এ-সব অবস্থার প্রেক্ষাপটে বখত্-ইয়ারের নবদ্বীপধিকার কিছু বিস্ময়কর ব্যাপার বলিয়া মনে হয় না, কিংবা তাহাতে তদানীন্তন বাঙালীর ভীরুতাও কিছু প্রমাণিত হয় না। আলোচিত সাক্ষ্যে স্পষ্টই বুঝা যায়, নবদ্বীপে শত্রু-আক্রমণের কোনও প্রতিরোধ-ব্যবস্থাই ছিল না। রাজমহলের নিকটে, বোধ হয় তেলিয়াগড়ে, কোথাও ছিল দক্ষিণ-বিহার হইতে বাঙলায় প্রবেশের পথ, সেখানে প্রতিরোধের কী ব্যবস্থা ছিল বা না ছিল, জানিবার উপায় নাই। থাকিলেও বখত-ইয়ারের পক্ষে যে তাহা যথেষ্ট বাধা রচনা করিতে পারে নাই তাহা তো পরিষ্কার! আর ঝাড়খণ্ডের দুর্ভেদ্য জঙ্গল ও দুর্গমপথ অতিক্ৰম করিয়া কোনও দুঃসাহসী শত্রুসৈন্য যে বীরভূমের পথে বাঙলায় আসিয়া প্রবেশ করবে, সেন-রাজ ও রাষ্ট্র বোধ হয় তেমন আশঙ্কাও করেন নাই।
যাহা হউক, মোটামুটিভাবে মিনহাজ ও ইসমীর বিবরণের সত্যতা অস্বীকার করা চলে না। বখত্-ইয়ার, তথা বিদেশী শক্তির কাছে নবদ্বীপ তথা সেনরাষ্ট্র ও বাঙালীর পরাজয়ের কারণ আরও গভীর, আরও অর্থবহ এবং তাহা সমগ্ৰ উত্তর-ভারতের সমসাময়িক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ইসলামধর্মী আরব, তুকী, খিলজি প্রভৃতি বিদেশী আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে উত্তর-ভারত তো। কয়েক শতাব্দী ধরিয়া সমানেই যুঝিতেছিল; সাহস ও বীর্যের পরিচয়, দেশাত্মবোধের পরিচয়ও কম দেয় নাই; কিন্তু তৎসত্ত্বেও তিল তিল করিয়া এই সব বৈদেশিক আক্রমণকারীদের প্রভুত্বও স্বীকার করিয়া লইতে হইতেছিল—নানা রাষ্ট্ৰীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে, সামরিক শক্তির অভাবে নয়। ভারতীয় পদাতিক, হন্তীসৈন্য ও স্বল্পসংখ্যক মাত্র অশ্বসৈন্যনির্ভর সামরিক শক্তি অপেক্ষা আরব-খিলজী-তুকীদের দ্রুত ও সুকৌশলী ঘোড়সওয়ারী সেনাদল অধিক কার্যকারী ছিল, সন্দেহ নাই। তবু এই সব কারণ ছাড়া, সমসাময়িক বাঙলাদেশে যে মনোবৃত্তি এই বৈদেশিক পরাভাবের হেতু তাহাও এই প্রসঙ্গে আলোচ্য। উত্তর-ভারত তো একটু একটু করিয়া ইতিপূর্বেই দিল্লীর তত্তের অধীন হইয়া গিয়াছিল; সাহাব-উদ-দীন ঘোরী কর্তৃক গাহািড়বালরাজ জয়চন্দ্রের পরাজয়ের (১১৯৪) পর পূর্বদিকের একমাত্র পরাক্রান্ত স্বাধীন রাজ্য ও রাষ্ট্র ছিল লক্ষ্মণসেনের। এই রাজ্যেরই কিয়দংশ যখন অধিকৃত হইয়া গেল, বিহার ধ্বংস হইল, অর্থ লুষ্ঠিত হইল, প্ৰাণ বিসৰ্জিত হইল তখন জনসাধারণের আতঙ্কগ্ৰস্থ হইয়া পড়া কিছু বিচিত্র নয়। এই আতঙ্কেই দেশের লোক (পূর্ব) বঙ্গে, কামরূপে পলাইয়া গিয়াছিল, এমন কি নবদ্বীপও প্রায় জনশূন্য হইয়া পড়িয়াছিল, মিনহাজের এই ইঙ্গিত মিথ্যা না-ও হইতে পারে। সাধারণ যুক্তিতে এইরূপ হওয়া খুবই স্বাভাবিক, বিশেষত ব্ৰাহ্মণ ও বণিকদের পক্ষে। বৌদ্ধ ভিক্ষু ও অনেক ব্ৰাহ্মণের দল যে এই সময় নানাদিকে পলাইয়া গিয়াছিলেন, এ সাক্ষ্য তো বৌদ্ধ লামা তারনাথও রাখিয়া গিয়াছেন। জনসাধারণের প্রতিরোধের মনোবৃত্তি যে ছিল না, এবং গড়িয়া তুলিতে চেষ্টাও কেহ করে নাই, এ-তথ্য একেবারে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। জ্যোতিষী ব্ৰাহ্মণ ও মন্ত্রীবর্গ যে লক্ষ্মণসেনকে যুদ্ধ না করিয়া দেশত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইতে বলিয়াছিলেন, তাহাতে মনে হয়, রাষ্ট্রেরও প্রতিরোধ-ইচ্ছা বিশেষ ছিল না; ভাগ্যনির্ভর পরাজয়ী মনোবৃত্তি রাষ্ট্রকেও গ্রাস করিয়াছিল। দ্বিতীয়ত, ব্ৰাহ্মণ জ্যোতিষীদের জ্যোতিষ-গণনা ও শাস্ত্রের দোহাইয়ের যে ইঙ্গিত মিনহাজ রাখিয়া গিয়াছেন, তাহাও অস্বীকার করিবার কারণ দেখিতেছি। না। লক্ষ্মণসেনের জন্মকাহিনী অলৌকিক, অবিশ্বাস্য, এমন কি হাস্যকর, সন্দেহ নাই; কিন্তু সে-ক্ষেত্রেও জ্যোতিযে সমসাময়িক জনসাধারণের অত্যধিক বিশ্বাসই সূচিত করে। নিঃসন্দিগ্ধ ঐতিহাসিক প্রমাণ দ্বারা এই তথ্য সমর্থিত। এই যুগের খ্যাতনামা পণ্ডিতদের, ভবদেব ভট্ট, হল্যায়ুধ প্রভৃতি সকলেরই পাণ্ডিত্যখ্যাতি স্মৃতি ও জ্যোতিষনির্ভর। আর, যে-সব সুবিস্তৃত ব্ৰাহ্মণ্য ক্রিয়াকাণ্ডের উল্লেখ, বিভিন্ন তিথি-নক্ষত্রে স্নান, পূজা, উপবাস, হোম, যাগযজ্ঞ ইত্যাদির দর্শন সেন-আমলের লিপিগুলিতে পাওয়া যায়, তাহা তো সমস্তই জ্যোতিষনির্ভর। রাজ-পরিবার, মন্ত্রী-সেনাপতি ইত্যাদিরা, ব্রাহ্মণ ও পুরোহিতেরা এবং উচ্চতর বর্ণের লোকেরা যে স্মৃতি ও জ্যোতিষ ছাড়া জীবনচর্চার আর কোনও নির্দেশ মানিতেন, সেন-আমলের লিপি ও সুবিপুল সংস্কৃতসাহিত্য পড়িলে তাহা মনে হয় না। আর, রাজারা স্বয়ং জ্যোতিষচর্চা করিতেছেন, বল্লাল ও লক্ষ্মণসেন দু’জনই জ্যোতিষের গ্রন্থ লিখিতেছেন, এমন তথ্যও রাজবৃত্তের ইতিহাসে সচরাচর দেখা যায় না। কাজেই, সেই সংকটময় মুহুর্তে মিনহাজ জ্যোতিষীদের উক্তি ও আচরণ সম্বন্ধে যাহা বলিতেছেন, তাহা একেবারে অবিশ্বাস৷ বলিয়া মনে হইতেছে না; কিছু অত্যুক্তি হয়তো থাকিতে পারে! তৃতীয়ত, যদি মানিয়া লওয়া যায় যে (এবং তাহা করিতে কিছু বাধা দেখা যাইতেছে না), লক্ষ্মণসেন বিহারে, বাঙলার পথে এবং নবদ্বীপে শত্ৰু প্রতিরোধের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন, তাহা হইলেও স্বীকার করিতে হয়, এই বাধা যথেষ্ট ছিল না, এবং সংঘর্ষের পশ্চাতে সৈন্যদলের চিত্তশক্তি ও প্রতিরোধ-কামনা খুব প্রবল ছিল না। মিনহাজ বখত্-ইয়ারের তিব্বতাভিযানের ব্যর্থতা এবং লাঞ্ছনার কথা গোপন করেন নাই; প্রতিরোধ প্রবল এবং সংঘর্ষ সঙ্কটময় হইলে এক্ষেত্রেও মিনহাজ অন্তত তাহার উল্লেখ করিতেন। সংবাদদাতা নিজামী-উদ-দীন ও সামস-উদ-দীন এই সংঘর্ষের উল্লেখের ভিতর দিয়াই নিজেদের শৌর্য-বীর্যের কথা ভালো ব্যক্তি করিতে পারিতেন, অথচ তাহা করেন নাই। তাহা ছাড়া, বিহার—ধ্বংসের যে বিবরণ তারনাথ রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা পাঠে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আচরণও খুব প্রশংসনীয় বলিয়া মনে করা যায় না। আচরণ দেখিয়া মনে হয়, ইহারা গোড়া ব্ৰাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী সেন-রাজবংশ ও রাষ্ট্রের প্রতি খুব প্রসন্ন ছিলেন না! অন্য কারণ কিছু থাকাও বিচিত্র নয়। নবদ্বীপেও প্রতিরোধ ব্যবস্থা হয়তো কিছু হইয়াছিল, কিন্তু বাখতু ইয়ারের বুদ্ধি ও আক্রমণ কৌশল তাহা সহজেই ব্যর্থ করিয়া দিয়াছিল, তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নেই। আসল ব্যাপার এই যে, যেখানে জনসাধারণ আতঙ্কগ্রস্থ ও পলায়মান, উপদেষ্টা ও মন্ত্রীবর্গ পরাজয়ী মনোবৃত্তি দ্বারা আচ্ছন্ন, এবং জ্যোতিষ যেখানে রাষ্ট্রবুদ্ধির নিয়ামক সেখানে সৈন্যদলের ও জনসাধারণের প্রতিরোধ দুর্বল হইতে বাধ্য। সেইজন্যই কোনও প্রতিরোধই হয়তো যথেষ্ট কার্যকরী হয় নাই। মিনহাজের বিবরণী পড়িয়া যে মনে হয়, বখতি-ইয়ার একেবারে বিনা বাধায় বিহার ও বাঙলাদেশ জয় করিয়াছিলেন, তাহা এই কারণেই। বস্তুত, লক্ষ্মণসেনের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্র নানা রাষ্ট্ৰীয় ও সামাজিক কারণে ভিতর হইতে দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল। গাহড়বালদের প্রতিরোধ-প্রাচীর যতদিন বজায় ছিল। ততদিন নিশ্চিন্ত হইয়া কলিঙ্গ-কামরূপ-কাশী জয় লক্ষ্মণসেন ও তাঁহার সেনাদের পক্ষে খুব কঠিন ব্যাপার হয় নাই। কিন্তু সে-প্রাচীর যখন ভাঙিয়া পড়িল যখন দুর্ধর্ষ মুসলমান অভিযাত্রীদের ঠেকাইয়া রাখিবার মতন ইচ্ছা বা শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের ছিল না। ব্রাহ্মণ, বণিক, উপদেষ্টা, জ্যোতিষী ও মন্ত্রীবর্গের আচরণই তাহার প্রমাণ।
