শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের স্থান
রাষ্ট্রের সামাজিক দৃষ্টি-সংকীর্ণতার কথা বলিয়াছি। অন্য সাক্ষ্য-প্রমাণ হইতেও এই উক্তির সমর্থন পাওয়া যায়। পূর্বতর যুগের মতন পালযুগের রাষ্ট্রে শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ীর প্রাধান্য ছিল না, এ-কথা সত্য; কিন্তু সমাজে তাঁহাদের একটা স্থান ছিল, স্বীকৃতি ছিল! সেন-আমলে দেখা যাইতেছে, শিল্পী ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের লোকেরা সমাজের নিম্নস্তরে নামিয়া গিয়াছে। বৃহদ্ধর্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে এ-সম্বন্ধে যে-সাক্ষ্য পাওয়া যায় তাহার বিস্তৃত বিচারালোচনা বর্ণ-বিন্যাস ও শ্রেণী-বিন্যাস অধ্যায়ে করা হইয়াছে। এই দুই গ্রন্থে বর্ণ-বিন্যাসের যে-ছবি পাওয়া যায়, যদি তাহা সেন-আমলের সমাজ-বিন্যাসের কিছু ইঙ্গিতও বহন করে তাহা হইলে স্বীকার করিতেই হয়, অনেক শিল্পী ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সংশুদ্ৰ বলিয়াও গণ্য হইতেন না; বর্ণ-বিন্যাসের নিম্নতর স্তরে ছিল তাহদের স্থান।
রাষ্ট্রের সামাজিক আদৰ্শ৷ বৌদ্ধধর্ম ও সংঘের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ
এই দৃষ্টি-সংকীর্ণতা সেনা-রাজবংশ ও রাষ্ট্রের উপর কেন আরোপ করিতেছি তাহার কারণ বলিতে হইলে রাষ্ট্রের সামাজিক আদর্শ সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলা দরকার। সেন-আমলের রাজকীয় লিপিমালার সাক্ষ্য লইয়াই আরম্ভ করা যাইতে পারে। বর্মণ ও সেন বংশের প্রত্যেকটি লিপিতেই দেখা যায়, ব্ৰাহ্মণ্য স্মৃতি, সংস্কার ও পূজাৰ্চনার জয়জয়কার; বিভিন্ন তিথি উপলক্ষে তীর্থস্নান, উপবাস; নানা প্রকারের বৈদিক ও পৌরাণিক যাগযজ্ঞ হোম ইত্যাদির বিবরণ; এই সব অনুষ্ঠান উপলক্ষে যত ভূমি দান সমস্তই লাভ করিতেছেন ব্রাহ্মণের। এই যুগের একটি লিপিতেও এমন প্রমাণ নাই। যেখানে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী কেহ বা কোনও বৌদ্ধ বিহার বা সংঘ কোনও প্রকার রাজানুগ্রহ লাভ করিতেছেন। বাঙলাদেশে যত বৌদ্ধমূর্তি ইত্যাদি পাওয়া গিয়াছে তাহার অধিকাংশই অষ্টম হইতে একাদশ শতকের। অল্প কয়েকটি মূর্তিই দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের। পট্টিকেরা রাজ্যের এক রণবঙ্কমল্ল হারিকালদেবী ছাড়া এই যুগে আর কোনও বৌদ্ধ নরপতির খোজ পাওয়া কঠিন। মধুসেন পরমসুগত সন্দেহ নাই, কিন্তু তিনি সেনা-বংশের রাজা কিনা নিশ্চয় করিয়া বলা কঠিন; আর, এই ধরনের ২/১টি দৃষ্টান্তের সাহায্যে রাষ্ট্রের সামাজিক আদর্শ ধরাও কঠিন; বর্মণ ও সেনা-বংশীয় রাজারা কেহ শৈব, কেহু বৈষ্ণব, কেহ সৌর, কিন্তু প্রত্যেকেরই আশ্রয় পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য স্মৃতি ও সংস্কার, এবং তাঁহারা প্রত্যেকেই এই স্মৃতি ও সংস্কার প্রচার ও বিস্তারে সদা উৎসুক। রাজপরিবারের লোকদেরও এ-সম্বন্ধে আগ্রহের সীমা নাই। বৌদ্ধধর্ম এই সময় বিলীন হইয়া গিয়াছিল, সংঘ-বিহার ইত্যাদি ছিল না, একথা বলা চলে না; অথচ রাষ্ট্রের কোনও অনুগ্রহই সেদিকে বর্ষিত হইল না! শুধু যে বর্ষিত হয় নাই,তাহা নয়; বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি একটা বিরোধিতাও বোধহয় আরম্ভ হইয়াছিল, এবং রাষ্ট্রের সমর্থনও এই বিরোধিতার পশ্চাতে ছিল। বৰ্মণরাজ জাতবর্মীর রাজত্বকালেই সম্ভবত বর্মণ-রাষ্ট্রের বঙ্গাল সৈন্যদল সোমপুরের বৌদ্ধ মহাবিহারের অন্তত একাংশ পূড়াইয়া দিয়াছিল; নালন্দার একটি লিপিতে এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি উল্লিখিত আছে। এই আক্রমণ শুধু কৈবর্তনায়ক দিব্যর বিরুদ্ধেই নয়; বৌদ্ধধর্মেরও বিরুদ্ধে। ভট্ট-ভবদেব ছিলেন রাজা হরিবর্মর সন্ধিবিগ্রহিক; তাহার পিতামহ আদিদেব ছিলেন বঙ্গরাজের সান্ধিবিগ্রহিক; এই পরিবারের রাষ্ট্ৰীয় প্রভাব সহজেই অনুমেয়। তাহার উপর ভবদেব নিজে ছিলেন সমসাময়িক কাল এবং সংস্কৃতির একজন প্রধান নায়ক, কুমারিলভট্টের মীমাংসা-বিষয়ক তন্ত্রবার্তিক গ্রন্থের টীকাকার, হোরাশাস্ত্ৰ, মীমাংসা-সিদ্ধান্ত-তন্ত্র-গণিত এবং ফলসংহিতা বিষয়ক গ্রন্থাদির রচয়িতা, কর্মানুষ্ঠান পদ্ধতি বা দশকর্মপদ্ধতি, প্রায়শ্চিত্তপ্রকরণ প্রভৃতি স্মৃতি বিষয়ক গ্রন্থের লেখক এবং ব্রহ্মবিদ্যাবিদ পণ্ডিত। এই ভবদেব-ভট্ট ‘অগস্ত্যের মতো বৌদ্ধরূপ সমুদ্রকে গণ্ডযে পান করিয়াছিলেন এবং তিনি পাষণ্ডবৈতপ্তিকদের যুক্তিতর্কখণ্ডনে দক্ষ ছিলেন বলিয়া তাহার প্রশস্তিলিপিতে দাবি করা হইয়াছে। পাষণ্ডবৈতণ্ডিকেরা যে বৌদ্ধ নৈয়ায়িক এসম্বন্ধে সন্দেহ নাই। দেখা যাইতেছে, এই যুগের ব্রাহ্মণ্যধর্ম, সংস্কার ও সংস্কৃতি, বৌদ্ধ দর্শন ও সংস্কৃতির বিরোধী। বর্মণ বংশের রাষ্ট্র’ভবদেব যেমন সামাজিক আদর্শের প্রতিনিধি সেন-রাষ্ট্রে তেমনই হলায়ুধ। এই হলায়ুধও ভবদেবেরই মতন ব্রাহ্মণকুলতিলক, এবং তেমনই প্রথমে রাজপণ্ডিত, তারপর লক্ষ্মণসেনের মহামাতা, এবং সর্বশেষ লক্ষ্মণসেনেরই ধর্মধিকারী বা ধর্মধ্যক্ষ। তাহার পিতা ধনঞ্জয়ও छिन्नन् রাজকীয় ধর্মাধ্যক্ষ। এই পরিবারেরও রাষ্ট্রীয় প্রভাব অনস্বীকার্য হলায়ুধের দুই ভাই ঈশান এবং পশুপতি যথাক্রমে আহ্নিক এবং শ্ৰাদ্ধ সম্বন্ধে দুইটি পদ্ধতি রচনা করিয়াছিলেন। পশুপতি একখানা পাকযজ্ঞ-গ্রন্থেরও রচয়িতা। আর, হল্যায়ুধ নিজে তো ব্রাহ্মণসর্বস্ব, মীমাংসাসৰ্বস্ব, বৈষ্ণবসর্বস্ব শৈব সর্বস্ব এবং পণ্ডিতসর্বস্ব প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা। সুস্পষ্ট বিরোধিতার ইঙ্গিত ভবদেবী ছাড়া আর কাহারও জীবনে পাওয়া যায় না, কিন্তু এ-কথা সত্য যে, এ-যুগের রাষ্ট্রের সামাজিক আদর্শ একান্তই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সংস্কার ও সংস্কৃতি আশ্রয়ী। দু’টি মাত্র দৃষ্টান্ত আহরণ করা হইল; কিন্তু বস্তুত, বাঙলাদেশ আজও যে স্মৃতিশাসনে শাসিত, যে বর্ণ-বিন্যাসে বিন্যস্ত সেই স্মৃতি ও বর্ণ-বিন্যাস দুইই এই সেন-বৰ্মণ যুগের সৃষ্টি। বল্লালসেনের গুরু অনিরুদ্ধ হইতে আরম্ভ করিয়া জিতেন্দ্ৰিয়, বালক, ভবদেব, হল্যায়ুধ এবং বোধ হয় জীমূতবাহন, ইহারা প্রত্যেকেই সেনা-বর্মণ আমলের লোক; এবং T হারলতাপিতৃদায়িতা হইতে আরম্ভ করিয়া ব্যবহারমাত্রিকা-দায়ভাগ-কালবিবেক পর্যন্ত সমস্ত স্মৃতি, ব্যবহার ও মীমাংসা গ্রন্থ এই যুগের রচনা। এই স্মৃতি-ব্যবহার-মীমাংসাই শূলপাণিরঘুনন্দন কর্তৃক পরিবর্ধিত ও পরিশোধিত হইয়া আজও বাঙলার সমাজ শাসন করিতেছে। এই ধর্ম ও সাংস্কৃতিক আদর্শের পশ্চাতে রাষ্ট্রের সক্রয় পোষকতা ও সমর্থন না থাকিলে একশত-দেড়শত বৎসরের মধ্যে ইহাদের এমন সমৃদ্ধ রূপ কিছুতেই দেখা যাইত না। পোষকতা ও সমর্থন যে ছিল তাহার প্রমাণ বল্লালসেন ও লক্ষ্মণসেন স্বয়ং। বল্লাল স্বয়ং আচারসাগর, প্রতিষ্ঠাসাগর, দানসাগর এবং আংশিকত অদ্ভুতসাগর এই চারিটি স্মৃতি বিষয়ক গ্রন্থের রচয়িতা। দানসাগর তিনি লিখিয়াছিলেন তাহার গুরু] অনিরুদ্ধের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হইয়া। অসম্পূর্ণ অদ্ভুতসাগর সম্পূর্ণ করিয়াছিলেন লক্ষ্মণসেন স্বয়ং, এবং তাহা পিতৃ নির্দেশে।
