গৌড়াধিপ শশাঙ্ক ৷ সপ্তম শতক
বছর দেড় দুই আগে মেদিনীপুর জেলার এগরা থানায় এগরা গ্রামে শশাঙ্কের রাজত্বকালীন একটি তাম্রশাসন পাওয়া গিয়েছে। শাসনটিতে শশাঙ্কের রাজ্যসংবৎসরের তারিখ উল্লিখিত নেই। বিশেষ কিছু নূতন খবরও নেই যা সমসাময়িক অন্যান্য লিপি থেকে জানা যায় না। তবে, শাসনে বিষয়াধিকরণান্তর্গত অনেকগুলি গ্রামের উল্লেখ আছে; তার ভেতর অস্তুত চারটি অগ্রহার-গ্রাম। শাসনানুসারে কার্পাসপত্রক নামক একটি গ্রামে জনৈক ব্ৰাহ্মণকে ১০০ দ্রোণবাপ ভূমি দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল; প্রতি দ্রোণের মূল্য ধার্য হয়েছিল চারপণ কড়ি হিসেবে, ১০০ দ্রোণবাপের জন্য ৪০০ পণ কড়ি। লক্ষণীয় এই যে, সপ্তম শতকের প্রথমার্ধেই ভূমির মূল্য নির্ধারিত ও প্রদত্ত হচ্ছে কড়িতে, দীনারে নয়, দ্রহ্মেও নয়।
শাসনটি এখনও অপ্রকাশিত, তবে অধ্যাপক শ্ৰীদীনেশচন্দ্র সরকার। এটির পাঠোদ্ধার, অনুবাদ ও সম্পাদনা শেষ করেছেন, এবং রচনাটি প্রকাশোনূখ। র্তার একান্ত সহৃদয় আনুকূল্যেই সম্ভব হলো সদ্যোক্ত সংযোজনটি। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।
একটি নূতন রাজবংশ ৷ দেববংশ (আ. ৭৫০ খ্ৰীষ্টাব্দ)
সপ্তম শতাব্দীতে বিভিন্ন সময়ে সমতটমণ্ডলের বিভিন্ন স্থানে অন্তত তিনটি ছোট বড় রাজবংশের আধিপত্য ছিল। তারা কেউ ছিলেন সামন্ত, কেউ বা স্বাধীন নরপতিত্বও দাবি করেছেন। খড়্গ বংশ, লোকনাথের বংশ এবং রাতবংশ ছাড়া ইতিমধ্যে এই সমতটমণ্ডলেরই শ্ৰীহট্ট অঞ্চলে আর এক সামন্ত শ্ৰীমুরগুনাথের সন্ধান পাওয়া গেছে; তার কথা এই পরিশিষ্টে একটু আগেই বলা হয়েছে। এই শতাব্দীতে এবং এই সময় থেকে প্রাচীন বাঙলার সামাজিক কাঠামোটি যেন মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে: সে-কাঠামোটিতে সামগ্ৰস্তুতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান প্রচলন ও প্রসার যেন সুস্পষ্ট। এ-তথ্য উল্লেখযোগ্য যে সমতটমণ্ডলভুক্ত শ্ৰীহট্ট অঞ্চলের সামন্ত মুরগুনাথের পিতৃপরিচয় ‘সামস্ত সৈন্যপতি’ হিসেবে। সামন্তদের সৈন্যদল গঠন ও পোষণ করতে হতো। এ—তথ্যের ইঙ্গিত যেন এই পদবীটিতে স্পষ্ট। যুদ্ধের সময় অধীশ্বর মহারাজাধিরাজকে সৈন্য-সাহায্য দেবার প্রতিশ্রুতিও কি ছিল? যদি তা থেকে থাকে তাহলে তো সামন্ত-সমাজবিন্যাস (যুরোপীয় feudalism অর্থে নয়) আর অস্বীকার করবার উপায় থাকে না।
যাই হোক, ঠিক সপ্তম শতাব্দীতে নয়, কিন্তু অক্ষর-স্যাক্ষ্যে মনে হয়, শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনও সময় এই সমতটমণ্ডলেই পতিকের (=পট্টিকের, কুমিল্লা শহরের অদূরবতী ময়নামতী) অঞ্চলে আর একটি নূতন রাজবংশের খবর ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। এই রাজবংশের রাজা ভবদেবী ছিলেন পরামসৌগত (অর্থাৎ বুদ্ধদেবভক্ত) এবং তিনি ছিলেন পরমভট্টারক ও মহারাজাধিরাজ। আমার ধারণা, এই রাজবংশ মৎস্যন্যায়-পর্বেরই অন্যতম সংকেত, অনেক সংকেতের মধ্যে একটি। এই দারুণ রাষ্ট্ৰীয় দুর্যোগের সময় ক্ষুদ্র কোনও অঞ্চলের অধিপতিও স্বাধীন সার্বভৌম মহারাজাধিরাজের পদবী দাবি করবেন, এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
লালমাই (লালমাটি) পূর্ব বাংলার পুরাভূমির একটি অংশ; এই অংশে, কুমিল্লা শহর থেকে পাঁচ-ছয় মাইল দূরে, ময়নামতীর নাতিউচ্চ পাহাড়; উত্তর-দক্ষিণে প্রায় দশ-এগারো মাইল তার বিস্তার। এরই একটি অংশে, শালবনে ঢাকা বিস্তৃত একটি উচু ঢিবিতে, গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়, যুদ্ধেরই প্রয়োজনে মাটি খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়লো এক বৌদ্ধ মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ, দু’টি স্থানীয় রাষ্ট্ৰাধিপতি, আনন্দদেব ও ভবদেবের নামাঙ্কিত দু’টি তাম্রশাসন, “ভবদেবী-মহাবিহার” মুদ্রিত একটি লাল বেলে পাথরের শীলমোহর, এবং সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু রৌপ্যমুদ্রা যাতে মুদ্রিত আছে ‘পতিকের’ শব্দটি। সন্দেহ নেই, পতিকের, পটিকেরা, পট্টিকেরা, পট্টিকেরক, পাইটকেরা সমস্তই সমার্থক। একটি নূতন স্থানীয় রাজবংশ এই ভাবে বাঙালীর ইতিহাসে সংযোজিত হলো।
দু’টি তাম্রশাসনই পাওয়া গেছে বেশ ক্ষতাবস্থায়, এবং একটিরও পাঠ এ-পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। তবে, পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ ভবদেবের শাসনটির মোটামুটি একটি বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। (Journal of the Asiatic Society, Letters, Wol XVI, 1957, p.83 ff, and plates)। এই বিবরণ থেকে জানা যায়, ভবদেবের পিতা ছিলেন আনন্দদেব এবং পিতামহের নাম ছিল বীরদেব। ভবদেবের আর একটি নাম ছিল অভিনব মৃগাঙ্ক। ভবদেবের প্রধান কীর্তি তার নিজের নামে “ভবদেবী-মহাবিহার” প্রতিষ্ঠা; শালবনপুরে এই বিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে বলে স্থানীয় জনসাধারণের কাছে এই বিহার শালবনবিহার বলে পরিচিত। ভবদেব সমগ্র সমতটমণ্ডলের অধীশ্বর ছিলেন। কিনা বলাকঠিন, কিন্তু রাজ্যের পরিধি যে বেশ বিস্তুত ছিল, তা অনুমান করা চলে। তাঁর রাজধানী ছিল চণ্ডীমূড়া পাহাড়ের উপর দেবপর্বত নগরে; চণ্ডীমুড়া পাহাড় ময়নামতী শৈলশ্রেণীর প্রায় দক্ষিণতম প্রান্তে।
লামা তারনাথের “চন্দ্ৰ’ বংশ কাহিনী
ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর তিব্বতী ঐতিহাসিক বৌদ্ধ লামা তারনাথ (জন্ম ১৫৭৩ খ্ৰীষ্টাব্দ) তার বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস-গ্রন্থে (১৬০৮ খ্ৰীষ্টাব্দ) বলেছেন, ভঙ্গল (বঙ্গল দেশ, সাধারণভাবে পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গ) দেশে পাল-সম্রাটদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আগে এই দেশ চন্দ্ৰান্তনামা রাজাদের এক রাজবংশের অধীন ছিল। তিনি এই রাজাদের অনেকের নামোল্লেখ করেছেন, অনেকের কীর্তিকাহিনীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও কিছু দিয়েছেন। তার মতে, গোবিন্দচন্দ্র ও ললিতচন্দ্র এই বংশের শেষ দুই রাজা, এবং তারপরই এই দেশে নৈরাজ্য। তখন–
