শুধু তো এইখানেই শেষ নয়। আর্যোিতর ধর্মের আচারানুষ্ঠান এবং তন্ত্রধর্মের বিকৃতি এই সময় বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য উভয় ধর্ম ও সমাজকেই স্পর্শ করিয়াছিল, এবং উভয় ধর্মেরই আচারানুষ্ঠানকে নানাপ্রকার যৌনাতিশয্যে ব্যাধিগ্রস্ত করিয়াছিল। বোধ হয়, তাহারই ফলে সমাজে, বিশেষভাবে উচ্চ বর্ণ ও শ্রেণীগুলিতে নানাপ্রকারের কাম ও যৌনবিলাস দেখা দিয়াছিল। সেনা-বর্মণ যুগের স্মৃতি ও কাব্যগ্রন্থাদি, লিপিমালা ও ধর্মানুষ্ঠানের বিবরণগুলি পাঠ করিলে এ-সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহ থাকে না। বস্তুত, যৌন আচার-ব্যবহারে কোনোপ্রকার শীলতা জ্ঞান এই সমাজে ছিল। বলিয়াই মনে হয় না। নাগর-সমাজে প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে ব্যক্তিগত উপভোগের জন্য দাসী রাখা নিয়মের মধ্যে দাঁড়াইয়া গিয়াছিল। জীমূতবাহন এবং টীকাকার মহেশ্বরের সাক্ষ্য এ-সম্বন্ধে প্রামাণিক বলিয়া স্বীকার করা যাইতে পারে। আর, সেন-আমলেই বোধ হয় দেবদাসী প্রথা বাঙলাদেশে বিস্তৃতি লাভ করে। বাঙলাদেশে এই প্রথা কল্যাণকর হয় নাই। এই প্রথা ক্রমশ যৌনাতিশয্যের দ্যোতক হইয়া উঠিয়াছিল এবং রাজরাজড়া হইতে আরম্ভ করিয়া উচ্চতর বর্ণ ও শ্রেণীর সমৃদ্ধ লোকেরা এই প্রথার আশ্রয়ে তাহাদের কাম-বাসনার চরিতার্থতা খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন, এ-সম্বন্ধেও সন্দেহ করিবার কারণ নাই। বিজয়সেন ও ভট্ট ভবদেবী দুইজনই তাহাদের প্রতিষ্ঠিত ধর্মমন্দিরে শত শত দেবদাসী উৎসর্গ করিবার গৌরব দাবি করিয়াছেন! সুহ্মদেশে আর এক সেনরাজ (বোধ হয়, লক্ষ্মণসেন)-প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে দেবদাসীর (বার-ব্লামা) উল্লেখ ধোয়ী কবির পবনদূত ‘কাব্যে পাওয়া যায়। সন্ধ্যাকরনদীর রামচরিতেও দেববারবনিতার উল্লেখ সুস্পষ্ট। হয়তো পালযুগেই এই প্রথা প্রবর্তিত হইয়াছিল; রাজতরঙ্গিণী-গ্রন্থে কমলা-নর্তকীর কাহিনী প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সেন আমলে ইহার বিস্তৃতি ও সমসাময়িক কবিকণ্ঠে এই সব বাররামা-বারবনিতাদের উচ্ছা।সময় নির্লজ্জ স্তুতিগান অনস্বীকার্য। ধোয়ী এবং ভবদেব-প্রশস্তির কবি এই বারবনিতাদের উপর কবিকল্পনার অজস্ৰ মধুময় বাণী বর্ষণ করিয়াছেন। সেন-বৰ্মণরা বোধ হয়। দক্ষিণ-দেশ হইতে এই দেবদাসী প্রথার প্রবাহ নূতন করিয়া বাঙলাদেশে লইয়া আসিয়াছিলেন। সমসাময়িক বাঙলার নাগর-সমাজের যুবক যুবতীদের যে কামলীলার বিবরণ ধোয়ী কবির পবনদূতে পাওয়া যায় তাহাও খুব প্রশংসনীয় নয়, অথচ কবি তাহাকে সাধারণসমাজ জীবনের অঙ্গ বলিয়াই বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন। বাৎস্যায়ন তাহার কামসূত্রে গৌড়-বঙ্গের রাজান্তঃপুরে কামচাতুর্যলীলার এবং নির্লজ্জ কামক্রিয়ার উল্লেখ করিয়াছেন (তৃতীয়-চতুর্থ শতক), এবং বৃহস্পতিও বলিয়াছেন যে, প্রাচ্যদেশের দ্বিজবর্ণের মেয়েরা যৌনব্যাপারে দুনীতিপরায়ণ। কিন্তু সমাজ তখনকার সেই সওদাগরী ধনতন্ত্র এবং সুগঠিত কেন্দ্রীয় রাজতন্ত্রের আমলে এত দুর্বল ছিল না, ভেদবুদ্ধি এত প্রবল ছিল না, এবং এই সব দুনীতি দ্বিজবৰ্ণ, রাজান্তঃপুর এবং অভিজাতশ্রেণী অতিক্রম করিয়া সমাজের সকল স্তরে বিস্তৃত হইয়া পড়ে নাই। পাল-আমলের শেষের দিক হইতেই তাহা দেখা দিল এবং সেন আমলে সমগ্র সমাজদেহকে তাহা কলুষিত করিয়া দিল। ব্ৰাহ্মণ শূদ্র নারীকে বিবাহ করিতে পারিত না, কিন্তু শূদ্র নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্বন্ধে তাহার বিশেষ কোনও বাধা ছিল না; নামমাত্র শাস্তিতেই সে-অপরাধ কাটিয়া যাইত, ইহাই সমসাময়িক বাঙলার স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান! বিলাস ও আড়ম্বরাতিশয্যও এই সময় নাগরি সমাজকে গ্রাস করিয়াছিল। সন্ধ্যাকর নন্দী রামাবতী এবং ধোয়ী কবি বিজয়পুরের যে বর্ণনা দিয়াছেন তাহাতে এ-সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ থাকে না। এই যুগের প্রস্তরশিল্পেও তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। পল্লবিত বাক্য, ভাবোচ্ছাসবিলাসময় কল্পনা, আড়ম্বরময় অতিশয়ৌক্তি, অলংকার প্রাচুর্য এবং লাস্যবিলাসময়, শূঙ্গাররসাবিষ্ট দৃষ্টি তো এই যুগেরই সাহিত্য ও শিল্পের বৈশিষ্ট্য! সদ্যোক্ত যৌনাতিশয্য ও কামবিলাস জনসাধারণের ধর্মানুষ্ঠানগুলিকেও স্পর্শ করিয়াছিল। শারদীয়া দুৰ্গাপূজার সময় দশমী তিথিতে শারদোৎসব নামে একটি নৃত্যগীতোৎসব প্রচলিতু ছিল। গ্রামে নগরে এই উৎসবে নরনারীর দল কর্দমলিপ্ত এবং বৃক্ষপত্ৰমাত্র পরিহিত ও অর্ধ উলঙ্গ হইয়া নানাপ্রকার যৌনক্রিয়াগত অঙ্গভঙ্গি করিয়া এবং তদ্বিষয়ক গান গাহিয়া উন্মত্ত নৃত্যে মাতিত; তাহা না করিলে নাকি দেবী ভগবতী ক্রুদ্ধা হইতেন, সমসাময়িক কালবিবেক-গ্ৰন্থ এবং প্রায় সমসাময়িক বা কিছু পরবর্তী কালিকাপুরাণে তাহা উল্লেখ করা হইয়াছে। বৃহদ্ধর্মপুরাণে এই সম্বন্ধে একটু বিধিনিষেধের বর্ণনা আছে, কিন্তু তাহা শক্তি-উপাসক বা উপাসিকার পক্ষে প্রযোজ্য নয়। তাহারা এইরূপ করিলে নাকি দেবীর সুখ উৎপাদিত হইত! যৌন অধোগতির প্রমাণ ইহার চেয়ে বেশী আর কি হইতে পারে! বসন্তে হোলক (হোলী) এবং চৈত্র মাসে কাম-মহোৎসবে প্রায় অনুরূপ অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। কালবিবেক-গ্রন্থে বলা হইয়াছে, কামমহোৎসবে নানাপ্রকার যৌন অঙ্গভঙ্গি এবং জুগুন্সিতোক্তি করিয়া নৃত্যগীত করিলে কামদেবতা গ্ৰীত হন, এবং তাহার ফলে ধনপুত্রে লক্ষ্মীলাভ হয়! ইহাই বুঝি ছিল সমসাময়িক কালের বিবেক!
