অবসান
পূর্ববঙ্গেও সেন-রাষ্ট্র ভিতর হইতে ক্রমশ দুর্বল হইয়া পড়িতেছিল। ১২২১ খ্ৰীষ্টাব্দের আগেই কোনও সময়ে পট্টিকেরা (ত্রিপুরা জেলা) রাজ্যে রণবঙ্কমল্ল হারিকালদেব স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করিলেন। লক্ষ্মণসেনের জীবিতাবস্থায়ই বোধ হয় মেঘনার পূর্বতীরে ত্রিপুরা-নোয়াখালি-চট্টগ্রামে এক দেববংশ মাথা তুলিয়াছিল, এসব কথা তো আগেই বলিয়াছি। এই তিনটি জেলাই এই রাজবংশের রাজা দামোদরের (১২৩১-১২৪৩) অধিকারভুক্ত ছিল, এ-বিষয়ে লিপি প্রমাণ বিদ্যমান। কিছুদিন পর, ১২৮৩ খ্ৰীষ্টাব্দের আগেই, বোধ হয় এই দেববংশেরই অন্যতম রাজা দশরথদেব বর্তমান ঢাকা জেলাও তাহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলেন, এবং বিক্রমপুরে তাহার রাজধানী স্থাপন করিয়াছিলেন। দেববংশেরই আরও দুই একটি লিপি ক্রমশ আবিষ্কৃত হইতেছে। মনে হয়, ত্রয়োদশ শতকের শেষ পর্যন্ত পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গ কোনও রকম করিয়া মুসলমানাধিকারের হাত হইতে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিয়াছিল, কোথাও সেনা-বংশীয় রাজাদের নায়কত্বে, কোথাও অন্য কোনও স্থানীয় রাজা বা সামন্তের নায়কত্বে। নদীবহুল জলমগ্ন ভাটি অঞ্চলে অশ্বনির্ভর মুসলমান অভিযাত্রীরা বহুদিন পর্যন্ত নিজেদের অধিকার বিস্তৃত করিতে পারেন নাই। অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া নবদ্বীপ অধিকার করা যায়, কিন্তু জলপথে অনভ্যস্ত নৌকাবাহিনীবিহীন মুসলমান সেনাপতিদের পক্ষে (পূর্ব ও দক্ষিণ)—বঙ্গ বিজয় নিশ্চয়ই খুব সহজ ছিল না। কিন্তু, তাহা ক’দিনের জন্য? ত্ৰয়োদশ শতকের পর বাঙলাদেশের কোথাও আর কোনও স্বাধীন স্বতন্ত্র হিন্দু নরপতির নাম শোনা যাইতেছে না।
সেনায়ন-কাহিনী বিবৃতির সঙ্গে সঙ্গে এই যুগের রাজবংশ এবং রাষ্ট্রসম্বন্ধগত সামাজিক ইঙ্গিত আগেই কিছু কিছু ধরিতে চেষ্টা করিয়ছি। এখানে একটু বিস্তৃত করিয়া একটা সামগ্রিক দৃষ্টি লওয়ার চেষ্টা করা যাইতে পারে।
সামাজিক ইঙ্গিত
সেন-রাজবংশ বাঙালী ছিলেন না, দক্ষিণের কর্ণাট দেশ হইতে এ দেশে আসিয়া রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করিয়া পাল-যুগসৃষ্ট বাঙলাদেশ ও বাঙালীজাতির আধিপত্য লাভ করিয়াছিলেন। লক্ষণীয় এই যে, এই যুগে আর একটি রাজবংশ (পূর্ব)-বঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন; এই বর্মণ রাজবংশও কিন্তু অবাঙালী, ইহারাও বিদেশাগত, বোধ হয়। কলিঙ্গগত। পাল-বংশ মুখ্যত বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, সেনা-বংশ গোড়া ব্রাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী। আর, যে-চন্দ্ররাজবংশকে অধিকারচু্যত করিয়া বর্মণ-বংশ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহারও পালরাজাদের মতো পরম সুগত অর্থাৎ বৌদ্ধ, আর বর্মণেরা এবং মেঘনা-অঞ্চলের দেব-বংশের রাজারা সেনদের মতনই গোড়া ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ও ব্ৰাহ্মণ্য সংস্কারাশ্রয়ী। এই দুই তথ্যের মধ্যে এই যুগের সামাজিক ইঙ্গিত অনেকাংশ নিহিত; ইহাদের ঐতিহাসিক ব্যঞ্জনা অবহেলার বস্তু নয়। ক্ৰমে তাহা স্পষ্ট করিবার চেষ্টা করিতেছি।
রাষ্ট্রীয় আদর্শ ॥ সংকীর্ণ সামাজিক দৃষ্টি ৷ আমলাতন্ত্রের বিস্তৃতি ৷ রাষ্ট্রযন্ত্রে পৌরোহিত্যের প্রভাব
সুদীর্ঘ পালযুগের রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ এই যুগে অপরিবর্তিত নূতনু কোনও রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ এই যুগে গড়িয়া উঠে নাই, রাষ্ট্রযন্ত্রেরও কোনও পরিবর্তন হয় নাই। স্থানীয় স্বাতন্ত্রা ও আত্মকর্তৃত্বের আদশ সমভাবে বিদ্যমান। সুপ্রতিষ্ঠিত ও ক্রমাগ্রসরমান বৈদেশিক মুসলমানশক্তির নিরস্তর করাঘাতেও রাষ্ট্রীয় আদর্শের কোনও পরিবর্তন হয় নাই; সামগ্রিক ভারতীয় ঐক্যবোধ ও আদর্শ, বৃহত্তর রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ কিছু গড়িয়া উঠে নাই। সামস্ততন্ত্র সমভাবে সক্রয়। উত্তরারোত্তর ভূমির চাহিদা বাড়িতেছে; পুরোহিত-ব্ৰাহ্মণেরাও ভূমিসংগ্রহে তৎপর হইয়া উঠিয়াছেন, সমাজ ক্রমশ ভূমিনির্ভর, কৃষিনির্ভর হইয়া উঠিতেছে। অথচ, রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ক্ষেত্রকর বা কৃষক সম্প্রদায় অবজ্ঞাত; রাজকীয়-ভূমিসংক্রান্ত দলিলপত্রে তাঁহারা ভুলেও উল্লিখিত হইতেছেন না। সমাজের নিম্নতম স্তােরর লোকদেরও কোনও উল্লেখ দেখিতেছি না। অথচ, পালযুগের লিপিমালায় সর্বত্রই কৃষক-কর্ষক-ক্ষেত্রকরদের উল্লেখ তো আছেই, চণ্ডালদের পর্যন্ত উল্লেখ আছে; অর্থাৎ, সমাজের কোনও স্তরই তখন রাষ্ট্রের দৃষ্টির বহির্ভূত ছিল না। স্পষ্টই দেখিতেছি, সেন-যুগে রাষ্ট্রের সামাজিক দৃষ্টি সংকীর্ণ হইয়া আসিয়াছে!! রাষ্ট্রের আধিপত্যের বিস্তার, অর্থাৎ, রাজ্যপরিধিও পাল-সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি লাভ করিতে পারে নাই; তাহাও সংকীর্ণই বলা যায়, যদিও লক্ষ্মণসেন প্রায় মহীপালের রাজ্যসীমা উদ্ধার করিয়াছিলেন, তবে স্বল্পকালের জন্য মাত্র। অথচ, অন্যদিকে ক্ষুদ্র বৃহৎ সকল রাজ ও সামন্তবংশেরই রাষ্ট্ৰীয় আমলাতন্ত্র ক্রমবর্ধমান। নূতন নূতন রাজকর্মচারীদের নাম এই যুগে প্রথম শোনা যাইতেছে; সঙ্গে সঙ্গে ক্রমসংকুচীয়মান নূতন নূতন রাজ্যবিভাগ— খণ্ডল, চতুরক, আবৃত্তি, পাটক ইত্যাদি। ছোট ছোট রাজপদ যেমন বাড়িয়াছে তেমনই বাড়িয়াছে “মহা”-পদের সংখ্যা— মহামন্ত্রী, মহাপুরোহিত, মহাসান্ধিবিগ্রহিক, মহাপিলুপতি, মহাগণস্থ, মহাধৰ্মধ্যক্ষ, ইত্যাদি— “মহা”-পদের আর শেষ নাই! কম্বোজরাজ। নয়পালের ইর্দা পট্টোলীতে নূতন রাষ্ট্রযন্ত্র বিভাগের নামও শোনা যায়; কারণ অর্থাৎ কেরানী মণ্ডলসহ “অধ্যক্ষবৰ্গ”, সেনাপতিসহ “সৈনিকসংঘমুখ্য”, দূতসহ “গূঢ়পুরুষ”-বৰ্গ, এবং আরও কত কি! পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে, একদিকে রাষ্ট্রের সমাজদূষ্টি যত সংকীর্ণ হইতেছে, পরিধি যত সংকীর্ণ হইতেছে, আমলাতন্ত্রের বিস্তার হইতেছে তত বেশী, রাজ্যপাদোপজীবীর সংখ্যা তত বাড়িতেছে, চাকুরীজীবী মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় তত বিস্তৃত হইতেছে। দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর তালিকা দিয়াও যখন ইহাদের শেষ করা যাইতেছে না। তখন বলা হইতেছে, ইহার পর অন্যান্য অনুল্লিখিত রাজকর্মচারী যাঁহারা রহিলেন তঁহাদের নাম অর্থশাস্ত্ৰ-গ্রন্থের অধ্যক্ষ-প্রচার অধ্যায়ে লিখিত আছে। আমলাতন্ত্র যে সংখ্যায় ও অধিকার-বৃদ্ধিতে স্ফীত ও অতিমাত্রায় সচেতন হইয়াছে, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ করিবারও অবকাশ নাই। শুধু তাঁহাই নয়, রাজার সর্বময় কর্তৃত্বও বাড়িয়াছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বোধ হয় আড়ম্বরও। এই যুগেই দেখিতেছি, তাহার নূতন নূতন উপাধি গ্রহণের আতিশয্য। স্মলযুগের রাজকীয় বিজ্ঞপ্তিতে রানীর উল্লেখ দেখা যায় না; কিন্তু এখন দেখিতেছি। রাজ্ঞী-মহিষীরাও উল্লিখিত হইতেছেন। রাজপরিবারের আভিজাত্য ও দরবারী জৌলুস ও বাড়িতেছে, এমন অনুমান করা বোধ হয়। অন্যায় নয়! বৰ্মণ, কম্বোজ ও সেনা-বংশ সকলেই তো বিদেশাগত; মাতৃপ্রধান অথবা মাতৃতান্ত্রিক সমাজের স্মৃতি তাহারা বহন করিয়া আনিয়াছিলেন, এমনও হইতে পারে! এইখানেই শেষ নয়; পুরোহিত, মহাপুরোহিত, শাস্ত্যাগরিক, শাস্ত্যাগোরাধিকৃত, শান্তিবারিক, মহাতন্ত্রাধিকৃত প্রভৃতি নূতন নূতন রাজপুরুষ (ইহারা সকলেই ধর্মীচরণ-ধর্মানুষ্ঠান সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত) রাজসভা জাকাইয়া বসিয়া আছেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্ৰাহ্মণ রাজপণ্ডিতও আছেন; তিনিও এই যুগে অন্যতম রাজকর্মচারী। আমলাতন্ত্রের এই সুদীর্ঘ ও সর্বব্যাপী বাহু এবং সর্বময় প্রভুত্ব জনসাধারণ কী দৃষ্টিতে দেখিত তাহা জানিবার কোনও উপায় নাই।
