লক্ষণসেনের আচরণ
চারিদিকে যখন এই আতঙ্ক ও পরাজয়-মনোবৃত্তির আচ্ছন্নতা তখন বৃদ্ধ লক্ষ্মণসেনের নিজের আচরণ সত্যই প্ৰশংসনীয় এবং যথার্থ রাজকীয় মর্যাদাবোধের পরিচয়। শত্রু অগ্রসরমান জানিয়া এবং উপদেষ্টা ও মন্ত্রীবর্গের পরামর্শে বিচলিত হইয়া তিনি রাজধানী পরিত্যাগ করেন নাই। শেয পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে ও কর্তব্যে অবিচল ছিলেন। তারপর যখন প্ৰায় সকলে তাঁহাকে পরিত্যাগ করিল, পায়ের নীচ হইতে মাটি খসিয়া পড়িল, শত্রুসৈন্য অতর্কিতে এবং অশ্ববিক্রেতার ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদ আক্রমণ ও অধিকার করিল, তখন তাহার পলায়ন ছাড়া আর কোনও পথ ছিল না। লক্ষ্মণসেন কাপুরুষ ছিলেন না, তিনি হতভাগ্য! সমাজ-ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে, ইতিহাস-চক্রের জটিল ও অমোঘ আবর্তনে বাঙলার ইতিহাস শতাব্দী ধরিয়া যে অনিবার্য পরিণতির দিকে অগ্রসর হইতেছিল, লক্ষ্মণসেন তাহার শেষ অধ্যায় মাত্ৰ! তোহার ব্যক্তিগত শৌর্যবীর্য ও অন্যান্য গুণাবলী তাহাকে কিংবা বাঙলাদেশকে সেই পরিণতির হাত হইতে বাঁচাইতে পারে নাই; পারা সম্ভব ছিল না। লক্ষ্মণসেনের ব্যক্তিগত পরাক্রম ও অন্যান্য গুণাবলীর সাক্ষ্য তো মিনহাজ নিজেও দিয়াছেন :
‘রায় লখমনিয়া মহৎ রাজা (great Rae) ছিলেন; হিন্দুস্থানে তাঁহার মতো সম্মানিত রাজা আর কেহ ছিল না। তাহার হাত কাহারও উপর কোনও অত্যাচারে অবিচারে অগ্রসর হইত না। এক লক্ষ কড়ির কমে তিনি কাহাকেও কিছু দান করিতেন না।‘
নদীয়া বা নবদ্বীপ আক্রমণ ও অধিকার ঠিক কবে হইয়াছিল। তাহা লইয়া পণ্ডিতদের মধ্যে বিতণ্ডার অন্ত নাই। মোটামুটি মনে হয় ১২০০ খ্ৰীষ্টােব্দ বা তাহার কিছু পরে (১২০১ খ্ৰী) এই ঘটনার সংঘটন কাল। শোক শুভোদয়া-গ্রন্থে এই ঘটনার তারিখ দেওয়া হইতেছে ১১২৪—১২০২ খ্ৰীষ্টাব্দ, এবং এই তারিখ পাগ-সাম-জোন-জাং নামক তিব্বতী গ্রন্থদ্বারা সমর্থিত।
বিশ্বরূপ সেন ॥ কেশব সেন
নদীয়া-নৃদীয়া-নবদ্বীপ পরিত্যাগ করিয়া লক্ষ্মণসেন (পূর্ব)-বঙ্গে যান এবং সেখানে অত্যল্পকাল রাজত্ব করিয়া পরলোকগমন করেন (১২০৬?), মিনহাজ একথা বলিতেছেন। সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থের সাক্ষ্যে মনে হয়, লক্ষ্মণসেন ১২০৫ খ্ৰীষ্টাব্দেও জীবিত এবং রাজত্ব করিতেছিলেন। বিক্রমপুর জয়স্কন্ধাবার হইতে নিৰ্গত লক্ষ্মণসেনের লিপিগুলির মধ্যে ভাওয়াল ও মাধাইনগর লিপি দুইটি তুর্কী-বিজয়ের পরবর্তী হওয়া একেবারে অসম্ভব নয়। কবি উমাপতিধরও একটি বিচ্ছিন্ন শ্লোকে লক্ষ্মণসেন কর্তৃক এক স্নেচ্ছারাজ জয়ের ইঙ্গিত করিয়াছেন। ম্লেচ্ছ-বিনাশ প্রসঙ্গে কবি শরণেরও একটি শ্লোক আগে উদ্ধার করিয়াছি। হইতে পারে, বঙ্গে বিক্রমপুরে গিয়া অধিষ্ঠিত হইবার পর মুসলমান সৈন্যর সঙ্গে কোথাও কোনও সংঘর্ষ তাহার হইয়া থাকিবে। এই অনুমানের কারণ এই যে, লক্ষ্মণসেনের পুত্র বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেনের লিপিতে যাবানদের সঙ্গে তঁহাদের সংঘর্ষের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গৌড় ও বরেন্দ্রীর মুসলমান নরপতি ও সেনানায়কেরা কেহ কেহ হয়তো পূর্ব ও দক্ষিণ-বঙ্গের সেন-রাজ্যের বাকী অংশও অধিকার করিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু প্ৰায় এক শতাব্দীকাল সে-চেষ্টা সার্থক হয় নাই। প্রধান কারণ, নদনদীবহুল পূর্ববঙ্গের ভৌগোলিক সংস্থান, সন্দেহ নাই। যাহাই হউক, লক্ষ্মণসেন, বিশ্বরূপ ও কেশব তিনজনই এই সব সংঘর্যের জয়ী হইয়াছিলেন, লিপিগুলিতে যেন তাহারই ইঙ্গিত। লিপি প্রমাণ হইতে এ-তথ্য নিঃসংশয় যে, লক্ষ্মণসেনের বংশ বঙ্গে আরও অর্ধ শতাব্দী কালের উপর রাজত্ব করিয়াছিলেন, এবং তঁহাদের রাজ্য পূর্ব ও দক্ষিণ-বঙ্গে বিস্তৃত ছিল। মিনহাজ বলিতেছেন, তাহার গ্ৰন্থরচনা কালেও সেন-রাজারা বঙ্গে রাজত্ব করিতেছিলেন। বিশ্বরূপ ও কেশব দুইজনই লক্ষ্মণসেনের ন্যায় নিজেদের ‘গৌড়েশ্বর” এবং “পরমেশ্বর পরম-ভট্টারক মহারাজাধিরাজ” বলিয়া আত্মপরিচয় দিয়াছেন। রাজ্যের অধিকাংশই তাঁহাদের কারচু্যত হইয়া গিয়াছিল; একাধিকবার যবনদের সঙ্গে ঠাহীদের সংঘর্ষও হইয়াছিল; কিন্তু তৎসত্ত্বেও নিজেদের রাজকীয় দলিলপত্রে অভ্যস্ত ও চিরাচরিত ধরাবাধা ঔপধিক আড়ম্বরের ত্রুটি হয় নাই। হয়তো তাহারা ভাবিয়াছিলেন, নিজেদের স্বাধীনতা তখনও অক্ষুন্নাই আছে, এবং পূর্ববতী অনেক ভিনাপ্রদেশী রাজবংশ কর্তৃক আক্রমণ ও পরাজয়ের মতো এই আক্রমণ এবং পরাজয়ও অধিককাল স্থায়ী হইবে না। বস্তুত, নবদ্বীপ, করচু্যত এবং বখত্-ইয়ার লখনৌতিতে প্রতিষ্ঠিত হুইবার পরও সেনরাজারা যেভাবে তাহদের লিপিগুলিতে সর্বপ্রকার ঔপধিক আড়ম্বর এবং চিরাচরিত রীতি ও অভ্যাস বজায় রাখিয়াছেন, তাহাতে মনে হয় না, এই মুসলমান বিজয়েব যথার্থ ঐতিহাসিক ইঙ্গিত তাহারা যথেষ্ট উপলব্ধি করিয়াছিলেন। সমসাময়িক সাহিত্যেও এই সঙ্কটময় বৈপ্লবিক আবর্তনের কোনও পরিচয় কোথাও পাওয়া যাইতেছে না। সমাজের শিক্ষিত জ্ঞানী-গুণীরা বা জনসাধারণও কি সে ইঙ্গিত ধরিতে পারেন নাই?
বিশ্বরূপ ও কেশব দুইজনই “সগৰ্গ-যবিনাশ্বয়—প্ৰলয়-কালরুদ্র” বলিয়া নিজেদের পরিচয়-দান করিয়াছেন। একাধিক মুসলমান সুলতান—গিয়াস-উদ-দীন বলবন (১২১১-১২২৬), মালিক সৈফ।-উদ-দীন (১২৩১-৩৩), ইজ-উদ-দীন বলবন (১২৫৮) প্রভৃতি কয়েক বারই বঙ্গ (পূর্ব ও দক্ষিণ-বঙ্গ) বিজয়ের চেষ্টা করিয়াছেন, মুসলমান ঐতিহাসিকদের বিবরণী হইতেই তাহা জানা যায়। তবে, সে-চেষ্টা সার্থক হয় নাই। আগেই বলিয়াছি যে, মিনহাজের সাক্ষ্যেই জানা যায় সেনা-রাজারা ১২৬০ খ্ৰীষ্টাব্দেও বঙ্গে রাজত্ব করিতেছিলেন। বিশ্বরূপ ও কেশবের পরও আরও কয়েকজন সেন-রাজার নাম আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী এবং রাজাবলী-গ্রন্থে পাওয়া যায়। তবে, স্বতন্ত্র ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য দ্বারা এই সব রাজার নাম বা কীর্তিকাহিনী সমর্থিত নয়। ইহাদের মধ্যে মাধবসেন এবং শূরসেনের নাম একান্ত অনৈতিহাসিক না-ও হইতে পারে। পঞ্চরক্ষা গ্রন্থের একটি পাণ্ডুলিপিতে (১২৮৯খ্ৰী) গৌড়েশ্বর, পরামসৌগত পরামরাজাধিরাজ মধুসেন নামে এক নরপতির খবর পাওয়া যায়। বিশ্বরূপের সাহিত্য-পরিষৎ-লিপিতে সূর্যসেন (শূরসেন?) এবং পুরুষোত্তম সেন নামে দুই রাজকুমারের উল্লেখ আছে। সেনা-বংশীয় কোনও কোনও রাজপুত্র-রাজকুমার স্থানীয় সামস্তরাজ রূপেও রাজত্ব করিয়া থাকিবেন।
