একদিকে উত্তর-ভারতের অধিকাংশ যখন মুসলমানদের করতলগত, উত্তর-গাঙ্গেয় ভারতে, অর্থাৎ বর্তমান যুক্তপ্রদেশ [উত্তর প্রদেশ] ও বিহারে যখন রাষ্ট্ৰীয় অবস্থা প্রায় নৈরাজ্য বলিলেই চলে, তখন বাঙলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ভেদবুদ্ধিদ্বারা আচ্ছন্ন, স্তরে উপস্তরে দুর্লঙ্ঘ্য সীমায় বিভক্ত; রাজসভা চরিত্র ও আত্মশক্তিহীন; ধর্ম ও সমাজ বিলাসালালসায় ও যৌনাতিশয্যে পীড়িত; শিল্প ও সাহিত্য বস্তুসম্বন্ধবিচু্যত ভাবকল্পনার জগতে পল্লবিত বাক্য, উচ্ছসময় অত্যুক্তি, আলংকারিক আতিশয্য এবং দেহগত লীলাবিলাসে ভারগ্রস্ত ও মন্দির; জনসাধারণের দেহ,মন বৌদ্ধ বজ্ৰযান-সহজযান প্রভৃতির এবং তান্ত্রিক সিদ্ধাচার্য-ডাকিনী-যোগিনীদের অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড তুকতাকে পঙ্গু; উচ্চতর বর্ণসমাজ ব্রাহ্মণ্য পুরোহিততন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ্য রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্বে আড়ষ্ট। রাষ্ট্ৰীয় ও সামাজিক অধোগতির চিত্র সম্পূৰ্ণ; উভয় চরিত্রে ও আত্মশক্তিতে দুর্বল ও দৈন্যপীড়িত। এই দুর্বল ও দৈন্যপীড়িত রাষ্ট্র ও সমাজ ভাঙিয়া পড়িবে, এবং সমাজ-প্রকৃতির নিয়মে পরবর্তীকালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপিয়া দেশ তাহার মূল্য দিয়া যাইবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়। বখত্-ইয়ারের নবদ্বীপ-জয় এবং এক শত বৎসরের মধ্যে সমগ্ৰ বাঙলাদেশ জুড়িয়া মুসলমান রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা কিছু আকস্মিক ঘটনা নয়, ভাগ্যের পরিহাসও নয়, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধোগতির অনিবার্য পরিণাম!
মুসলমান অভ্যুদয়ের অব্যবহিত পূর্বের ভারতীয় বুদ্ধি ও সংস্কৃতির অবস্থার কথা বলিতে গিয়া প্রসিদ্ধ উর্দুভাষী মুসলমান কবি হালি বলিয়াছেন :
ইধর হিন্দ মে হরক্তরক অন্ধেরা।
কি থা গিয়ান গুণক লড়াইয়াসে ডরা ৷
বাস্তবিকই হিন্দুস্থানে তখন চারদিকে অন্ধকার!
০৯. সংযোজন – রাজবৃত্ত
মুরণ্ড-মুরুণ্ড
ইতিমধ্যে শ্ৰীহট্ট জেলায় মৌলবীবাজার মহকুমার শ্ৰীমঙ্গল থানার অন্তর্গত কলপুর গ্রাম থেকে একটি তাম্রপট্ট আবিষ্কৃত হয়েছে। জয়স্বামী নামে এক শৈব ব্রাহ্মণ ভগবৎ অনন্তনারায়ণের (অনস্তশিয়ান বিষ্ণুর) একটি মঠ নির্মাণ করিয়েছিলেন, এবং সেই মঠের বলি, চরু এবং সত্র যাতে নিয়মিত রক্ষিত হয় তার জন্য স্থানীয় রাজপুরুষদের কাছে কিছু ভূমি প্রার্থনা করেছিলেন, সন্দেহ নেই, যথাযথ মূল্যের পরিবর্তে। পট্টোলীটি সেই প্রার্থিত ভূমিদানের, এবং তা রক্ষিত ছিল অথবা পট্রিকৃত হয়েছিল ‘কুমারামাত্য অধিকরণে। ঐ অঞ্চলের, অর্থাৎ শ্ৰীহট্ট অঞ্চলের তদানীন্তন অধিপতি ছিলেন জনৈক সামন্ত শ্ৰীমরুণ্ডনাথ র্যার অব্যবহিত পূর্বপুরুষ ছিলেন “সামপ্ত সৈন্যপতি শ্ৰীনাথ! পট্টোলীটির পাঠ ও ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে কমলাকান্ত চৌধুরী মশায়-প্রণীত Copper Piates of Sylhet, Wol. Il (7th—11th. Century A.D.), Sylhet, 1967–বইটিতে। অক্ষরের আকৃতি-প্রকৃতি দেখে চৌধুরী মশায় যথার্থ অনুমান করেছেন, পট্টোলীটির কাল খ্ৰীষ্ট্ৰীয় সপ্তম শতাব্দী। এ-তারিখ যে যথার্থ তা মনে করবার আর একটি বড় কারণ আছে। একাধিক দিক থেকে এই লিপিটির শীলমোহর, প্রতীক চিহ্ন, পট্টীকরণ কর্তার অধিকরণ প্রভৃতির সঙ্গে সপ্তম শতাব্দীর সমতট অঞ্চলের আরও অন্তত দু’টি পট্টোলীর আশ্চর্য মিল আছে; একটি শ্ৰীধারণ রাতের কৈলান পট্টোলী, অন্যটি সামন্ত লোকনাথের ত্রিপুরা পট্টোলী। যাই হোক, এ-তথ্য আগেই জানা ছিল, ঢাকা ও ত্রিপুরার খড়্গ রাজবংশ (যাদের জয়স্কন্ধাবার ছিল কর্মাস্তবাসক=ত্রিপুরা জেলার বড় কামতা), সামন্ত লোকনাথের বংশ এবং রাত বংশ, এই তিনটি বংশই সপ্তম শতাব্দীর; প্রায় সমসাময়িকই বোধ হয় বলা যায়, কেউ কিছু আগে বা পরে। তিনটি বংশই, অন্তত শেষোক্ত দু’টি তো বটেই, সামন্ত বংশ এবং তিনটিই সমতটের বিভিন্ন অংশের সামন্তাধিপতি ছিলেন; কিন্তু ইহাদের সমতটেশ্বর মহারাজাধিরাজ যে কে ছিলেন তা কিছু জানা যাচ্ছে না। এখন কলপুর পট্টোলী থেকে জানা গেল যে, এই সপ্তমতম শতাব্দীতেই, এই সমতটমণ্ডলেরই আর এক অংশে, অর্থাৎ শ্ৰীহট্ট অঞ্চলে, আর একজন সামস্ত ছিলেন, সামন্ত সৈন্যপতি শ্ৰীনাথের পুত্র সমস্ত শ্ৰীমুরগুনাথ। এই মুরগুনাথ কে, এই অদ্ভুত নামটি তিনি কোথা থেকে পেলেন?
এ-গ্রন্থের পূর্ববর্তী সংস্করণে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের মুরাণ্ড কোম সম্বন্ধে এবং তৎসম্পর্কে কুষাণ মুদ্রার প্রচলন সম্বন্ধে দু’চারটি কথা বলেছিলাম। মুরাণ্ডরা যে খ্ৰীষ্ট্ৰীয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে বিহার অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, এ-তথ্য আগেই জানা ছিল। ষষ্ঠ শতাব্দীর গোড়ার উচ্চকল্পের (মধ্যপ্রদেশের সাতনা জেলায়) রাজা জয়নাথের মহিষী এবং রাজা শর্বনাথের মাতার নাম ছিল মুরুগুস্বামিনী মুরুগুদেবী, এ-তথ্যও জানা ছিল। এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, সপ্তম শতাব্দীর শ্ৰীহট্ট অঞ্চলে এক সামন্ত মুরগুনাথকে। তিনি যে মুরাণ্ড বা মুরাণ্ড কোমেরই একজন নায়ক, সে-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। শাক-কুটুম্ব মুরুগু, মুরুগুরা কি তখনও তাদের স্বতন্ত্র অস্বিত্ব রক্ষা করছিলেন?
পাঠ-পঞ্জি৷ Chaudhury, Kamalakanta, Copper-plates of Sylhet, Wol. II (7th—1 i th. Century A.D.), Sylhet, 1967, pp. 68-80; Sircar, D.C., Epigraphic Discoveries in East Pakistan, Sanskrit College, Calcutta, 1973, pp. 14-18.
