রাজা-রাজকুমারেরা অনেক সময় ভারতবর্ষেরই ভিনপ্রদেশী রাজকুমারীদের বিবাহ করিয়া আনিতেন; বাঙালী পাল-রাজারাই করিতেন, কর্ণাট-দেশাগত সেন-রাজারা তো করিতেনই। পুরুষানুক্রমে কয়েক পুরুষ ধরিয়া এইরূপ হইয়াছে, এমন দৃষ্টান্তও আছে। রাজারাজড়ার তো কানও বর্ণ নাই; কাজেই মহিষী নির্বাচন করিতে গিয়া জন-বর্ণ দেখিবারও প্রয়োজন হইত না, রাজবংশ হইলেই চলিত; এখনও তো তাহাই চলে। বিশেষত, রাষ্ট্রীয় ও সামরিক কারণ থাকিলে তো কথাই নাই। কিন্তু ই ধরনের দৃষ্টান্তও বিরাট জনগণপ্রবাহে জলবিন্দুবৎ; কাজেই, মুষ্টিমেয় ভিন্নপ্রদেশাগত নারীও বিশাল জনসমুদ্রে বিলীন হইয়া গিয়াছেন। ইহাই প্রাকৃতিক নিয়ম।
সদ্যোবর্ণিত এইসব দৃষ্টান্ত ছাড়া বাঙলার ইতিহাসে কয়েকটি রাজবংশের পরিচয় আছে যাহারা বিভিন্ন প্রদেশ হইতে বাঙলায় আসিয়া নিজেরা রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করিয়া এ দেশের কমবেশি অংশে রাজত্ব করিয়াছেন, পুরুষানুক্রমে বসবাস করিয়াছেন এবং এই দেশেরই বিরাট জনগণপ্রবাহে কালক্রমে বিলীন হইয়া গিয়াছেন। তুর্কী বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত বাঙলাদেশে এই রকম তিন-চারিটি প্রধান প্রধান রাজবংশের পরিচয় পাওয়া যায়। সপ্তম শতাব্দীর শেষার্ধে খড়গ নামে একটি রাজবংশ সমতট অঞ্চলে প্রায় তিন-চার পুরুষ রাজত্ব করিয়াছিলেন; খড়েগাদ্যম, জাতখড়গ, দেবখড়গ ও রাজ-রাজভট—এই চারিজন রাজার নাম আমরা জানি। খড়গ—এই উপান্ত নামটি কেমন যেন সন্দেহজনক এবং ভিনপ্রদেশী অবাঙালীর নাম বলিয়াই মনে হয়, অথচ ইহারা কোথা হইতে আসিয়াছিলেন জানিবার উপায় নাই। তিন পুরুষ ধরিয়া ইহারা অন্তত উপান্ত নামে নিজেদের জনপরিচয় অক্ষুঃ রাখিয়াছিলেন, কিন্তু চতুর্থ পুরুষে তাহা পরিত্যাগ করিয়া একেবারে যেন দেশি বাঙালী বনিয়া গিয়াছিলেন। দশম শতকে কাম্বোজাখা নামে আর এক রাজবংশ গৌড়ে কিছুদিন রাজত্ব করিয়াছিলেন। দিনাজপুর জেলার বাণগড়ে প্রাপ্ত একটি স্তম্ভলিপিতে ইহারা “কাম্বোজাম্বয়জ গৌড়পতি” বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন; ইরদা তাম্রপট্টেও ইহাদের উল্লেখ আছে। এই কাম্বোজাম্বয়জ রাজারা কাহারা? কোথা হইতে ইহারা আসিয়াছিলেন? দেবপালের মুঙ্গের-শাসনে এক কাম্বোজের উল্লেখ আছে, কিন্তু সেই কাম্বোজদেশ যে উত্তর-পশ্চিমের গান্ধার দেশের সংলগ্ন দেশ, এ সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নাই। কিন্তু বাণগড় স্তম্ভলিপি ও ইরদাপট্টের কাম্বোজ যে মুঙ্গের-শাসনের কাম্বোজ, আমার তাহা মনে হয় না। বহুদিন আগে রমাপ্রসাদ চন্দ মহাশয় বলিয়াছিলেন এবং সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় তাহা সমর্থন করিয়াছিলেন যে, এই কাম্বোজরা তিব্বত, ভোটান প্রভৃতি হিমালয়ের সানুদেশেরকোনও মোঙ্গোলীয় জনের শাখা এবং বর্তমান উত্তরবঙ্গের কোচ-পলিয়া-রাজবংশীয়দের পূর্বপুরুষ। সুনীতিবাবু কাম্বোজের সঙ্গে কোচ শব্দের একটা শব্দতাত্ত্বিক যোগও অনুমান করিয়াছিলেন; কিন্তু তিনি এই মত এখন পরিত্যাগ করিয়াছেন; কেন করিয়াছেন, জানি না। আসামের পূর্বতম প্রান্তে চীনদেশের সীমায় য়ুনান প্রদেশকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত প্রাচ্য ভৌগোলিক ও ব্যবসায়ীরা গান্ধার বলিয়াই অভিহিত করিতেন; ত্রয়োদশ শতকেও রসিদ-উদ-দীন এই দেশকে গান্ধার বলিয়াই উল্লেখ করিয়াছেন। এই গান্ধারেরই সংলগ্ন এক কাম্বোজদেশ যে ছিল না, কে বলিবে? বিশেষত, পূর্ব-দক্ষিণ সমুদ্রশায়ী চম্পাভূমি সংলগ্ন কম্বুজদেশ যখন পূর্ব হতেই এত সুপরিচত? তাহা ছাড়া, ব্ৰহ্মদেশের পেগু শহরের নিকটস্থ পঞ্চদশ শতকের সুদীর্ঘ কল্যাণী শিলালিপিতে রাজা ধৰ্ম্মচেতি ঐ দেশে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস ও ধর্মসংস্কারের যে বিবরণ উৎকীর্ণ করাইয়াছিলেন, তাহাতে কম্বোজ সঙ্ঘ নামে এক বৌদ্ধ ধর্মগোষ্ঠীর উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহারা যে সেই উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের কাম্বোজদের সঙ্গে সম্পূক্ত, এ কথা সহজে বিশ্বাস করা যায় না। আমার তো মনে হয়, আসামের পূর্ব-সীমান্তের গান্ধার সংলগ্ন একটা কম্বোজ দেশ ছিল, এবং বাঙলার কাম্বোজরাজবংশ সেই দেশ হইতে আগত। যদি তাহা হয়, তাহা হইলে ইহারা মোঙ্গোলীয় পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এই অনুমান অসংগত নয়, এবং বাণগড় শিলালিপির সাক্ষ্য স্বীকার করিলেও ইহারা যে এ দেশে আসিয়া এ দেশের শৈবধর্মে দীক্ষিত হইয়াছিলেন তাহাও স্বীকার করিতে হয়। বৃহদ্ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে বাঙলাদেশে যে সব অবাঙালী জনের নাম করা হইয়াছে তাঁহাদের মধ্যে কম্বোজ অন্যতম। ব্ৰহ্মপুত্র উপত্যকা হইতে একাধিক মোঙ্গোলীয় জন যে প্রাচীনকালে বাঙালীর জনপ্রবাহে রক্তধারা মিশাইয়াছে, এ কথা আগেই উল্লেখ করিয়াছি। বস্তুত, বাঙলা ও আসামের প্রাচীন ইতিহাসে ঐ অঞ্চল হইতে একাধিক সমরাভিযান ব্ৰহ্মপুত্র-করতোয়া অতিক্রম করিয়া বাঙলাদেশে বিস্তৃত হইয়াছিল, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। কামরূপরাজ ভাস্করবর্মার স্বল্পকালস্থায়ী উত্তরবঙ্গ ও কর্ণসুবর্ণাধিকার তাহার একটিমাত্র দৃষ্টান্ত।
আর এক বর্মণ রাজবংশ একাদশ ও দ্বাদশ শতকে পূর্ববঙ্গে প্রায় পাঁচ-ছয় পুরুষ ধরিয়া রাজত্ব করিয়াছিলেন। কেহ কেহ অনুমান করেন, এই বর্মণেরা বাঙলার দক্ষিণে কোনও প্রদেশ, সম্ভবত উড়িষ্যা বা অন্ধ্রদেশ হইতে আগত। কিন্তু যে ভিনপ্রদেশাগত রাজবংশ বাঙলাদেশে আসিয়া প্রায় দুইশত বৎসর ধরিয়া রাজত্ব করিয়াছিলেন এবং বাঙালীর সমসাময়িক সমাজবিন্যাসকে আমূল বদলাইয়া স্মৃতি-শাসনের রূপান্তর ঘটাইয়া সমাজের উচ্চস্তরে নূতন এক সমাজবিন্যাস গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, সেই সেন রাজবংশের কথা এই প্রসঙ্গে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। এই সেন রাজারা নিজেদের পরিচয় দিয়াছেন “কর্ণাট-ক্ষত্ৰিয়” বলিয়া। তাহারা যে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটদেশ হইতে আসিয়াছিলেন, এ কথা আজ সর্বজনবিদিত। কর্ণাটদেশবাসী চালুক্য রাজবংশ একাদশ শতকে বাঙলা ও বিহারে একাধিক সমরাভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন; এইসব অভিযানের সঙ্গে যে সব সৈন্যসামন্তরা আসিয়াছিলেন, তাঁহারাই যে পরবর্তী কালে তিরহুত ও নেপালে “কর্ণাটক” রাজবংশ, রাঢ়ে ও বঙ্গে “কর্ণাটক-ক্ষত্ৰিয়” রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন, এ অনুমান ইতিহাসসম্মত। সেন রাজারা সাধারণত বৈবাহিক আদান-প্রদান ভিনপ্রদেশের রাজবংশের সঙ্গেই করিতেন—রাজারাজড়া তো তাহা করিয়াই থাকেন; কিন্তু এ কথাও সত্য যে, দুই শত বৎসরে তাঁহারা একেবারে বাঙালী বনিয়া গিয়াছিলেন এবং বাঙালীর জনপ্রবাহ নিজেদের বিলীন করিয়া দিয়াছিলেন। কর্ণাটদেশের উচ্চবর্ণের লোকেরা তো জন হিসাবে মোটামুটি গোলমুণ্ড, উন্নতনাস অ্যালপাইন পরিবারভুক্ত; উচ্চবর্ণের বাঙালীরাও তাহাই। কাজেই, কর্ণাট-ক্ষত্রিয় সেন রাজবংশ বাঙলাদেশে এমন নূতন কোনও রক্তধারা বহন করিয়া আনেন নাই যাহা বাঙলাদেশে ছিল না; আনিলেও সে ধারা এত ক্ষীণ ও শীর্ণ যে, বেগবান স্রোতপ্রবাহে কোথায় যে তাহা মিশিয়া গিয়াছে, আজ আর তাহা ধরা পড়িবার উপায় নাই।
