“পূর্বাঞ্চলের পাচটি প্রদেশে, অর্থাৎ ভঙ্গল, ওড়িবিস ও অন্যান্য তিনটিতে প্রত্যেক ক্ষত্রিয়, অভিজাত, ব্রাহ্মণ এবং বৈশ্য, সকলেই নিজ নিজ গৃহে এবং প্রতিবাসীদের মধ্যে বুজাবু মুক্ত ব্যবহার করতেন, সমগ্র দেশের উপর আধিপত্য করবার মতন রাজা কেউ ছিল না।“
স্পষ্টতই তারনাথ প্রায় আটশত বছর পর শোনা কথার, পরম্পরাগত মৌখিক ইতিহাসের উপর নির্ভর করেছিলেন, কারণ, পালপর্বের আগে চন্দ্ৰান্ত্যনামা রাজাদের কোনও রাজবংশের কোনও সাক্ষ্য এ-যাবৎ পাওয়া যায়নি, না প্রত্নসাক্ষ্যে না অন্য কোনো সাহিত্য-সাক্ষ্যে। এ-তথ্য যথার্থ যে, পালপর্বে, দশম-একাদশ শতকের বঙ্গ-বঙ্গালে বেশ কোনও বংশব্যাপী চন্দ্ৰান্ত্যনামা রাজাদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, এবং তঁদের সম্বন্ধে গত পঁচিশ বছরের ভেতর আরও অনেক নূতন তথ্য আমরা জেনেছি (সে-কথা বলা হবে একটু পরেই)। এমন হতে পারে, তারনাথ এই চন্দ্ৰান্ত্যনামা রাজাদের সঙ্গে তার নিজের শোনা বা পড়া কাহিনী গুলিয়ে ফেলেছিলেন; সন-তারিখের বা দেশ-কাল-পাত্রের হিসেবটা তিনি গ্রাহ্য করেন নি। মন্ত্রতন্ত্রবিশ্বাসী, আধিভৌতিক ক্রিয়াকর্মে বিশ্বাসী বৌদ্ধ লামার তা করবার কথাও নয়। পালপর্বের ইতিহাস সম্বন্ধেও তিনি যা লিখে রেখে গেছেন, সে-সম্বন্ধেও একই মন্তব্য প্রযোজ্য। সেখানেও ইতিহাস, গালগল্প, কথাকাহিনীর অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
পালায়ন
(প্রথম) শূরপাল (আ ৮৪৭-৬০ খ্ৰীষ্টাব্দে) পূর্ববর্তী সংস্করণে বলা হয়েছিল, দেবপালের পর পাল-সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন (প্রথম) বিগ্রহপাল, এবং শূরপাল ও বিগ্রহপাল ছিলেন একই ব্যক্তি, অর্থাৎ শূন্নপাল ছিল বিগ্রহপালের অন্য আর একটি নাম। শুধু তা-ই নয়, অনুমান করা হয়েছিল, বিগ্রহপালের পিতা ছিলেন দেবপালের সমরনায়ক বাকপাল। ইতিমধ্যে উত্তরপ্রদেশের মীর্জাপুর জেলার কোনও এক স্থানে শূত্নপালের একখানি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে; এই শাসনের সাক্ষানুসারে সদ্যোক্ত তিনটি তথ্যই অযথাৰ্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই সাক্ষ্য থেকে এখন জানা যাচ্ছে, দেবপালের পর সম্রাট হয়েছিলেন তারই পুত্র শূরপাল, এবং তিনি, রাজেন্নাগ্রামে প্রাপ্ত একটি প্রতিমা লেখ-সক্ষ্যে, অন্তত পাঁচ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন; আনুমানিক ৮৪৭ থেকে ৮৬০ পর্যন্ত তার রাজত্বকাল বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। শূরপালের পর সম্রাট হয়েছিলেন (প্রথম) বিগ্ৰহপাল; তিনি ছিলেন ধর্মপালের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বাকপালের পৌত্র এবং জয়পালের পুত্র। এমন হতে পারে, কোনও কারণে বিগ্রহপাল শূরপালকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজে সম্রাট হয়েছিলেন, কিন্তু যে-কারণেই হোক, তার পক্ষে বেশিদিন রাজত্ব করা সম্ভবপর হয়নি, কারণ তার পুত্ৰ নারায়ণপাল যে আ. ৮৬০ থেকে ৯১৭ খ্ৰীষ্টাব্দ পর্যন্ত, প্রায় ৫৬/ ৫৭ বৎসর, রাজত্ব করেছিলেন তার লিপিসাক্ষ্য বিদ্যমান। বিগ্রহপাল (আ. ৮৫৭-৮৬০) তার পুত্ৰ নারায়ণপালের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে বানপ্রস্থ অবলম্বন করেছিলেন, কেন, তা জানিবার কোনো উপায় নেই।
শূরপালের এই শাসনটি থেকে জানা যাচ্ছে ১. তার পিতা দেবপাল নেপালরাজকে পরাজিত করেছিলেন এবং ২. সুবর্ণদ্বীপের অধিপতি দেবপালের চরণে প্রণত হয়েছিলেন। নেপালের সঙ্গে যে দেবপালের পিতা ধর্মপালের কিছু সংঘর্ষ হয়েছিল এবং ধর্মপাল সেই সংঘর্ষে জয়ী হয়েছিলেন সে-ইঙ্গিত মূল গ্রন্থমধ্যেই আছে। এ-সময়ে নেপাল ছিল। তিব্বতের অধীনে। অসম্ভব নয় যে, দেবপালের সঙ্গেও নেপালের কিছু সংঘর্ষ হয়েছিল, এবং এই নেপালীরা ছিল ভোট-ব্রহ্মীয় কম্বোজ কোমের লোক। সুবর্ণদ্বীপাধিপতির প্রণতির উল্লেখ নিঃসন্দেহে দেবপালের নালন্দা তাম্রশাসনোক্ত শৈলেন্দ্ৰবংশীয় শ্ৰীবিজয়াধিপতি (সুমাত্ৰা-মালয় উপদ্বীপ) বালপুত্রদেবের প্রতি ইঙ্গিত। দেবপালের অনুমতিক্রমে বালপুত্রদেব নালন্দায় একটি বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করিয়েছিলেন। তারই অনুরোধে দেবপাল এই বিহারের পরিপোষণের জন্য পাঁচটি গ্রাম দান করেছিলেন। শূরপালের তাম্রশাসনের ইঙ্গিত এই ঐতিহাসিক তথ্যটির প্রতি। গ্রন্থের পূর্ববর্তী সংস্করণে দেবপাল-প্রসঙ্গে এই মূল্যবান তথ্যটি উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিলাম; এই সুযোগে সে-অপরাধ স্বীকার করছি।
শূরপালের এই তাম্রশাসন থেকে জানা যাচ্ছে যে, তিনি তঁর মাতা, অর্থাৎ দেবপাল-মহিষীর নির্দেশে শ্ৰীনগরভুক্তিতে, অর্থাৎ পাটনা অঞ্চলে, চারটি গ্রাম দান করেছিলেন, দুটি বারাণসীতে রাজমাতা-প্রতিষ্ঠিত একটি শিবলিঙ্গ-মন্দিরের উদ্দেশ্যে এবং অন্য দুটি রাজমাতারই শ্রদ্ধার পাত্র শৈবাচার্যদের পরিপোষণের জন্য।
পাঠ-পঞ্জি৷ দীনেশচন্দ্র সরকার “প্রথম শূরপালের তাম্রশাসন”, সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা, ১৩৮৩, ৮৩ বৰ্ষ, ১২ সংখ্যা, ৪০-৪৩
রাঢ়া-গৌড়ে কম্বোজাধিপত্য
এই কম্বোজরা পূর্বদক্ষিণ ভারতের (Camobodia-Laos-Vietnam) কম্বুজ হওয়া একেবারেই সম্ভব নয়, যেহেতু কম্বোজ ও কম্বুজ দুই এক শব্দই নয় (কন্তু = শঙ্খ, কম্বুজ = শঙ্খজাত, অর্থাৎ সমুদ্রের সঙ্গে তাদের সম্বন্ধ) { উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের গন্ধার-কুটুম্ব কম্বোজদের সঙ্গেও রাঢ়া-গৌড়ের কম্বোজাদের কোনও সম্বন্ধ ছিল বলে মনে হয় না। আমার ধারণা, আমাদের এই কম্বোজরা “পাগ সাম-জোন-জাং”-গ্রন্থের কম-পো-ৰেস বা কম্বোজ, এবং এদেরই বংশধর বর্তমান উত্তর-বাংলার কোচেরা।
