এই একান্ত ব্ৰাহ্মণ্য আদর্শের শাসন অন্যদিক দিয়াও কী করিয়া রাষ্ট্রে প্রতিফলিত হইয়াছে তাহার ইঙ্গিত আগেই করিয়াছি। এই যুগের সেন-বৰ্মণ রাষ্ট্রেই প্রথম দেখা যাইতেছে, পুরোহিত-মহাপুরোহিত, শান্ত্যাগরিক-শাস্তবারিক, তন্ত্ৰাধিকৃত প্রভৃতির রাজকর্মচারী বলিয়া গণ্য হইতেছেন। রাষ্ট্রে ব্রাহ্মণ-প্রাধান্য, ব্ৰাহ্মণধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি পাইয়াছে, এবং রাষ্ট্র ও রাজবংশ এই সংস্কৃতি বিস্তারে সচেষ্ট, ইহা কিছুতেই অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সমাজ নিয়ন্ত্রণ রাজার কর্তব্য বলিয়া ভারতবর্ষে বরাবরই স্বীকৃত হইয়াছে; পাল-রাজারাও বর্ণাশ্রম রক্ষণ ও পালন করিয়াছেন; কিন্তু সেন-আমলে রাষ্ট্র ও রাজবংশ যেমন করিয়া দেশের সকলের দৈনন্দিন জীবনের ছোট-খাট ক্রিয়াকর্তব্য হইতে আরম্ভ করিয়া সমস্ত ধর্ম ও সমাজগত আচার ও আচরণ, পদ্ধতি ও অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্ৰণ করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন, এমন সজ্ঞান সচেতন এবং সর্বব্যাপী কর্তৃত্বমূলক চেষ্টা বাঙলাদেশে ইহার আগে বা পরে আর কখনো হয় নাই। এই যুগের সর্বপ্রধান চেষ্টাই যেন হইতেছে, বাঙলার সমাজকে একেবারে নূতন করিয়া ঢালিয়া সাজা, নূতন করিয়া গড়া এবং তোহা একান্ত পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্য স্মৃতি-সংস্কৃতির আদর্শনুযায়ী। সেই চেষ্টার পশ্চাতে রাষ্ট্র ও রাজবংশের পরিপূর্ণ সক্রয় সমৰ্থন; উচ্চতর বর্ণ ও শ্রেণীর লোকেরাও তাহার পোষক ও সমর্থক। এই যুগের লিপিমালা এবং ধর্মশাস্ত্ৰ-গ্রন্থগুলি পাঠ করিলে এ তথ্য যেন কিছুতেই অস্বীকার করা চলে না। কুলজী গ্রন্থমালার সাক্ষ্য, বাঙলার কৌলীন্য প্রথার সাক্ষ্য হয়তো ইতিহাসে, প্রামাণিক ও বিশ্বাসযোগ্য নয়; সে আলোচনা অন্যত্র করিয়াছি। কিন্তু, লোকস্মৃতি ও লোকেতিহাসের যদি কিছুমাত্র ঐতিহাসিক মূল্যও থাকে তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, শ্যামলবৰ্মা এবং বল্লালসেনের সঙ্গেই বাঙলার প্রচলিত বর্ণ-বিন্যাস ও সামাজিক স্তন্ন-বিভাগের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গী জড়িত। লোকস্মৃতির নীচে সাধারণত কোথাও একটা কিছু সত্য গোপন থাকে, বৰ্মণ ও সেনা-বংশের সামাজিক আদর্শ সম্বন্ধে যে অকাটা নিঃসংশয় প্রমাণ সুবিদিত, লোকস্মৃতি এই ক্ষেত্রে তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিতেছে না। আনন্দভট্টের বল্লালচরিত-গ্ৰন্থ খুব প্রামাণিক না হইতে পারে (সে আলোচনাও অন্যত্র করিয়াছি) কিন্তু ইহার সামাজিক ইঙ্গিত একেবারে হয়তো মিথ্যা নয়। বল্লালসেন বণিকদের উপর অত্যাচার এবং সুবর্ণবণিকদের পতিত্ব’ করিয়া দিয়াছিলেন, এবং কৈবর্ত, মালাকার, কুম্ভকার ও কর্মকারদের সৎশুদ্রস্তরে উন্নীত করিয়াছিলেন বলিয়া এই গ্রন্থে যে বৰ্ণনা আছে, তাহা অক্ষরে অক্ষরে সত্য না-ও হইতে পারে, কিন্তু সেন-রাষ্ট্র ও রাজবংশের আমলে এইভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তর নির্ণয় এবং কোন স্তরে কোন সম্প্রদায়ের স্থান ইত্যাদি নির্দেশ করা হইতেছিল, তাহা অস্বীকার করা চলে না। হয়তো তাহার পশ্চাতে রাষ্ট্রের বা রাজকীয় নির্দেশও কিছু ছিল।
এই ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল বরেন্দ্রী ও রাঢ়দেশ, এবং পরবর্তীকালে বিক্রমপুর অঞ্চল। কিন্তু বিক্রমপুর বৌদ্ধ সাধনা ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্ৰস্থল থাকাতে সেখানে ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতাপ রাঢ়-বরেন্দ্রীর মতন এতটা প্রবল হইয়া উঠিতে পারে নাই। আর ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৌদ্ধ সাপ্লনার প্রভাব বহুদিন পর্যন্ত প্রবল ছিল। এ-সম্বন্ধে লিপি প্রমাণ বিদ্যমান। বোধ হয়, এইজন্যই মৈমনসিংহ-ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম-শ্ৰীহট্ট অঞ্চলে আজও ব্রাহ্মণ্য স্মৃতির শাসন অপেক্ষাকৃত শিথিল।
সেন ও বর্মণ উভয় বংশই দক্ষিণাগত; এ তথ্য সুবিদিত যে, অন্ধ-সাতবাহন আমল হইতেই দক্ষিণদেশ ব্রাহ্মণ্যধর্ম, সংস্কার ও সংস্কৃতির খুব বড় কেন্দ্র। পল্লব, চোল, চালুক্য, ইত্যাদি সকল রাজবংশই এই ধর্ম ও সংস্কৃতির পোষক, ধারক ও সমর্থক। বস্তুত, উত্তর-ভারত অপেক্ষা দক্ষিণ-ভারত এই বিষয়ে অধিকতর গোড়া, পরিবর্তন-বিবর্তন বিমুখ। শুধু আজই এইরূপ নয়; প্রাচীনকালেও তাহাই ছিল। কালঙ্গ-কৰ্ণটি হইতে বর্মণ ও সেনের সেই আদর্শ লইয়াই বাঙলাদেশে আসিয়াছিলেন, এবং রাষ্ট্রের বিপুল ও সক্রয় সমর্থন এবং রাজবংশের মর্যাদার বলে সহায়তায় সেই আদর্শ এবং তদনুযায়ী স্মৃতি ও ব্যবহার শাসন বাঙলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। তঁহাদের এই চেষ্টা সফল হুইয়াছিল। বাধা-বিরোধীতা তখনও হইয়াছিল, পরেও হইয়াছে; বাঙালী সমাজ পদ্ধতি ও শাসন বাঙলার সর্বত্র সমভাবে স্বীকৃত ছিল না, এখনও নাই; কিন্তু কোনও বাধাই যথেষ্ট কার্যকরী হয় নাই। আজ পর্যন্ত উচ্চতর বর্ণ ও সমাজ সেই যুগেরই স্মৃতি ও ব্যবহার-শাসন মানিয়া চলিতেছে, নিম্নতর বর্ণেরও তাঁহাই আদর্শ ও মাপকাঠি। কিন্তু, সমসাময়িক বাঙলাদেশের পক্ষে কি তাহা সার্থক ও কল্যাণকর হইয়াছিল? পরবর্তী ইতিহাসের কথা বলিব না, তাহা এই গ্রন্থের বিষয়ীভূত নহে। কিন্তু সমসাময়িককালে ইহার ঐতিহাসিক ইঙ্গিত নির্ধারণ ঐতিহাসিকের কর্তব্য।
আগের পর্বে দেখিয়াছি, পাল-যুগের সামাজিক আদর্শ ছিল বৃহত্তর সামাজিক সমন্বয় ও স্বাঙ্গীকরণ। ইতিহাসের চক্রাবর্তে বৈদিক ও পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্যধর্মের যে-শ্রোত বাঙলাদেশে প্রবাহিত হইতেছিল। সেই স্রোতকে ব্রাহ্মণেতার ধর্ম ও সংস্কৃতির স্রোতের সঙ্গে মিলাইয়া মিশাইয়া ব্ৰাহ্মণ্য ধর্মেরই কাঠামো ও আদর্শনুযায়ী একটি বৃহত্তর সামাজিক সমন্বয় গড়িয়া তোলাই ছিল পাল-চন্দ্র পর্বের সাধনা। সমসাময়িক সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজবংশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আদর্শ তাহাই ছিল। গুপ্ত-আমল হইতে আরম্ভ করিয়া ব্ৰাহ্মণ্যধম ও সংস্কৃতির প্রভাব বাঙলাদেশে সুস্পষ্ট এবং ক্রমবর্ধমান; তখন হইতেই না হউক, অন্তত সপ্তম-অষ্টম শতক হইতে ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতিই বলবত্তর; কখনো তাহা অস্বীকৃত হয় নাই। বৌদ্ধ খড়্গ বা পাল বা চন্দ্র রাজারাও তোহা করেন নাই, বরং তাহারা সেই আদর্শই মানিয়া লইয়াছেন, ব্রাহ্মণদের ভূমিদান করিয়াছেন, পুরোহিত অৰ্চিত শান্তিবারি মস্তকে গ্রহণ করিয়াছেন, ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর মন্দির স্থাপন করিয়াছেন, চাতুৰ্ব্বণ্য সমাজ রক্ষা ও পালন করিয়াছেন, রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ পাঠ শুনিয়াছেন। শুধু তাহাই নয়, পাল-যুগে ব্রাহ্মণ্য এবং বৌদ্ধ দেবদেবীদের মধ্যেও একটা বৃহৎ সমন্বয়-স্বাঙ্গীকরণ-ক্রিয়া চলিতেছিল; বৌদ্ধ ও শৈব তন্ত্রধর্ম ও চিন্তা বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীদের একটি বৃহৎ সমন্বয় সূত্রে গীথিয়া তুলিতেছিল; বৌদ্ধের অসংখ্য ব্ৰাহ্মণ্য দেবদেবীকে স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন; আর্যোিতর, ব্রাহ্মণেতর সংস্কৃতির দেবদেবীদের পংক্তিভূক্ত করিতেছিলেন। অন্যদিকে ব্রাহ্মণেরও বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণেতর, আর্যোিতর দেবদেবীদের কিছু কিছু মানিয়া লইতেছিলেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই এই সমন্বয়স্বাঙ্গীকরণ ক্রিয়া সমভাবে চলিতেছিল। বর্ণ-বিন্যাস ও সামাজিক স্তরভেদের ব্যাপারেও তাহা দৃষ্টিগোচর। পাল-আমলে চণ্ডাল পর্যন্ত সকল শ্রেণী ও বর্ণের লোকেরাই রাষ্ট্রের দৃষ্টিভূত; সেন-আমলে শুধু উচ্চতর বর্ণের লোকেরাই রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া আছেন। এমন কি রাষ্ট্রযন্ত্রেও ব্রাহ্মণ ও পুরোহিতদের প্রাধান্য। পাল-রাজারা চাতুৰ্ব্বণ্য সমাজ রক্ষা ও ধারণ করিয়াছেন, কিন্তু সেন ও বর্মণ রাজারা ইচ্ছামত এবং স্মৃতি-নিৰ্দেশমত চতুৰ্বর্ণের বিভিন্ন স্তর ঢালিয়া সাজাইয়াছেন। বস্তুত, পাল আমলের ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির সমন্বয় ও স্বাঙ্গীকরণের আদর্শ এই যুগে যেন একেবারে পরিত্যক্ত হইয়াছিল; সেই আদর্শের স্থানে সবলে ও সোৎসাহে তাহারা এক নূতন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। এই আদর্শ স্মৃতি-শাসিত বৈদিক ও পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির আদর্শ, সর্বপ্রকার যুগোপযোগী সমন্বয় ও স্বাঙ্গীকরণ-বিরোধী আদর্শ।
