এইখনেই শেষ নয়। সেন-রাজসভায় কবি ও পণ্ডিতদের সমাদর ছিল খুব। বিজয়বল্লাল-লক্ষ্মণ-কেশবের রাজসভা অনেক কবিরাই অলংকৃত করিতেন; আর বল্লাল-লক্ষ্মণ এবং তাঁহার একপুত্র তো নিজেরাও ছিলেন কবি ও পণ্ডিত। বস্তুত, সেন-আমল বাঙলাদেশে সংস্কৃত সাহিত্যের সুবর্ণযুগ। এই ক্ষেত্রেও সেন-রাজাদের সামাজিক আদর্শ সক্রয়! কিন্তু, এই সংস্কৃত কাব্য-সাহিতও সমসাময়িক ঐশ্বৰ্য্য-বিলাস এবং কামবাসনার আতিশয্যা দ্বারা স্পষ্ট। জয়দেব স্বয়ং বলিতেছেন, ত্রুটিবিহীন শৃংগার কাব্য রচনায় গোবর্ধন কবির তুলনা ছিল না। আর্যা সপ্তশতীই তাহার সাক্ষ্য। আর জয়দেবের গীতগোবিন্দও তো এক হিসাবে শৃংগার কাব্যই; কামবাসনার কাব্যোচ্ছাসময় কল্পনাই তো এই কাব্যের বৈশিষ্ট্য। ষোড়শ শতকে সন্ত কবি নাভাজী দাস তাঁহার ভক্তমাল গ্রন্থে এই কাব্যকে বলিয়াছেন কোকশাস্ত্র (কামশাস্ত্র) এবং শৃংগার রসের আগার। বস্তুত, এই যুগের সর্বোৎকৃষ্ট কাব্য এবং কবিতাগুলি ঐশ্বৰ্যবিলাসে এবং যৌনকামবাসনায় মন্দির এবং মধুর। রাজসভায় বসিয়া রাজা ও পত্রমিত্রসভাসদ সকলে এই সব মদির-মধুর কাব্য উপভোগ করতেন। এই পরিবেশ ও আবেষ্টনীর সঙ্গে দেববারবনিতা ও দেবদাসীদের যে উচ্ছসময় স্তব সমসাময়িক কবিরা করিয়াছেন তাহার কোথাও কোনো অমিল নাই। এই মন্দিরমাধুর্য এবং বিলাসলালসাময় ভাবকল্পনা কি রাজসভার বাহিরেও বিস্তার লাভ করে নাই, বৃহত্তর সমাজদেহের নাড়ীতে প্রবেশ করে নাই? এই প্রসঙ্গে সভাকবি উমাপতিধরের ম্লেচ্ছ রাজার সাধুবাদ সম্বন্ধে যে শ্লোকটি আগে উদ্ধার করিয়াছি তাহার সামাজিক ইঙ্গিত, এবং সেক-শুভোদয়া কথিত কুমারদত্ত মাধবী কাহিনী আবার স্মরণ করা যাইতে পারে। সেন-রাজসভার চরিত্র ও আবহাওয়া তাহা হইতেও কতকটা বুঝা যায়। সেক-শুভোদয়ায় প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা হইয়াছে যে, লক্ষ্মণসেনের রাজসভার অন্যতম অলংকার, কবি, স্মার্তা পণ্ডিত, বাল্যে রাজপণ্ডিত, যৌবনে মহামন্ত্রী এবং প্রৌঢ়াবস্থায় মহার্ধর্মাধ্যক্ষ, রাজার সর্বোত্তম আবাল্য সুহৃদ হলায়ুধ মিশ্র শেখ জালাল উদ-দীন তব্রিজির খুব পক্ষপাতী হইয়া উঠিয়াছিলেন। এ-তথ্য যদি সত্য হয়, সেক-শুভোদয়ার সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয় তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, সেনারাষ্ট্র ও সেন রাজসভার চরিত্র বলিয়া কিছু ছিল না! সভাকবি উমাপতিধর এবং মহার্ধর্মাধ্যক্ষ হলায়ুধ মিশ্র এই চরিত্রহীনতার দুইটি দৃষ্টান্ত মাত্র! পৃথিবীর সর্বত্রই তো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অধোগতির এই একই চিত্র–প্রাচীন গ্রীসে, রোমে, অষ্টাদশ শতকের প্যারিসে, অষ্টাদশ শতকের কৃষ্ণনগরে, উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধের কলিকাতায়। সে-চিত্ৰ-সামাজিক দুর্নীতির, চারিত্রিক অবনতির, মেরুদণ্ডবিহীন ব্যক্তিত্বের, কামপরায়ণ বিলাসলীলার, শৃংগাররসাবিষ্ট, অলংকারবহুল, মদির-মধুর শিল্প ও সাহিত্যের, তরল রুচি ও দেহগত বিলাসের, অতিমাত্রায় ভেদ বৈষম্যের, ব্যক্তিগত ও শ্রেণীগত বিশ্বাসঘাতকতার। একাদশ-দ্বাদশ শতকের রামাবতী, বিজয়পুর, নবদ্বীপেও সেই একই ছবি দেখিতেছিা।
উত্তর-পূর্ব ভারতের রাষ্ট্ৰীয় অবস্থাটাও এই ফাকে একটু দেখিয়া লওয়া যাইতে পারে। বখত-ইয়ার কর্তৃক বিহার-লুণ্ঠনের মিনহাজ-কথিত কাহিনী তো আগেই উল্লেখ করা হইয়াছে। এ-সম্বন্ধে বৌদ্ধ লামা তারনাথও কিছু বর্ণনা রাখিয়া গিয়াছেন। তারনাথের বর্ণনা জনশ্রুতিনির্ভর; কাজেই তঁহার সব উক্তি বিশ্বাসযোগ্য হয়তো নয়। তবু সামাজিক তথ্যের খানিকটা ইঙ্গিত এই বর্ণনার মধ্যে পাওয়া যাইতে পারে। তারনাথ বলিতেছেন, চন্দ্ৰবংশীয় (?) লবসেনের বংশধরেরা (তারনাথ কর্ণাটাগত ব্ৰহ্মক্ষত্ৰিয় সেনা-বংশের খবর নিশ্চয়ই জানিতেন না) আশি বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। মগধে এই সময় তীৰ্থিক (ব্রাহ্মণ্য) ধর্ম ক্রমশ বিস্তার লাভ করিতেছিল, এবং তাজিক (ইসলাম) ধর্মবিশ্বাসী অনেক লোকের উদয় হইতেছিল। ইহার পর গঙ্গা-যমুনার মধ্যস্থিত অস্তর্বেদিতে তুরস্কারাজ ‘চন্দ্র” (মূল তুরস্ক-নামের তিব্বতী অনুবাদ হওয়া বিচিত্র নয়; তিব্বতী পণ্ডিতেরা তো নামও অনুবাদ করিতেন) আবির্ভূত হন। তিনি অনেক সংবাদবাহী ভিক্ষুকদের মধ্যবর্তিতায় বাঙলা ও তাহার পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুরস্ক রাজাদের নিজের দলভুক্ত করিয়া মগধ লুণ্ঠন করিতে থাকেন এবং অনেক বৌদ্ধ আচার্যকে হত্যা করিয়া, ওদন্তপুরী ও বিক্রমশিলা বিহার ধ্বংস করেন। এই সব ও অন্যান্য বৌদ্ধবিহারের অনেক পণ্ডিত নানাদিকে পলাইয়া যাইতে বাধ্য হন, এবং তাহার ফলে মগধে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হইয়া যায়।
তারনাথের বিবরণী হইতে মনে হয়, একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু মুহম্মদ বখত্-ইয়ারের গুপ্তচরের কাজ করিয়াছিলেন, এবং বাঙলার সঙ্গে তাহার যোগাযোগের ব্যবস্থাও করিয়া দিয়াছিলেন। মিনহাজ ও তারনাথের বিবরণ একত্র মিলাইয়া দেখিলে মনে হয়, বিহার-বাঙলারই একদল লোক বিভীষণ-বাহিনীর কাজ করিয়াছিল। মগধে তখন পরিপূর্ণ নৈরাজ্য, কিন্তু ভিতরে ভিতরে অবস্থােটা যে অচিরেই কী হইবে তাহা সকলেই বুঝিতে পারিতেছিল। তাহা না হইলে, বিক্রমশীলা-বিহারের প্রধান মন্ত্রাচার্য রত্নরক্ষিত যে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, দুই বৎসরের মধ্যেই তাজিকেরা মগধের দুইটি বিহার ধ্বংস করিবে, এই ভবিষ্যৎদ্বাণীর কোনও অর্থই হয় না। মিনহাজ ও লক্ষণসেনের রাজজ্যোতিষীদের মুখে যে-ভবিষ্যদ্বাণীর ইঙ্গিত দিয়াছেন তাহার অর্থও এই যে, সকলেই অবস্থােটা জানিত, এবং তুরুস্ক জাতীয় মুসলমান শত্ৰুরাই যে আক্রমণ-কর্তা, তাহা জানিত। অথচ, প্রতিরোধের ব্যবস্থা তেমন কিছু হইয়াছিল, বলা যায় না। সাহাব-উদ-দীন ঘোরী দুইবার পরাজিত হইয়া তৃতীয় বারের চেষ্টায় পঞ্জাব অধিকার করিয়াছিলেন, এবং তাহাও রাজমহিষীর বিশ্বাসঘাতকায়। পরেও হিন্দুরাষ্ট্রশক্তিপুঞ্জ মুসলমান শক্তির বিরুদ্ধে কোনও সামগ্রিক প্রতিরোধ রচনা করিতে পারেন নাই। গজনীর মামুদের সফল আক্রমণের পর হইতে উত্তর-ভারতের অনেক স্থানেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুসলমান বসতি কেন্দ্র গড়িয়া উঠিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। গাহড়বাল রাজ্যেও বোধহয় এই ধরনের ছোট ছোট তুরুস্ক কেন্দ্ৰ ছিল। জয়চন্দ্রের পিতামহ গাহড়বাল-রাজ গোবিন্দচন্দ্রের লিপিতে তুরুস্কদণ্ড নামে একপ্রকার করের উল্লেখ আছে; এই সব কর বোধ হয় আদায় করা হইত গাহড়বাল রােজ্যান্তৰ্গত তুরুস্ক-বাসিন্দাদের নিকট হইতে। মুহম্মদ বখতুি ইয়ারের আক্রমণের আগেই উত্তর-ভারতের বিহার পর্যন্ত যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তুরুস্ক-কেন্দ্র কিছু কিছু গড়িয়া উঠিয়ছিল তারনাথের বিবরণ হইতেও তাহার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কি এই সব তুরুস্ক কেন্দ্রের সঙ্গেই বখত্-ইয়ারের যোগসাধন করিয়া দিয়াছিলেন? উত্তর-পূর্ব ভারতের এই উচ্ছঙ্খল অবস্থা কি লক্ষ্মণসেন ও তাঁহার উপদেষ্টা ও মন্ত্রীবর্গ জানিতেন না? বোধ হয় জানিতেন, কিন্তু প্ৰতিকারের অর্থাৎ সামাজিক ও রাষ্ট্ৰীয় এই নিম্নগামী প্রবাহকে রোধ করিবার মতন সাহস ও শক্তি, বুদ্ধি ও চরিত্র, দৃষ্টি ও ব্যক্তিত্ব, ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি কাহারও ছিল না, না সেন-রাজসভায়, না বৃহত্তর সমাজে। সকলেই যেন অনিবার্য গড্ডলিকা প্রবাহে গা’ ভাসাইয়া দিয়াছিলেন।
