কুলজী-গ্ৰন্থধুত লোকস্মৃতির। যদি কিছু মাত্র মূল্যও থাকে, বল্লাল-চরিত গ্রন্থোক্ত-কাহিনীর পশ্চাতে যদি কোনও সত্য থাকে, তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, সেন ও বর্মণ আমলে পালযুগ গঠিত বাঙলার সমাজ ও বাঙালী জাতিকে খণ্ড খণ্ড করিয়া ভাঙিয়া নূতন করিয়া গড়া হইয়াছিল। এই গড়ার মূলে কোনও সমন্বয় বা স্বাঙ্গীকরণের আদর্শ সক্রয় ছিল না। বর্ণ-বিন্যাসের দিক হইতে দেখিলে দেখা যাইবে, সমাজ বিভিন্ন স্তরে স্তরে বিভক্ত; প্রত্যেকটি স্তর সুনির্দিষ্ট সীমায় সীমিত; এক স্তরের সঙ্গে অন্য স্তরের মিলন ও আদান-প্রদানের বাধা প্রায় দুর্লঙ্ঘ্য, অন্যতিক্রম্য। মাঝে মাঝে কৃচিৎ যেখানে মিলন ও আদান-প্ৰদান হইতেছে সেখানে স্মৃতি-শাসনের ব্যতিক্রম হইতেছে, এবং এই ব্যতিক্রমগুলিও সুনির্দিষ্ট নিয়মে নিয়মিত। বৃহদ্ধর্মপুরাণ ও ব্ৰহ্মবৈবর্তপুরাণের বর্ণ-বিন্যাস ও তাহার যুক্তি, এই যুগের অসংখ্য স্মৃতি-গ্ৰস্থাদির বিবরণ ও যুক্তি পাঠ করিলে সমাজের এই স্তরভেদ কিছুতেই অস্বীকার করিবার উপায় থাকে না। সর্বোচ্চ বৰ্ণ-ব্রাহ্মণদের সঙ্গে যদি বা উত্তর সংকর বা সৎশুদ্রদের খাওয়া-দাওয়া বিষয়ে আদান-প্রদানের পথ খানিকটা উন্মুক্ত ছিল, মধ্যম সংকর ও অন্ত্যজদের সঙ্গে একেবারেই ছিল না। এক স্তরের সঙ্গে আর এক স্তরের, কিংবা একই স্তরের মধ্যে এক শাখার সঙ্গে আর এক শাখার বৈবাহিক আদান-প্ৰদান একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল। এক একটি স্তরের মধ্যেও আবার নানা ক্ষুদ্র বৃহৎ উপস্তর; এবং সেখানেও বিভিন্ন বিচিত্র উপস্তরের মধ্যে বিচিত্র বাধা-নিষেধের প্রাচীর। এ সব সাক্ষ্য কুলজী গ্রন্থমালা বা বল্লালচরিত্যের নয়, এই যুগেরই স্মৃতি-গ্ৰস্থাদির, লিপিমালার এবং এই যুগেরই প্রতিফলন যে-সব গ্রন্থে পন্ডিয়াছে অর্থাৎ বৃহদ্ধর্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের সাক্ষ্য। এবং, তাহা অস্বীকার করা কঠিন। শেষোক্ত পুরাণ দুটিতে দেখা যাইবে, ব্ৰাহ্মণদের মধ্যেই বিভিন্ন স্তর। এই সমস্ত তথ্যই বর্ণ-বিন্যাস অধ্যায়ে সবিস্তারে আলোচিত হইয়াছে; এখানে রাষ্ট্র ও রাজবৃত্ত ব্যাপারে তাহার ইঙ্গিত উল্লেখ করিতেছি মাত্র। এ-যুক্তি স্বীকার্য যে, সেনা-বর্মণ আমলে এই সব স্তরভেদ ও বিভিন্ন স্তুর উপস্তরের মধ্যে বিধি-নিষেধের প্রাচীর পরবর্তীকালের মতো সুনির্দিষ্ট, এত কঠোর হয়তো হইয়া উঠে নাই; কিন্তু রাষ্ট্র ও উচ্চতর বর্ণগুলির সামাজিক আদর্শ যে তাঁহাই ছিল এবং সেই আদৰ্শই তাহারা সবলে প্রচার করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের এতটুকু অবকাশ নাই। সেন-বৰ্মণ যুগের লিপিমালা এবং স্মৃতিগ্রন্থমালাই তাহার অকাট্য প্রমাণ। সমাজের এই স্তরভেদ এবং স্তরে স্তরে আদান-প্রদানের বিচিত্র বিধিনিষেধ নবগঠিত বাঙলার সমাজ ও বাঙালী জাতিকে দুর্বল ও পঙ্গু করে নাই, তাহা কে বলিবে? পরবতী কালে যে করিয়াছে তাহা তো অনস্বীকার্য, কিন্তু বাঙলাদেশ ও বাঙালী জাতির সেই শৈশবে এই ভেদবুদ্ধি ও বিভেদাদর্শ নবজাত শিশুকে বিভ্ৰান্ত করে নাই, কে বলিৰে?
বর্ণ-বিন্যাসের ক্ষেত্রে যেমন শ্রেণী-বিন্যাসের ক্ষেত্রেও তাঁহাই। কৃষক-ক্ষেত্রকর হইতে আরম্ভ করিয়া অন্ত্যজ চণ্ডাল পর্যন্ত লোকেরা তো রাষ্ট্রের দৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত ছিল না; আর, ব্রাহ্মণেরা যে রাষ্ট্রে ক্রমশ আধিপত্য বিস্তার করিতেছিলেন, ধর্মানুষ্ঠানের কর্তারা যে ক্রমশ রাজপাদাপোজীবী হইতেছিলেন, তাহা তো আগেই বলিয়াছি। ভবদেব-ভট্টের মতন একজন পণ্ডিত ও রাষ্ট্রনায়ক ব্ৰাহ্মণদের কৃষিকার্য সমর্থনা করিয়াছেন; লিপিমালায় প্রমাণ পাইতেছি, ব্রাহ্মণের রাষ্ট্রকার্যে, সামরিক ও অন্যান্য ব্যাপারে উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত আছেন, অথচ ভবদেবই ব্ৰাহ্মণদের পক্ষে অন্য প্রায় সকল বৃত্তিই নিষিদ্ধ বলিয়া বলিতেছেন, এমন কি অব্রাহ্মণকে শিক্ষাদান, এবং অব্রাহ্মণ্যের যাগযজ্ঞ-পূজা-অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য পর্যন্ত। শ্রেণীতে শ্রেণীতে বিভেদের সৃষ্টি, ভেদবুদ্ধি সৃষ্টির প্রমাণ ইহার চেয়ে আর কী থাকিতে পারে! ব্ৰাহ্মণদের পক্ষে চিকিৎসাবিদ্যার চর্চা, চিত্রবিদ্যার চর্চাও নিষিদ্ধ ছিল; যাঁহারা তাহা করিতেন তাঁহারা ‘পতিত’ হইয়াছিলেন। অথচ জ্যোতিবির্দার চর্চাও নিষিদ্ধ ছিল; দেবল ব্রাহ্মণরা তো এইজন্যই পতিত হইয়াছিলেন। অথচ ভবদেব-ভট্ট, বল্লালসেন প্রভৃতির স্বয়ং এবং আরও অনেক সমসাময়িক প্রধান প্রধান পণ্ডিত-ব্রাহ্মণ, জ্যোনিয, ফলসংহিতা, হোরাশাস্ত্ৰ ইত্যাদির চর্চা করিতেন। তাহারা তা পতিত্ব’ হন নাই! ব্রাহ্মণেতার বর্ণের পৌরোহিত্য যাঁহারা করিতেন তাহারা ঐ সব নিম্ন বর্ণের বর্ণভুক্ত হইতেন! শ্রেণী ভেদবুদ্ধির আর কী প্রমাণ প্রয়োজন? এই সব সাক্ষ্য সমস্তই সমসাময়িক। ইহার উপর বল্লাল-চরিতের সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয়, তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, বল্লালের সেনারাষ্ট্রকোনও না কোনও কারণে বণিকদের সমর্থন হারাইয়াছিল, এবং তাঁহারই ফলে সমাজে সুবর্ণবণিকদের পতিত হইতে হইয়াছিল। সেক-শুভোদয়ার একটি গল্পে দেখিতেছি, লক্ষ্মণসেনের এক শ্যালক, রানী বল্লভার এক ভ্রাতা কুমারদও, এক বণিক-বধুর উপর পাশবিক অত্যাচার করিতে গিয়াছিল। বণিকবধু মাধবী যে শেষপর্যন্ত রাজসভায় সুবিচার পাইয়াছিলেন তাহা শুধু তেজস্বী ব্রাহ্মণ সভাকবি ও পণ্ডিত গোবর্ধন আচার্যের জন্য। নাহিলে রাজসভায় মন্ত্রী, রাজমহিষী ও স্বয়ং রাজার যে আচরণ এই গল্পের মধ্যে প্রকাশ তাহা সেন-রাজসভার পক্ষে খুব প্রশংসনীয় নয়! বল্লালসেন যে মালাকার, কর্মকার, কুম্ভকার এবং কৈবর্তদের উন্নীত করিয়াছিলেন, এইখানেও তো শ্রেণীগত ভেদবুদ্ধির প্রমাণ সুস্পষ্ট। বৃহদ্ধর্ম ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণেও খিতেছি, অনেকগুলি সমৃদ্ধ ও অর্থশালী শিল্পী ও বণিক সম্প্রদায় মধ্যম সংকর ও অসৎশুদ্ৰ পর্যায়ভুক্ত এবং স্বর্ণকার ও সুবর্ণবণিকদের স্থান এই পর্যায়ে। বৌদ্ধ ধর্ম-সম্প্রদায়ের লোকেরা যে সেন-রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন না, তাহার ইঙ্গিত তো তারনাথের বিবরণীতেও খানিকটা পাওয়া যাইতেছে। তঁহাদের দোষও দেওয়া যায় না; সেন-বৰ্মণ রাষ্ট্র তো তাহাদের প্রতি শ্রদ্ধিত ও সহানুভূতিসম্পন্ন ছিল না, আর, রাষ্ট্রের সামাজিক আদর্শও বৌদ্ধস্বর্থ বিরোধী ছিল। বৰ্ণভেদবুদ্ধি এবং এই শ্রেণীভেদবুদ্ধি একত্র জড়িত হুইয়া নবগঠিত বাঙলাদেশ ও জাতিকে, সেন-রাষ্ট্রকে ভিতর হইতে দুর্বল করিয়া দেয় নাই। এ-কথাই বা কে বলিবে? সামন্ততন্ত্র এবং অস্বাভাবিকরূপে স্ফীত আমলাতন্ত্র-বিন্যস্ত সেন-বৰ্মণরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আদর্শে ভেদবুদ্ধির দুর্বলতা, স্থানীয় আত্ম-কর্তৃত্বের দুর্বলতা তো ছিলই, তাহার উপর বর্ণ ও শ্রেণীগত এই ভেদবুদ্ধি, সমোজাদর্শগত ভেদবুদ্ধি বৈদেশিক আক্রমণকে প্রশ্ৰয় দেয় নাই, সহজ করিয়া দেয় নাই, তাহ কে বলিবে? বিহার-ধ্বংসের কথা শুনিয়াই নবদ্বীপের প্রায় সমস্ত লোক ভয়ে আতঙ্কে পলাইয়া গিয়াছিল, রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান উপদেষ্টা ও মন্ত্রীবর্গ লক্ষ্মণসেনকে পলায়নের পরামর্শ দিয়াছিলেন, রাজ-জ্যোতিষীরা লক্ষ্মণসেনকে বিভ্ৰান্ত করিয়াছিলেন। সমসাময়িক সামাজিক আদর্শ ও বিন্যাসের দিক হইতে দেখিলে মিনহাজ-উদ-দীনের এই সব উক্তি একেবারে মিথ্যা বলিয়া মনে হয় না। বণিকেরা বিরোধীতা করেন নাই, তাহাই বা কে বলিবে? অন্তত তাহারাও নিজেদের কর্তব্য ফেলিয়া দিয়া পলাইয়াছিলেন, মিনহাজ বলিয়াছেন। এই সব সর্বব্যাপী ভেদবুদ্ধির আচ্ছন্নতার মধ্যে লক্ষ্মণসেনের কিংবা তাহার পুত্রদের ব্যক্তিগত শৌর্যবীর্য বা সৈন্যদলের প্রতিরোধ কতটুকু কার্যকরী বইতে পারে?
