বঙ্গে-বঙ্গালে চন্দ্ৰাধিপত্যু
এ-সম্বন্ধে এ-গ্রেন্থের পূর্ববর্তী সংস্করণে যা লেখা ও ছাপা হয়েছিল তার প্রায় সবটাই নূতন করে লিখবার প্রয়োজন হয়েছে। গত পঁচিশ বৎসরের নূতন আবিষ্কার সবচেয়ে বেশি আলোকিত করেছে। এই বিষয়টিকে, বিশেষভাবে লালমাই-ময়নামতী পাহাড়ের উৎখননের ফলে। শ্ৰীহট্ট জেলার পশ্চিমভাগ গ্রামে তার রাজত্বের পঞ্চম বৎসরে পট্টীকৃত রাজা শ্ৰীচন্দ্রের একটি তাম্রশাসন পাওয়া গেছে। আর, তিনটি তাম্রপট্টোলী পাওয়া গেছে ময়নামতী পাহাড়ের চারপত্ৰমুড়া অঞ্চলের উৎখনন থেকে; এই তিনটির প্রথম ও দ্বিতীয় পট্টোলীটি জনৈক চন্দ্রাস্ত্যনামা রাজা লড়হচন্দ্রের নামাঙ্কিত এবং তৃতীয়টি একই চন্দ্রাস্ত্য রাজা গোবিন্দ চন্দ্রের নামাঙ্কিত। চতুর্থ একটি পট্টোলীও একই উৎখনন থেকে পাওয়া গেছে, জনৈক রাজা শ্ৰীবীরধর দেব বিষ্ণুচক্রলাঞ্ছিত এই পট্টোলীদ্বারা ১৭ পদ ভূমি দান করেছিলেন। পট্টোলীটির অক্ষর-সংক্ষ্যে মনে হয়, বীর্যধরদেব একাদশ-দ্বাদশ শতকের কোনও সময়ে সমতটমণ্ডলের ময়নামতী অঞ্চলে কোথাও রাজত্ব করতেন। কিন্তু তার বংশ-পরিচয় কী, সমতটমগুলেশ্বর চন্দ্রাস্ত্যনাম রাজা শ্ৰীচন্দ্রের বংশধরদের সঙ্গে তার কোনও আত্মীয়তা ছিল কি না, এ-সম্বন্ধে অন্য কোনও তথ্যই জানা যায় না।
যাই হোক, পূর্বোক্ত রাজা শ্ৰীচন্দ্ৰ, লড়হচন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্রের পট্টোলী চারিটিতে দক্ষিণ-পূর্ব বাঙলার দশম-একাদশ শতকের চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের সম্বন্ধে অনেক নূতন খবর জানা যাচ্ছে। এই রাজাদের বেশ কয়েকটি পট্টোলীর খবর আগেও আমাদের জানা ছিল, কিন্তু নূতন আবিষ্কারের ফলে শুধু রাজবৃত্ত ব্যাপারে নয়, সাংস্কৃতিক ব্যাপারেও নূতন আলোকপাত ঘটেছে। যথাস্থানে তা উল্লেখ করা হবে।
এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রোহিত্যাগরি চন্দ্ৰবংশীয় জনৈক পূৰ্ণচন্দ্র। দীনেশচন্দ্ৰ সরকার মনে করেন, এই রোহিতাগিরি বিহারান্তর্গত বর্তমান শাহাবাদ জেলার রাইটাসগড়। নলিনীকান্ত ভট্টশালী মনে করতেন, এবং আমিও মনে করি, রোহিতাগিরি লালমাই (লালমাটি-রক্তমৃত্তিকা) শব্দটিরই সংস্কৃত রূপমাত্র মাত্র, এবং চন্দ্ৰবংশীয় রাজারা এই লালমাই-ময়নামতী অঞ্চলেরই অধিবাসী ছিলেন। যাই হোক স্বাধীন নরপতি না হলেও পূৰ্ণচন্দ্র যে একজন স্থানীয় প্রতাপশালী প্রধান ছিলেন, এমন অনুমানে কোনও বাধা নেই।
পূৰ্ণচন্দ্রের পুত্র সুবর্ণচন্দ্ৰই বোধ হয়। এ-বংশের প্রথম পুরুষ যিনি বৌদ্ধ ধর্মের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন, কিন্তু এ-বংশের প্রথম স্বাধীন নরপতি ছিলেন সুবর্ণচন্দ্রের পুত্র পরামসৌগত পরামমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ ত্ৰৈলোক্যচন্দ্ৰ (এই দীর্ঘ পরিচয়টি শুধু পশ্চিমভােগ পট্টোলীতেই পাওয়া যায়; পরবর্তী অন্যান্য পট্টোলীতে তিনি শুধু মহারাজাধিরাজ মাত্র)। ত্ৰৈলোক্যচন্দ্ৰ নানাদিকে তার সামরিক প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট ছিলেন। হরিকেল (শ্ৰীহট্ট) অঞ্চল যে তীর প্রভুত্ব স্বীকার করতো, সে-খবর আগেই জানা ছিল। এখন জানা যাচ্ছে, তিনি সমতটও (কুমিল্লা-শ্ৰীহট্ট-নোয়াখালি) আঁর অধিকারে এনেছিলেন। তখন সমতটের রাজধানী ছিল ক্ষীরোদানদী (কুমিল্লা শহরোপান্তে গোমতী নদীর শাখা খিরা বা খিরনাই নদী)-তীরবর্তী দেবপৰ্বত, যে দেবপর্বত ছিল দেববংশীয় রাজা ভবদেবের এবং বোধ হয় রাজা কান্তিদেবেরও রাজধানী। দেবপর্বতের অবস্থিতি ছিল। লালমাই—ময়নামতী পাহাড়ের উপরই। ত্ৰৈলোক্যচন্দ্রের কিছু আগে কাম্বোজ (কোচ বংশীয়?) রাজাদের হাতে দেবপর্বত বিধ্বস্ত হয়েছিল, এমন একটি ইঙ্গিত শ্ৰীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ পট্টোলীতে পাওয়া যায়। তার রাজধানী ছিল বঙ্গে, চন্দ্ৰদ্বীপে।
হয় ত্ৰৈলোক্যচন্দ্র নিজেই, অথবা তার পুত্র পরামসৌগত পরমেশ্বর পরমভট্টািরক মহারাজাধিরাজ শ্ৰীচন্দ্ৰ তার রাজত্বের (৯২৫-৯৭৫ খ্ৰীষ্টাব্দে) পঞ্চম বৎসরের আগে কোনও একসময় চন্দ্ৰদ্বীপ থেকে বঙ্গের বিক্রমপুরে তঁদের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। শ্ৰীচন্দ্রের নামাঙ্কিত পট্টোলীগুলি থেকে তার রাজ্যের বিস্তৃতি সম্বন্ধে একটা ধারণা করা কঠিন নয়। চন্দ্ৰদ্বীপ, বিক্রমপুর, হরিকেল প্রভৃতি অঞ্চল তো চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের করতলগত ছিলই। এখন পশ্চিমভাগ পট্টোলী থেকে জানা যাচ্ছে, পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির সমতটমণ্ডলের শ্ৰীহট্ট অঞ্চলও এই রাজ্যভুক্ত ছিল। ইদিলপুর পট্টোলী থেকে আগেই জানা ছিল, ফরিদপুর অঞ্চলও চন্দ্রদের আধিপত্য স্বীকার করতো। অর্থাৎ, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গদেশ জুড়ে (ঢাকা, ফরিদপুর, ত্রিপুরা, নোয়াখালি, শ্ৰীহট্ট) চন্দ্ররাজ্য বিস্তৃত ছিল। পশ্চিমভাগ লিপি-সংক্ষ্যে মনে হয়, শ্ৰীচন্দ্ৰ লোহিত্য-বিধৌত কামরূপে একটি বিজয়াভিযান পাঠিয়েছিলেন এবং গৌড়দের পরাজিত করেছিলেন। (লড়হচন্দ্রের ১ম ময়নামতী লিপি)। তবে, শ্ৰীচন্দ্রের সবচেয়ে মহৎকীর্তি শ্ৰীহট্ট অঞ্চলে একটি বিরাট দেবস্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পত্তন, যার বিস্তৃত বিবরণ জানা যায় নবাবিষ্কৃত পশ্চিমভােগ পট্টোলীতে। ধর্মকর্ম-অধ্যায়ের সংযোজন]াসে বিবরণ পাওয়া যাবে। শ্ৰীচন্দ্রের পুত্র কল্যাণচন্দ্রের (আ. ৯৭৫-১০০০ খ্ৰীষ্টাব্দ) সম্বন্ধে বলা হয়েছে, তিনি লৌহিত্যতীরে স্নেচ্ছদের এবং গৌড়দের অপমানিত করেছিলেন। মনে হয়। এই দাবি তার একান্ত নিজস্ব একক দাবি নয়। হয়তো তিনি পিতা শ্ৰীচন্দ্রের সঙ্গে তার কামরূপ-প্ৰাগজ্যোতিষ ও গৌড় বিজয়াভিযানে যোগ দিয়েছিলেন; এই দাবি সেই ইঙ্গিত বহন করছে মাত্র। কিন্তু এই স্লেচ্ছারা কারা? গৌড়রাজ বলতেই বা কার প্রতি ইঙ্গিত করা হচ্ছে? কেউ কেউ মনে করেন, ম্লেচ্ছ বলতে কামরূপের শালস্তম্ভবংশীয় রাজাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হচ্ছে। কিন্তু এ-ও তো হতে পারে, এই ম্লেচ্ছ শব্দটি মেচু এই কৌম নামেরই সংস্কৃতিকরণ, যেমন দীনেশচন্দ্রের মতো আমারও ধারণা কাম্বোজ শব্দটি কোচ কৌমানামেরই সংস্কৃতিকরণ। আর, গৌড়দের অধিপতি এই দশম-একাদশ শতাব্দীতে তো সুপরিচিত পালবংশী রাজাদের কেউ ছিলেন না, কারণ এই সময় গৌড় তাদের হস্তচু্যত হয়ে চলে গিয়েছিল কম্বোজবংশীয় পালরাজাদের স্থাতে। ধর্মপাল-দেবপালের বংশধরদের রাজত্ব তখন পূর্ব ও দক্ষিণ বিহারে সীমিত।
