৌদ্ধ ধৰ্মচক্রলাঞ্ছিত। কিন্তু লড়হচন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্র সম্বন্ধে তাদের বৌদ্ধ—ধর্মানুগত্যের পরিচয় অত্যন্ত শিথিল, বোধহয় পরম্পরা রক্ষা মাত্র। লড়হচন্দ্ৰ তো স্পষ্টতই বৈষ্ণবধর্মানুরক্ত ছিলেন। তিনি ভূমিদান করেছেন বাসুদেব-ভট্টারককে প্ৰণাম জানিয়ে, লড়হমাধবভট্টািরক নামে এফ বিষ্ণু-কৃষ্ণের প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং তার উদ্দেশ্যে ভূমিদান করেছেন, প্রয়াগ-বারাণসী গেছেন ধর্মাচরণোদ্দেশ্যে। তার পট্টোলী দুটির বক্তব্য ব্রাহ্মণ্য পৌরাণিক দেবদেবী, পৌরাণিক স্মৃতিকথা ও কাহিনী, এবং পৌরাণিক বাতাবরণে আচ্ছন্ন। বারাণসী তীর্থ-প্রসঙ্গে বুদ্ধদেবের উল্লেখও নেই, আছে। শিব, পার্বতী ও ব্ৰহ্মার। গোবিন্দ চন্দ্রের পট্টোলীর বক্তব্যও তাই। তিনি ছিলেন শিবধর্মানুরক্ত; তিনি ভূমিদান করেছেন শিবভট্টারককে প্ৰণাম জানিয়ে নট্টেশ্বর ভট্টারক অর্থাৎ নৃত্যপর শিব দেবতার উদ্দেশ্যে। এই দুই নৃপতির কোনও পট্টোলীর বিষবস্তুতেই কোথাও বৌদ্ধধর্মানুগত্যের কোনও পরিচয় নেই, একমাত্র ‘পরমাসৌগত পরিচয় ও ধর্মচক্রলাঞ্ছনটি ছাড়া। কালটি একাদশ শতকের প্রথমার্ধ বা মধ্যপদ। পূর্ব-ভারতের পূর্বাঞ্চলে ধর্ম ও সমাজের বাতাস কোনদিকে বইছে, বৌদ্ধধর্মের বাতাবরণ ক্রমশ কী ভাবে শিথিল হয়ে পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্যধর্মের অনুকূলে বইতে আরম্ভ করেছে, লড়হচন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্রর পট্টোলীগুলি তার ইঙ্গিত বহন করছে। এ-সম্বন্ধে মূলগ্রন্থে ত্ৰিশ বৎসর আগে যা বলেছিলাম নবাবিষ্কৃত পট্টোলীগুলিতে তার সুস্পষ্ট সমর্থন পাওয়া গেল।
এই পরিশিষ্টের [সংযোজিত] রাজবৃত্ত অধ্যায়ে লামা তারনাথের চন্দ্ৰবংশ কাহিনী অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পাল-পূর্ব কালে প্রাচীন বাংলায় চন্দ্রান্ত্যিনাম রাজাদের একটি সুদীর্ঘ রাজবংশের রাজত্বের কথা তারনাথ তার বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে লিখে রেখে গেছেন। তারনাথের এই সাক্ষ্যের যে কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, সে কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। তবে, প্রাচীন বাংলা-সংলগ্ন আরাকানে চন্দ্ৰান্তনামা রাজাদের এক সুদীর্ঘ রাজবংশের ইতিহাসের সঙ্গে ঐতিহাসিকদের পরিচয় অনেকদিনের। সে-ইতিহাস তদানীন্তন আরাকান রাজধানী বেসলী বা বৈশালীর প্রত্নসাক্ষ্যে এবং মধ্য-বর্মর পগান রাজবংশের পুরাণ কাহিনীতে সমর্থিত। আরাকানের চন্দ্ৰবংশীয় রাজা আনন্দ চন্দ্রের (অক্ষর-সংক্ষে। আনুমানিক ৭৩০ খ্ৰীষ্টাব্দ) একটি সুদীর্ঘ প্রশস্তি-শিলালেখ পাওয়া গেছে, বৈশালী সংলগ্ন সিখাউংর একটি স্তম্ভগাত্রে। এই প্রশস্তিতে আনন্দ চন্দ্রের উধ্বতন চব্বিশ পুরুষের উল্লেখ আছে এবং একুশ জন রাজার নাম দেওয়া আছে। অর্থাৎ, আনুমানিক চতুর্থ খ্ৰীষ্টীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনও সময় এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকবে। এ-অনুমান বোধ হয় করা যেতে পারে যে, তারনাথ এই রাজবংশের সঙ্গে বঙ্গ-বঙ্গালের চন্দ্ৰবংশের কাহিনী গুলিয়ে ফেলেছিলেন।
যাই হোক, কেউ কেউ মনে করেন, আরাকানের এই চন্দ্রবংশের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের চন্দ্ৰবংশের একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। মনে করবার কারণও আছে। আরাকানের চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের প্রচুর ধাতুমুদ্রা পাওয়া গেছে; শঙ্খ বৃষ, অংকুশ, চামর, শ্ৰীবৎস্যচিহ্ন প্রভৃতি লাঞ্ছিত এই মুদ্রগুলির সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের মুদ্রার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। আরাকানের প্রাচীন রাজধানীর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এমন অনেক প্রতিমা পাওয়া গেছে যার সঙ্গে লালমাই-ময়নামতীর নবাবিষ্কৃত প্রতিমা-সংক্ষ্যের সম্বন্ধও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের। তাছাড়া, বর্মী হমন্নানয়াজাবিন (Hmannan Yazawin)—গ্রন্থে আছে, পাগান রাজ আনাউরহথা (১০৪৪-১০৭৭ খ্ৰীষ্টাব্দ) উত্তর আরাকান জয় ও অধিকার করেন, যার ফলে তার রাজ্যের পশ্চিম সীমা পট্টিকের পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আন্নাউরহথার পুত্র, চ্যানজিথার এক কন্যা পট্টিকেরার এক রাজপুত্রের প্রতি প্রেমাসক্ত হন, কিন্তু এ-প্রেম পরিণয়ে পরিণতি লাভ করেনি। এক পুরুষ পরে এই বঞ্চিত নারীরই পুত্র রাজা অলৌঙসিথু (১১১২-১১৬৭ খ্ৰীষ্টাব্দ) পট্টিকেরার এক রাজকন্যাকে বিয়ে করেন। অলৌঙসিথুর মৃত্যুর পর, তারই পুত্র রাজা নরথু বিধবা বিমাতাকে হত্যা করেন। বিধবা কন্যার নৃশংস হত্যার খবর পেয়ে পট্টিকের-রাজ ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে আটটি যোদ্ধাকে পাঠান এই হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য। পগানে পৌঁছে রাজাকে আশীবাদ করবার ছল করে তঁরা রাজপ্রাসাদে ঢুকে রাজাকে হত্যা করেন এবং নিজেরাও নিহত হন, অথবা আত্মহত্যা করে মৃত্যুবরণ করেন। এ-কাহিনী অবিশ্বাস করবার আমি কোনও কারণ দেখিলে। অন্তত পট্টিকেরা রাজ্যের সঙ্গে যে পাগান রাজবংশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, এ সম্বন্ধে তো সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না।
